রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

কে সেরা জ্ঞানী?

ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমাদ : দুনিয়ার সেরা মানবের মধ্যে আল্লাহর নবী রাসূলগণ ছিলেন অধিক সেরা। জ্ঞানে, গুনে, বুদ্ধিতে, কলা কৌশলে তারা ছিলেন সবার সেরা। সেই নবীদের মধ্যে মুসা (আ.) ছিলেন অন্যতম আল্লাহ প্রেমিক এক নবী। মুসা (আ.) একদিন এক  মাজলিশে বসেছেন। কথা প্রসংগে একজন মুসা (আ.) কে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি কি আপনার চেয়ে কাউকে অধিক জ্ঞানী বলে মনে করেন?” হযরত মুসা (আ.) বললেন, “না”। তখন মুসা (আ.) এর কাছে আল্লাহ পাক ওয়াহী পাঠান। আল্লাহ বলেন, “হ্যা, অধিক জ্ঞানী আছেন, আমার বান্দাহ খিজর”। তখন মুসা (আ.) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য পথের সন্ধান চাইলেন। তারপর আল্লাহ পাক মাছকে তাঁর জন্য নিদর্শন বানিয়ে দিলেন। তিনি মুসাকে বললেন, “যখন তুমি মাছটি হারিয়ে ফেলবে তখন তুমি ফিরে যাবে। কারণ কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি খিজরের সাথে মিলিত হবে।” আল্লাহর কথামত মুসা (আ.) সমুদ্রে সে মাছের নিদর্শন অনুসরণ করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে মুসার সাথী ইউসা ইবনু নুন বললেন, “আপনি কি লক্ষ্য করেছেন আমরা যখন পাথরের নিকট বিশ্রাম নিচ্ছিলাম তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম।
শয়তানই তার কথা আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। “মুসা (আ.) বললেন, “আমরাতো সেটিরই সন্ধান করছিলাম।” তারপর তারা নিজেদের পদচিহ্ন দেখে চললেন। তারা খিজরকে পেলেন। (সহী বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযী)।
কোরআন পাকের সূরা আল কাহাফে আল্লাহ পাক সেরা জ্ঞানী কে তা বুঝানোর জন্য মুসা (আ.) ও খিজরের বাদানুবাদের ঘটনা তুলে ধরেন। তাহলো এই।
মুসা (আ.) তাঁর সাথীকে বলেছিলেন, “দুই সমুদ্রের মিলনস্থলে না পৌঁছা পর্যন্ত আমি চলতেই থাকব। যদিও বছরের পর বছর চলতে হয়। তারপর তারা দুই সমুদ্রের মিলন স্থলে পৌঁছলো। তারা তাদের মাছের কথা ভুলে গেল। সেটি তাদেরকে সমুদ্রে সুড়ঙ্গের মত পথ করে দিল। যখন তারা আরো এগিয়ে গেল, সে তার সাথীকে বললো, “আমাদের সকালের খাবার আনো, আমরা আমাদের এই সফরে বড়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
সাথী তখন বললো, “আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন শিলাখন্ডে বসেছিলাম তখন মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। সেটার কথা আপনাকে বলতে শয়তানই আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। আর মাছটি বিষ্ময়কর ভাবে সমুদ্রে তার রাস্তা করে চলে গিয়েছিল।
মুসা বললো, এটাইতো সে যায়গা যেটা আমরা খুঁজছি। কাজেই তারা তাদের পায়ের চিহ্ন ধরে ফিরে গেল। তখন তারা আমার বান্দাদের এক বান্দাকে (খিজর) পেল। তার প্রতি আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ দান করেছিলাম। তাকে আমার পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলাম।
মুসা তাকে বললো, “আমি কি এ শর্তে আপনার অনুসরণ করব যে, আপনি আমাকে সেই বিশেষ জ্ঞান থেকে শিক্ষা দিবেন যে জ্ঞান আপনাকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে ?
খিজর বললো, “আপনি কিছুতেই আমার সাথে ধৈর্য্য ধারণ করতে পারবেন না, আপনি কীভাবে সে বিষয়ের ধৈর্য্য ধারণ করবেন যা আপনার জ্ঞানের আওতার বাইরে?
মুসা বললো, “মহান আল্লাহ চাইলে আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। আমি আপনার কোন নিদের্শই লঙ্ঘন করবো না।”
সে বললো, “আপনি যেহেতু আমার অনুসরণ করতেই চান, তাহলে আপনি আমাকে কোন ব্যাপারেই প্রশ্ন করবেন না যতক্ষণ না আমি নিজেই সে সম্পর্কে আপনাকে বলি।”
তারপর তারা দুজনে চলতে লাগলো যতক্ষণ না তারা নৌকায় উঠলো। তারপর খিজর নৌকায় ছিদ্র করে দিল। মুসা বললো, ‘আপনি কি তার আরোহীদের ডুবিয়ে দেয়ার জন্য তাতে ছিদ্র করলেন?’
আপনিতো এক অদ্ভুত কাজ করলেন?
খিজর বললো, আমি কি আপনাকে বলিনি যে, আপনি কিছুতেই আমার সাথে ধৈর্য্য ধরতে পারবেন না?
মুসা বললো, “আমার ভুলের জন্য আমাকে পাকড়াও করবেন না।”
তারপর আবার তারা চলতে লাগলো। চলতে চলতে এক বালককে তারা দেখতে পেলো। তখন সে তাকে হত্যা করে ফেললো। মুসা বললো, “আপনি কি এক নিরপরাধ জীবনকে কোন প্রকার হত্যার অপরাধ ছাড়াই হত্যা করে দিলেন? আপনি তো গুরুতর এক অন্যায় কাজ করে ফেললেন? খিজর বললো, “আমি কি আপনাকে বলিনি যে আপনি আমার সাথে কখনো ধৈর্য্য ধরতে পারবেন না ?”
মুসা বললো, “এরপর যদি আমি কোন বিষয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করি, তাহলে আপনি আর আমাকে সাথে রাখবেন না, ওযর অন্যায় আমার পক্ষ থেকেই ঘটেছে। তার পর তারা উভয়ে চলতে লাগলো। চলতে চলতে তারা এক জনপদে পৌঁছে সেখানকার লোকদের কাছে খাবার চাইলো। কিন্তু তারা তাদের দুজনকে আতিথ্য প্রদান করতে অস্বীকার করলো। তারা সেখানে একটা দেয়াল দেখতে পেলো। উহা পুড়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল। তখন সে সেটিকে মজবুতভাবে দাঁড় করিয়ে দিল। মুসা বললো, “আপনি ইচ্ছা করলে এর জন্য পারিশ্রমিক নিতে পারতেন।”
খিজর বললো, “এখানেই আপনার সাথে আমার সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটলো। তবে এখন আমি আপনাকে ব্যাখ্যা জানিয়ে দিব যে বিষয়ে আপনি ধৈর্য্য ধরতে পারেননি।
নৌকাটির ব্যাপার হলো, তা ছিলো কয়েকজন গরীব লোকের। তারা সমুদ্রে জীবিকার জন্য পরিশ্রম করতো। আমি সেটাকে খুঁৎযুক্ত করতে চাইলাম। কারণ তাদের সামনে আছে এক রাজা। সে জোরপূর্বক সব নৌকা কেড়ে নিতো। রাজা ঐ ভাংগা নৌকা পছন্দ করবে না। এবার বালকটির ব্যাপার। তার মা বাবা ছিল মুমিন। আমাদের আশংকা যে, বালকটি তার বিদ্রোহমূলক আচরণ ও মহান আল্লাহর প্রতি কুফুরী দ্বারা তাদের কষ্ট দিবে। তাই আমরা চাইলাম যে তাদের প্রতিপালক তাদেরকে ঐ বালকটির পরিবর্তে অধিক পবিত্র ও দয়ামায়ার ঘনিষ্ঠ সন্তান দান করবেন। এবার ঐ দেয়ালটির বিষয়ে শোন। উহা ছিল ঐ শহরের দুজন এয়াতীম বালকের। দেয়ালের নিচে ছিল তাদের জন্য রক্ষিত ধন। তাদের পিতা ছিল একজন সৎলোক। তাই তোমার প্রতিপালক চাইলেন তারা দুজন যৌবনে পৌঁছা পর্যন্ত ঐ ধন সম্পদ রক্ষিত থাকুক। পরে তারা তাদের গচ্ছিত ধনসম্পদ বের করে আনুক। উহা ছিল তোমার প্রতিপালকের বিশেষ রহমত। এসব আমি নিজের পক্ষ থেকে করিনি। এই হলো ঐ সব বিষয়ের ব্যাখ্যা যে সম্পর্কে আপনি ধৈর্য্য ধারন করতে পারেন নি। এবার বিদায়। (আল কুরআন সূরা- আল কাহাফ, ৬০ - ৮২)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ