বৃহস্পতিবার ০২ জুলাই ২০২০
Online Edition

ডায়ালাইসিস ব্যয় মেটাতে কিডনি রোগীরা দিশেহারা

খুলনা অফিস : হতদরিদ্র পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে না পেরে অনেক কিডনি রোগী অকালে মারা যাচ্ছে। ব্যয়বহুল এ রোগের চিকিৎসা খরচ যোগাতে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে একবার কিডনি ডায়ালাইসিস করতে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ হয়। একজন জটিল কিডনি রোগীকে সপ্তাহে ২/৩ বার ডায়ালাইসিস করতে হয়। খুলনায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শেখ আবু নাসের হাসপাতালে ২৫টি ডায়ালাইসিস রয়েছে। এর মধ্যে ৫টি পুরোপুরি অকেজো রয়েছে। যা হাসপাতালে রোগীর প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বাকীগুলোর মেশিনের ওয়ারেন্টি কয়েক বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। কিডনি সমস্যার কারণে গত ১৪ মাসে মারা গেছেন ৬৮ জন। চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস পরিধি বাড়ানোর অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
জানা গেছে, কিডনি সম্পূর্ণভাবে অকেজো হওয়ার পর শরীরের ভেতরে জমে থাকা বর্জ্য (ইউরিয়া, ক্রিয়েটিমিন, পটাশিয়াম) পরিশোধিত করার নাম ডায়ালাইসিস। ডায়ালাইসিস সাধারণত দুই প্রকারের হয়। পেটের বা পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস এবং হেমোডায়ালাইসিস বা মেশিনের সাহায্যে রক্তকে পরিশোধিত করা। বর্তমানে আমাদের দেশে হেমোডায়ালাইসিসের প্রচলন বেশি। খুলনায় ২০৫ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শেখ আবু নাসের হাসপাতালে কিডনি রোগীদের জন্য হেমোডায়ালাইসিস করানো হয়। কিডনি রোগের এ চিকিৎসা খরচ আকাশচুম্বী। যে কারণে সবার পক্ষে এই রোগের পুরোপুরি চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হয় না বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। কিডনি রোগীদের একটি বড় অংশ কিছুদিন চিকিৎসা নেয়ার পরই অত্যধিক খরচের কারণে আর চিকিৎসা নিতে পারেন না। তাই স্বজনদের সামনে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুমুখে পতিত হন।
হাসপাতালের হেমোডায়ালাইসিস বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে ওই হাসপাতালে কিডনী ডায়ালাইসিস নেয়ার জন্য রোগীর সংখ্যা আন্তঃ ও বহিঃবিভাগে পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে ছিল ১ হাজার ৬৫৭ জন। এর মধ্যে আন্তঃবিভাগে ছিল ৫১৩ জন। বাকীরা বহিঃবিভাগের। এ সব রোগীদের মধ্যে মোট ডায়ালাইসিস করা হয়েছে ১০ হাজার ৫৮১ বার। এই সময়ের মধ্যে মারা গেছে ৫৫ জন। এর মধ্যে ৯ জন মহিলা রয়েছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আন্তঃ ও বহিঃবিভাগে কিডনি ডায়ালাইসিস রোগীর সংখ্যা রয়েছে ২৫৬ জন। এর মধ্যে আন্তঃ বিভাগে রোগীর সংখ্যা ৮১ জন। বাকীরা বহিঃবিভাগের রোগী। এ সময়ে মারা গেছেন ১৩ জন। এর মধ্যে মহিলার সংখ্যা ৪ জন।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বিধান চন্দ্র গোস্বামী বলেন, সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে হাসপাতালের জন্য ১৫টি নতুন ডায়ালাইসিস মেশিন চেয়েছি। এর মধ্যে ১০টি ডায়ালাইসিস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে হাসপাতাল থেকে ২ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে মেশিনগুলো আনার জন্য। তিনি বলেন, শুরু থেকে এ বিভাগের জন্য ২৫টির বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ২০টি স্থাপন করা হয়েছে। বাকী ৫টি প্রথম থেকেই অকেজো থাকার কারণে তা স্থাপন করা হয়নি। ২০টির মধ্যে কিছু কিছু মেশিন সমস্যা দেখা দিলে আমাদের নিজেদের টেকনিশিয়ান দিয়ে মেরামত করে চালাচ্ছি।
হাসপাতালের সাব. এ্যাসি. ইঞ্জিনিয়ার মো. আমিনুল ইসলাম জানান, ফ্যান্সের ডায়ালাইসিস (ফেসানিয়াস) মেশিন ১০টি রয়েছে। এর কোম্পানির ওয়ারেন্টি গত ২০০৯ সালে শেষ হয়ে গেছে। এছাড়া জাপানের ডায়ালাইসিস (টরে) মেশিন ১৫টি ছিল। এরও ওয়ারেন্টি ২০১২ সালে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এখন মেশিনের কোন সমস্যা হয়ে কোম্পানিরা আর মেরামত করেন না। যা করার আমাদেরই করতে হচ্ছে। এ সব মেশিনের এক বছর ওয়ারেন্টি থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৫ বছর মেয়াদী মেশিন ওয়ারেন্টি থাকলে এতো সমস্যা হতো না। এখন ২০টির মধ্যে ১টি পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেছে। এছাড়া ৫টি মেশিন মাঝেমধ্যে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
নেফ্রোলজী বিভাগের প্রধান ডা. এনামুল কবির বলেন, কিডনি পুরোপুরি অকেজো রোগীকে ডায়ালাইসিস দিতে হয়। এটা কেউ যদি প্রাইভেট হাসপাতালে নেন তাতে প্রতিবার ডায়ালাইসিস নিতে খরচ হয় আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। সরকার এ খাতে ভর্তুকি দেওয়ার কারণে অনেক রোগী কিছুটা হলেও রেহাই পাচ্ছেন। মূলত রোগীর তুলনায় এ মেশিন অপ্রতুল হওয়ায় অনেক রোগী এ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আমাদের আন্তরিকতা থাকার সত্ত্বেও সবার চিকিৎসা দিয়ে পেরে উঠিনা বেড ও মেশিন স্বল্পলতার কারণে। খুব শিগগিরই আরও ১০টি ডায়ালাইসিস মেশিন স্থাপন করা হচ্ছে। কিছুটা হলে আরও রোগী সেবা পাবেন বলে তিনি আশাবাদী।
হেমোডায়ালাইসিস বিভাগে ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন কিডনি রোগী মুক্ত রানী সরকার। ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই থেকে সিডিউল অনুযায়ী তাকে ডায়ালাইসিস করানো হচ্ছে। ৬ মাস মেয়াদী এই সিডিউল অনুযায়ী তাকে ডায়ালাইসিস দেয়ার জন্য ২০ হাজার টাকা জমা দিতে হয়েছে। স্বামী সুকুমার সরকার মঙ্গলবার এ প্রতিবেদককে বলেন, নগরীর ছোট মির্জাপুর এলাকার বাসিন্দা। পেশায় একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে ইতোমধ্যে তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন। এর আগে প্রাইভেট হাসপাতালে তার স্ত্রীকে প্রতি ডায়ালাইসিস করার জন্য প্রথমবার খরচ হয় ২ হাজার ৮শ’ টাকা, দ্বিতীয়বার লাগে ২ হাজার ৪শ’ টাকা। এ পর্যন্ত তার কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় কিছু রেহাই পাচ্ছি। তা না হলে কি যে হতো বলে বুঝাতে পারবো না। এ হাসপাতালে প্রতি বার ডায়ালাইসিস এর জন্য মাত্র ৪০০ টাকা নেয়া হয়। আর প্রাইভেট হাসপাতালে লাগে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করে স্ত্রীর চিকিৎসা দুরুহ হয়ে পড়েছে। এতে পরিবারের ভরণ-পোষণ কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
হাসপাতালের হেমোডায়ালাইসিস বিভাগের ডায়ালাইসিস ইনচার্জ রীতা রানী মন্ডল বলেন, রোগীর তুলনায় এই হাসপাতালে ডায়ালাইসিস মেশিনের সংখ্যা কম। সকাল-দুপুর ও রাত মিলিয়ে ভাগ করে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বহিঃবিভাগের অনেক রোগী সিডিউল অনুযায়ী ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন। এই সিডিউলে ৬ মাস মেয়াদী রোগীদের ডায়ালাইসিস দেয়া হচ্ছে সেক্ষেত্রে নেয়া হচ্ছে ২০ হাজার টাকা। এখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৩ জন বাকীরা বাসায় গিয়ে মারা যান। তিনি বলেন, সরকার ভর্তুকি দিয়ে হতদরিদ্র রোগীদের জন্য এ সেবা চালু করছেন। একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে এ ব্যয়বহুল চিকিৎসা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আর সরকারি হাসপাতালে এ রোগীর তুলনায় প্রয়োজনীয় মেশিন না থাকায় অনেককে প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে ডায়ালাইসিস করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। অনেকে টাকার অভাবে ডায়ালাইসিস করাতে না পেরে মারা যাচ্ছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ