শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

শরীয়তপুরের গোসাইরহাটে মাটি কাটতে গিয়ে নিখোঁজ ৪ দিন পর তিনজনের লাশ উদ্ধার

শরীয়তপুর সংবাদদাতা : গোসাইরহাটের কুচাইপট্টি এলাকায় রাতের আঁধারে মাটি কাটতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার ৪ দিন পর মেঘনা নদীর কুচাইপট্টি এলাকা থেকে মাটি কাটা দুই শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করেছে গোসাইরহাট থানা পুলিশ। নিহতদের শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল মর্গে ময়না তদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতদের স্বজনরা দাবি করেছে ওই এলাকায় মাটি কাটতে যাওয়ার পর শত শত এলাকাবাসি শ্রমিকদের উপর হামলা চালানোর পর সবাই ট্রলারে উঠে পালিয়ে গেলেও দুইজন নিখোঁজ হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ২৪ জন শ্রমিকসহ একটি ট্রলার আটক করে। গোসাইরহাট থানার ওসি বলছেন, শ্রমিক নিখোঁজের বিষয়ে মৌখিক বা লিখিত কোন অভিযোগ পাইনি। ঘটনাস্থল থেকে আটকের বিষয়ে গোসাইরহাট থানায় একটি সাধারণ ডাইরি করা হয়েছে। এ ছাড়াও গতকাল শনিবার দুপুরে একই উপজেলার নলমূড়ি ইউনিয়নের পাচকাঠির চর থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহতদের ভাই সবুজ সরকার, কামাল, শ্রমিক মতিন ও গোসাইরহাট থানা সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের পাবনা ও সিরাজগঞ্জ এলাকা থেকে অনেক শ্রমিক প্রতি বছরই শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলার দক্ষিণ ও পূর্ব কোদালপুর এবং কুচাইপট্টি ইউনিয়নের আনুয়াকাঠি এলাকার মেঘনা নদীর পাড় থেকে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাটিকাটার কাজ করতে যায়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। উত্তরাঞ্চলের শ্রমিকরা ওই এলাকা থেকে মাটি কেটে ট্রলারে ভর্তি করে নারায়ণগঞ্জের বকতবলি ও মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে। এসব শ্রমিক বিনিময়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬শ টাকা মজুরী পায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাতে ১০/১২টি ট্রলার নিয়ে অন্তত দুই শতাধিক শ্রমিক গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্রি ইউনিয়নের আনুয়াকঠি এলাকার মেঘনা নদীর পাড়ে মাটি কাটতে যায়। এ সময় স্থানীয় শত শত লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে তাদের উপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের। হামলা করার পর শ্রমিকরা যে যেভাবে পারছে ট্রলারে উঠে জীবন নিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় খবর পেয়ে গোসাইরহাট থানা পুলিশ ২৪ জন শ্রমিকসহ একটি ট্রলার আটক করে নিয়ে যায়। পরে শ্রমিকদের মুচলেকা রেখে ছেড়ে দেয়া হয়। এদের মধ্যে পাবনা জেলার চাটমোহর থানার ছাইকোলা উত্তর পাড়া গ্রামের মাহবুবুর রহমান (৩৫) ও সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার উদনিয়া চায়রা গ্রামের মাটিকাটা শ্রমিক হাফিজুল সরকার (৩০) নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে তাদের সাথে থাকা শ্রমিকরা স্বজনদের খবর দেয়। খবর পেয়ে তাদের স্বজনরা ওই এলাকায় খোঁজা খুঁজি করে তাদের সন্ধান পায়নি। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি খেজুরতলা নামক স্থানে মেঘনা নদীরপাড়ে একটি হেলে পড়া তালগাছের সাথে দুইজনের লাশ আটকে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে গোসাইরহাট থানা পুলিশ দুইজনের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে গতকাল শনিবার সকালে ময়না তদন্তের জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করে। নিহতদের ময়না তদন্ত শেষে উভয়ের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। এদিকে গতকাল শনিবার দুপুরে একই উপজেলার মেঘনা নদীর নলমূড়ি ইউনিয়নের হাটুরিয়া লঞ্চঘাটের সামনে পাঁচকাঠি চরের মধ্যে স্থানীয় লোকজন অজ্ঞাত একজনের লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ খবর পেয়ে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক ব্যক্তির অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। তার আনুমানিক বয়স ৩০ বছর। গায়ে ফুল হাতার সাদা গেঞ্জি ছিল। পড়নে কিছুই পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে পাবনা জেলার মাটিকাটা শ্রমিক আব্দুল মতিন মিয়া বলেন, গত মঙ্গলবার গোসাইরহাটের কোদালপুর এলাকায় রাতে ১০/১২টি ট্রলারে প্রায় দেড় থেকে দুই শতাধিক শ্রমিক মাটি কাটার জন্য যায়। সেখানে ওই এলাকার শত শত লোকজন ঘেরাও করে তাদের উপর হামলা চালায়। পরে শ্রমিকরা যে যেভাবে পারে পালিয়ে আসে। এ সময় দু’শ্রমিক নিখোঁজ হয়। তাদের অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাওয়া যায়নি।
নিহত মাহবুবের ভাই কামাল ও হাফিজুলের ভাই সবুজ সরকার বলেন, আমরা শুনেছি মাটি কাটতে গেলে এলাকার শত শত লোক তাদের উপর হামলা করে। এ সময় হাফিজুল ও মাহবুব  নিখোঁজ হয়। আমরা খবর পেয়ে এসে অনেক খোঁজাখুঁজি করে তাদের পাইনি। তবে কিভাবে মারা গেছে আমরা বলতে পারছি না।
কুচাইপট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন স্বপন বলেন, গোসাইরহাটের কোদালপুরের একটি প্রভাশালী সিন্ডিকেটের লোকজনের নেতৃত্বে উত্তরাঞ্চলের শ্রমিকরা মাটি কাটতে আসার পর কয়েকশত লোক তাদের মাটি কাটতে বাধা দিয়ে শোর চিৎকার দেয়। এ সময় শ্রমিকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বলে এলাকার লোকজনের কাছ থেকে শুনে, আমি তাৎক্ষণিক পুলিশকে খবর দেই। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি ট্রলার ও ২৪ জন শ্রমিককে আটক করে নিয়ে যায়।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের ময়না তদন্তকারী মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ সুমন কুমার পোদ্দার ও ডাঃ এহসানুল হক বলেন, নিহত দুই শ্রমিকের একজনের ডান হাত ও বুকের পাঁজর ভাঙ্গা পাওয়া গেছে। অপর জনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আমরা ডিএনএ ও ভিসেরা প্রতিবেদনের জন্য মহাখালী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নমুনা প্রেরণ করেছি।
গোসাইরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবিএম মেহেদী মাসুদ বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে মাটি কাটা শ্রমিকরা ট্রলার নিয়ে গোসাইরহাটের কুচাইপট্টি আনুয়াকাঠি এলাকায় মাটি কাটতে গেলে স্থানীয় লোকজন তাদের ধাওয়া করে। আমরা খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে সেখান থেকে ২৪ জন শ্রমিকসহ একটি ট্রলার আটক করি। পরে শ্রমিকদের কাছ থেকে মুচলেকা রেখে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। আটকের ঘটনায় ওই দিন একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। সেদিন কোন শ্রমিক নিখোঁজ হয়েছে মর্মে কেউ মৌখিক বা লিখিতভাবে অভিযোগ করেনি। লাশ উদ্ধার হওয়ার পর তাদের আত্মীয় স্বজনরা এসে সনাক্ত করার পর মাটিকাটা শ্রমিক নিখোঁজের বিষয়টি জানতে পারি। এ বিষয় অভিযোগ পেলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। লাশের ময়না তদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়াও পাঁচকাঠি চরের থেকে আরো একজন অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধা করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ