শুক্রবার ১০ জুলাই ২০২০
Online Edition

মিস্টার চ্যাং এর ঢাকা সফর

আশরাফ জামান : ॥ সাত ॥
চ্যাং-এর এ এলাকা ভালো লাগলো না। সকাল বেলায় সে হাঁটতে হাঁটতে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে উপস্থিত হলো। লোকজনকে উঠতে দেখে বাসে উঠে পড়লো। মোহাম্মদপুর-নারায়ণগঞ্জের বাসটি সাইন্সল্যাবরেটরির পাশে এসে একটু থামলে চ্যাং সেখানেই নেমে পড়লো।
হাঁটতে শুরু করলো চ্যাং
ঘ্যাঙ্গর ঘ্যাঙ্গর ঘ্যাং
চলছে কোলা চ্যাং
থপ থপা থপ
দেখবে ঢাকার সব।
অত্যন্ত নিরীহ ভদ্রগোছের জীব ব্যাঙ। কারো সঙ্গে কোন বিবাদ-বিসম্বাদ সে পছন্দ করে না। সাপ তার প্রকাশ্য শত্রু। সাপ ছাড়া দুনিয়ার কারো প্রতি কোনরূপ বিদ্বেষ পোষণ করে না।
আর মিস্টার চ্যাং? সে তো শিক্ষিত ভদ্রলোক, কাজেই অন্য ব্যাঙদের চেয়ে অনেকগুণ ভালো, ও ভদ্রস্বভাব তার। সাইন্সল্যাবরেটরির দক্ষিণ দিকে চলতে চলতে সোজা নিউ মার্কেট পর্যন্ত এসে দাঁড়ালো। দু’পাশের দালানকোঠা, মার্কেট দেখছিল সে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় নিউ মার্কেটের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো।
ভেতরে দেখে সুন্দর সুন্দর দোকানপাট। শাড়ি, কাপড়, গয়না থেকে শুরু করে সবকিছুর দোকান রয়েছে। বাচ্চাদের খেলনার দোকানে থরে থরে সাজানো রয়েছে। নারী-পুরুষ, শিশু সকলে দলে দলে কেনাকাটা করছে।
সুন্দর চটপটে শিশু ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখে খুব ভালো লাগলো চ্যাং-এর। আবার তার মনটা আনন্দে ভরে উঠলো।
চ্যাং হেঁটে হেঁটে দেখছে নিউ মার্কেটের দোকানপাট আর মানুষগুলো। সুন্দর করে সাজানো একটা দোকানে ক্যাসেটে গান বাজছে, হিন্দি গান-
দুনিয়াকে রাখোয়ালে
শুন দর্ফ ভরা মেরিনালে।
চ্যাং একটু থামলো। মনে মনে ভাবলো, কি আশ্চর্য মানুষগুলো, এদেশের মানুষের মাতৃভাষা বাঙলা অথচ গান শুনে হিন্দি গান। আর চলাফেরার পোশাক-আশাক ইংরেজদের।
যাক সামান্য ব্যাঙ যে এ সমস্ত চিন্তা তার শোভা পায় না। এসেছে ভ্রমণ করতে তাই করবে।
কি ভেবে নিউ মার্কেট থেকে সামনের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসে চ্যাং।
সোজা হাঁটতে থাকে উত্তরদিকে, তারপর একটা বাস পেয়ে মিরপুর নামে। বাসে ছোট ছেলেমেয়ের সংখ্যা বেশি। ও তাদের কথায় শুনলো ওরা যাচ্ছে চিড়িয়াখানা দেখতে।
চিড়িয়াখানা জিনিসটা কি তা সে জানে না। যাক জানা যাবে। যথাস্থানে গাড়ি থামলে লোকদের অনুসরণ করে সে চলতে থাকে। একটা দুষ্ট ছেলে ওকে দেখে বললো-
আম্মু আম্মু দেখ ব্যাঙটা আমাদের সাথে আসছে।
মহিলা ও অন্য ছেলেমেয়েরা তাকালো চ্যাং-এর দিকে।
ছেলেটা আরো আগ্রহ দেখিয়ে বললো, ব্যাঙটা দেখতে খুব সুন্দর ওকে ধরি আম্মু?
ওর মা ধমক দিয়ে ওকে নিয়ে গেলেন। বললেন, না ব্যাঙ ধরতে নেই। ওদের শরীরে গড় থাকে।
ছেলেটি বলে, গড় কি আম্মু?
-বিষ। হাতে লাগলে অসুখ করে।
নাহ্্, অগত্যা ছেলেটা চলে যায়।, চ্যাং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
‘ঘ্যাঙ্গর ঘ্যাঙ্গর করতে করতে আনন্দে নাচতে নাচতে মিস্টার চ্যাং চলছে। এক লাফে অনেক দূর আগাতে পারে সে। একটু আগাতেই বিশাল হিংস্র পশুরাজ সিংহের সঙ্গে দেখা। চ্যাং ছোট্ট চোখ দিয়ে এতদূর থেকে দেখা যায় না বলে এক লাফে ভিতরে গিয়ে পড়লো। পড়বি তো পড় সিংহের পিঠে গিয়ে পড়লো। মহারাজা বোধহয় এইমাত্র দুপুরের লাঞ্চটা সেরে আরামে ঘুমুচ্ছিলেন। তার ঘুম ভেঙে গেল।
বিরক্ত হয়ে উঠে লেজ নাড়াতে লাগলো আর মুখ দিয়ে হাই ছাড়তে লাগলো। ছোট ছোট বাচ্চারা মজা করে দেখছে। কে এক বাচ্চা চলে উঠলো, আপু দেখ দেখ সেই ব্যাঙটা সিংহের খাঁচায় ঢুকেছে।
আপু ধমক দিয়ে বললো, দূর বোকা আর কি ব্যাঙ নেই? ওটা ভেতরেই ছিল। রাস্তার ব্যাঙ রাস্তাতেই আছে।
ছেলেটি আবার প্রশ্ন করে, আচ্ছা আপু, সিংহ ব্যাঙ খায় না?
মেয়েটি জবাব দেয়, অত ছোট প্রাণী খেয়ে কি করবে? চুপ কর দেখতে এসেছো দেখ।
খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে চ্যাংয়ের। কিছুক্ষণ দেখে ছেলেমেয়েগুলো অন্যদিকে চলে গেল। চ্যাংও বেরিয়ে এলো খাঁচার ভেতর থেকে। পাশে কাছাকাছি রাখা হয়েছে কয়েকটি বাঘ। বিশাল আকৃতির দেহ।একটা লম্বা ডোরাকাটা। বাঘ হিংস্র থাবা নিয়ে মানুষদের দিকে তাকিয়ে আছে। চ্যাং আর ভেতরে গেল না। সে স্কুলে অবশ্য শুনেছে বাঘ সম্পর্কে। মাস্টার সাহেব গল্প শুনিয়েছেন ছাত্রদের।
বাঘ ও সিংহের হুঙ্কার মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে।
চ্যাং অন্যদিকে রওয়ানা হলো। কিছুদূর চলতে গিয়ে দেখা হলো এক ইঁদুর ছানার সঙ্গে। একটা নাদুস নুদুস গোছের বাচ্চা ইঁদুর।
চ্যাং তাকে দেখে প্রশ্ন করলো, তুমি কেনো ভাই। ইঁদুর তখন ছড়া কাটলো-
কাটুস কুটুস
সব কেটে যাই-
চলতে পথে
সামনে যা পাই।
মানুষ আমার
শত্রু জেনো
আর সকলে
বন্ধু মেনো।
মুখে যদিও
বিষ আছে ভাই
 কোন হিংসা নাই।
ইঁদুরের সঙ্গে পরিচয় হলো চ্যাং-এর। ওর নাম টিংকু। ওর মা আদর করে এ নাম রেখেছে। চিড়িয়াখানায় সব পশুরা থাকে বন্দি খাঁচায়। ও এখানে স্বাধীন। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে। তবে অন্য পশুদের মত ওর সম্মান নেই।
চ্যাং চললো, ভাই তোমার সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভালই হলো, তুমি চিড়িয়াখানা ভাল করে দেখাও।
নেংটি ইঁদুর কাটুস কুটুস করে বললো, বেশ ভাই চলো ওদিকটায় যাই। হাতি দেখিয়ে প্রথমে বললো, দেখ ওর নাম হাতি। জীব জানোয়ারের মধ্যে ও হলো সবচেয়ে বড় প্রাণী।
চ্যাং চোখ তুলে তাকালো। ওর খুদে চোখ দিয়ে যেন কিছুই দেখতে পেলো না। ওর মনে হলো কালো দুটি পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর আগালো নানা ধরনের প্রাণী গরু, মহিষ, হরিণ- এগুলোর কাছে। সাথী পেয়ে চিড়িয়াখানার জীবজন্তু ভালো করে দেখার সুযোগ হলো চ্যাং-এর।
দিন দুই থেকেও গেল চ্যাং। ওর তো থাকতে অসুবিধা নেই। ওকে বাধা দেয় কার সাধ্যি। গেট গিয়ে ঢুকতে টিকিট কাটতে হয়নি। তারপর পাহারাদার, দারোয়ান কারো নজরেও পড়েনি। টিংকুর সঙ্গে কাটলো সময়গুলো। এদিক সেদিক ঘুরে সব জীব-জানোয়ার পাখি দেখতে লাগলো। দেখলো ন শুধু ওর চিরশত্রু সাপকে। সাপের আস্তানার কাছাকাছি গেল না চ্যাং।
এখানকার পরিবেশ ভাল লাগলো চ্যাং-এর। এখন বিদায়ের পালা। টিংকুর কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সময় খুব মায়া লাগলো। টিংকু পর্যন্ত কেঁদে ফেললো। বললো, বন্ধু তুমি ঢাকা ছেড়ে চলে যেওনা। ঘুরে দেখে শুনে আবার এখানে চলে এসো।
চ্যাং অনেকটা কথা দিল, ঠিক আছে ভাই, শহরটা ঘুরে দেখে নেই পারলে আবার আসবো।
চ্যাং বিদায় নিয়ে চলে আসলো। টিংকু গুলিস্তানের কোস্টার পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ