শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

রাজধানীতে সিটিং ও গেটলকের নামে বেশি ভাড়া আদায় করছে লোকাল বাস

কামাল উদ্দিন সুমন: রাজধানীর কয়েকটি রুটে লোকাল বাসগুলো হঠাৎ করেই রঙ পাল্টে হয়ে গেছে সুপার সিটিং। এসব বাস সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়ার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আদায় করছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা যাত্রী সেবার দোহাই দিলেও বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) বলছেন, এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন তারা।

সূত্র জানায়, আজিমপুর-গাজীপুর রুটে চলাচলকারী সুপার লোকাল ভিআইপি-২৭ এখন সুপার সিটিং। এমনকি রাজধানীতে লোকাল বাস হিসেবে অতি পরিচিত ৭, ৮ এমনকি ৩ নম্বর বাসও এখন পুরাদস্তুর সিটিং কিংবা গেটলক সার্ভিস নামে চলাচল করছে।

এসব সার্ভিসের কিছু বাস এখনও লোকাল থাকলেও ভাড়া হাঁকানো হচ্ছে দ্বিগুণ। অন্যদিকে, স্বল্প দূরত্বের যাত্রী না নেয়ায় বিড়ম্বনা আর ভোগান্তি বেড়েছে যাত্রীদের। 

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলছেন, ‘টেকসই সমাধান চাইলে অসংখ্য বাস মালিককে নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির অধীনে আনতে হবে।’

এ ব্যাপারে বিআরটিএ পরিচালক প্রকৌশল মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সিটিং, স্ট্যান্ডিং বা গেটলক এ ধরনের সার্ভিসের আলাদা কোনো অনুমোদন নেই। অতিরিক্ত টাকা নেয়ার মতো কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

তিনি বলেন, পৃথিবীর কোথাও সিটিং সার্ভিস নামে আলাদা কোনো বাস সার্ভিস নেই, ঢাকা শহরে ওই নামে জনগণের গলা কাটা সার্ভিসের উপস্থিতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি কোনো নথিপত্রে এসব সার্ভিসের কথা উল্লেখ না থাকলেও যাত্রীদের সেবার মান বৃদ্ধির অজুহাতে বাড়তি টাকা আদায় করছেন বাস মালিকরা। ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটে এ সিটিং সার্ভিসের নামে চিটিং সার্ভিসের বাসের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, ঢাকা মহানগরে অভ্যন্তরীণ রুটে নিয়মিত চলাচল করছে প্রায় ছয় হাজার বাস। কর্তৃপক্ষ যাতায়াতের জন্য এসব যানবাহনের সর্বনিন্ম যাত্রী ভাড়া ৭ টাকা আর মিনিবাসের জন্য ৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু রাজধানীজুড়ে গেটলক, সিটিং,স্পেশাল বা ক্লাসিক সার্ভিসের নামে বাসগুলোতে সর্বনি¤œ ভাড়া ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে। 

বিআরটিএর আইন অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটনের মধ্যে চলাচলকারী বাসের প্রতি কিলোমিটারের জন্য একজন যাত্রী ভাড়া প্রদান করবেন ১.৭০ টাকা। আব্দুল্লাপুর থেকে মিরপুর-১ এর দূরত্ব হচ্ছে ১৭.৫ কিলোমিটার অর্থাৎ ভাড়া হবে ২৯ টাকা ৭৫ পয়সা। আর সে জন্যই এ দূরত্বে বাস মালিকদের নির্ধারিত ভাড়া হচ্ছে ৩০ টাকা। আপাতদৃষ্টিতে আইন সম্পন্ন ভাড়া মনে হলেও এর মাঝখানের যে কোনো এক স্টপেজ থেকে নিকটবর্তী পরবর্তী যে কোনো দূরত্বের চেকিং পয়েন্টের জন্য ভাড়া গুণতে হবে ১০ টাকা যা কিলোমিটার হিসেবে দ্বিগুণেরও বেশি। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একজন যাত্রী যদি আব্দুল্লাপুর থেকে শেওড়া পর্যন্ত যেতে চান তাহলে তাকে সর্বমোট ভাড়া গুণতে হবে ৩০ টাকা। আব্দুল্লাপুর থেকে বিশ্ব রোড পর্যন্ত ভাড়া দিতে হবে ২০ টাকা এবং বিশ্ব রোড থেকে শেওড়া পর্যন্ত মাত্র ৬০০ মিটার রাস্তার জন্য ভাড়া গুণতে হবে অতিরিক্ত ১০ টাকা। যা সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার প্রায় ১০ গুণেরও বেশি। 

সূত্র জানায়, রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের নামে যাতায়াতকারী অনেক বাসে ফ্যানের কোনো ব্যবস্থা নেই, এমনকি সিটগুলোও ভাঙা, জানালায় নেই গ্লাস। যেখানে সেখানে থামিয়ে যাত্রী তোলা হয়, অপরিচ্ছন্ন আসন, আর ছারপোকা তো নিত্যদিনের সঙ্গী। লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলোকে বানানো হচ্ছে স্পেশাল। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সদরঘাট থেকে কুড়িল বিশ্বরোড দিয়ে যাতায়াতকারী সুপ্রভাত গাড়িটি রাতারাতি ‘স্পেশাল সার্ভিস’ নাম দিয়ে সিটিং হয়ে গেছে। শুরুতে কিছু ফ্যান চালু থাকলেও বর্তমানে একটি ফ্যানও সচল নেই। সিটগুলোতে নেই পর্যাপ্ত জায়গা। বসলেই হাঁটু লেগে যায়। 

যাত্রীকল্যাণ সমিতি বলছে, গত ৬ মাসে ১৭টির বেশি নতুন বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুরনো বাস সার্ভিসগুলোও সিটিং সার্ভিসের এক প্রতিযোগিতায় মেতেছে।

সূত্র জানায়, রাজধানীর আজিমপুর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ‘ভিআইপি-২৭’ নামের একটি বাসসেবা দীর্ঘদিন থেকে চালু আছে। কোম্পানিটির বাসসেবা মূলত চালু আছে ‘কাউন্টার সার্ভিস’ নামে। বাসটির সর্বনিন্ম ভাড়া ৫০ টাকা। কোনো যাত্রী যদি আজিমপুর থেকে উত্তরা পর্যন্ত যে কোনো জায়গায় যেতে চান তা হলে তাকে ৫০ টাকার টিকিট কাটতে হবে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরপুরের কালশী থেকে বিশ্বরোডের দূরত্ব ফ্লাইওভার দিয়ে মাত্র ৫ কিলোমিটারের একটু বেশি। হিসাব অনুযায়ী প্রতি ১ টাকা ৭০ পয়সা হারে এ পথে মোট ভাড়া ৯ টাকা। কিন্তু এ রুটে চলাচল করা বাসগুলো সিটিং সার্ভিসের নাম দিয়ে ৯ টাকার জায়গায় আদায় করছে ৩০ টাকা। গাবতলী, আগারগাঁও, মিরপুর ১০ ও আনসার ক্যাম্প থেকে আব্দুল্লাহপুর কিংবা বাড্ডা, গুলশানে চলাচল করছে প্রজাপতি, বসুমতি, মধুমতি, জাবালে নূর, আকিক, নূরে মক্কা, অছিমসহ অনেক গাড়ি। সিটিং সার্ভিসের নামে চলা এসব গাড়িতে যে কোনো দূরত্বের জন্য নেয়া হচ্ছে সর্বনিন্ম ২৫-৩০ টাকা। 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেন, পরিবহন সেবা খাতে নানা অনিয়ম বন্ধ করতে বর্তমানে রাজধানীতে চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছেন। প্রতিদিনই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালন করে বাস-মালিক, চালক এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

বাস-মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বলেন, বাস-মালিকেরা সিটিং বাস চালু করেন যাত্রীদের চাহিদার কথা ভেবেই। ভালো সার্ভিস দেয়ার লক্ষ্যেই, তবে বেশি ভাড়া নেয়াটা অনিয়ম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ