রবিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

পিতা মাতার অধিকার ঠুনকো নয়!

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : পিতা-মাতার মাধ্যমে একটি সন্তান এই সুন্দর পৃথিবীর আলো দেখে। পৃথিবীর সব ধর্মই পিতা-মাতাকে সম্মানের কথা বলে। তবু এই সমাজে পিতা-মাতাকে অসম্মান করতে দেখা যায়। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত পিতা-মাতা যে ত্যাগ করেন তা লিখে শেষ করা যাবে না। হাজারো গঞ্জনা সহ্য করে পিতা-মাতা সন্তানের সুখের জন্য জীবন বিলিয়ে দিতে কার্পণ্য করে না। অথচ কলিজার টুকুরা সন্তান যখন পিতা-মাতাকে অসম্মান করে তখন আর দুঃখের সীমা থাকে না। সন্তান বড় হলেও পিতা-মাতার মায়া, মমতা, ভালোবাসার কোনো কমতি হয় না। সন্তানের কোন বিপদ দেখলে পিতা-মাতার পেরেশানি বেড়ে যায়। কিন্তু এই সমাজে পিতা-মাতার বিপদ-আপদে সন্তানের পেরেশানি ততটা দেখা যায় না। যা সত্যিই দুঃখজনক। সন্তান তার পিতা-মাতাকে সম্মান করবে এটাই তো স্বাভাবিক! সন্তান মানুষ করার পেছনে পিতা-মাতার ভূমিকা কতটুকু তা দাঁড়িপাল্লা দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। তবে আমাদের সমাজে মানুষ হওয়ার সংজ্ঞাটা একটু অন্য রকম। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় ডিগ্রি নিয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিংবা আইনজীবী হলেই অনেকে মনে করেন তার সন্তান মানুষ হয়েছে। বিষয়টি কি এ রকম? পড়ালেখা করলেই যদি মানুষ হওয়া যেত তাহলে আমাদের সমাজে বৃদ্ধাশ্রম হতো না। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেক পিতা-মাতা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে অর্থ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন। এটা দোষের আমি বলছি না। তবে পিতা-মাতার উচিত সন্তানের ভবিষ্যৎ সুখের জন্য অর্থ সম্পদের চেয়ে বেশি মূল্যবান ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। কেননা পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সন্তান যেন তাদের জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে পারে। যেমনটি রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন‘ যখন কোনো বনি আদম মৃত্যুবরণ করে তখন তিনটি আমল ব্যতীত তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। (তন্মধ্যে একটি হলো) ওই নেক সন্তান যে তার পিতা-মাতার জন্য দোয়া করবে’। তাই পিতা-মাতার উচিত সন্তানকে আদর্শবান হিসেবে গড়ে তোলা। যা হবে পিতা-মাতার জন্য দুনিয়াও আখিরাতে কল্যাণের উসিলা। ধর্মীয় জ্ঞান না থাকলে সত্যিকারের ভালো মানুষ হওয়া যায় না। এটা ইতিহাসে প্রমাণিত। ধর্মীয় জ্ঞান না থাকার কারণে একজন বিজ্ঞানী এটম বোমা আবিষ্কার করেছেন। এটম বোমা পৃথিবীবাসীর উপকার করা তো দূরের কথা উল্টো একটি জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। পিতা-মাতার ভেবে দেখা উচিত তারা তাদের সন্তানকে অর্থ-সম্পদ অর্জনের তালিম দিবে নাকি সত্যিকারের একজন ভালো মানুষ হওয়ার জন্যে চেষ্টা চালাবে। পত্রিকার পাতায় প্রায়ই দেখা যায় যে নিষ্ঠুর সন্তান তার পিতা-মাতাকে নির্মম অত্যাচার করে হত্যা করছে, ঘর থেকে বের করে দিচ্ছে। পিতা-মাতার অধিকার ঠুনকো কোনো বিষয় নয় তা কুরআন ও হাদিসের আলোকে পাঠকদের জ্ঞাতার্থে পেশ করছি।
১. পিতা-মাতার সাথে ব্যবহারটা কেমন হবে এ সম্পর্কে কুরআনের শিক্ষা: কুরআনে বেশ কয়েক জায়গায় পিতা-মাতার প্রতি সদয় ও সহানুভূতিশীল হতে বলা হয়েছে। প্রায় সব জায়গাতেই আল্লাহর এবাদতের পরেই পিতা-মাতার সেবার কথা বলা হয়েছে। এমনকি বলা হয়েছে তাদের প্রতি দয়ালু হতে, এমন কোনো শব্দ উচ্চারণ না করতে যা তাদের কষ্টের কারণ হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তার উল্টো। পিতা-মাতা যখন বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন তারা সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েন। ইসলামী মূল্যবোধ পারিবারিক জীবনে না থাকার কারণে আমাদের পারিবারিক স্টাকচার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তবে এটাও ঠিক আমাদের সমাজজীবনে যখন ভাঙন ধরে,তখন সর্বক্ষেত্রেই তার সর্বগ্রাসী প্রভাব পড়ে। কেউ কাউকে মানতে চায় না। আপন ভুবনে সবাই নিজেকে মনে করে রাজা। বাকি মানুষগুলো সব প্রজা। তার মধ্যে আবার ক্ষমতার দাপট যদি থাকে তাহলে তো আর কথাই নেই। মহান আল্লাহতায়ালা সূরা লোকমানের ১৪-১৫ আয়াতে পিতা-মাতার অধিকার সম্পর্কে যা বর্ণনা করেছেন তা দুনিয়ার সকল বিশ্বাসী মানুষের জন্য খুবই প্রণিধানযোগ্য। ‘আমি মানুষকে (তাদের) পিতা-মাতার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছি (যেন তারা তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করে, কেননা), তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং দুই বছর পরই সে (সন্তান) বুকের দুধ খাওয়া ছেড়েছে, তুমি (তোমার নিজের সৃষ্টির জন্যে) আমার শোকর আদায় করো এবং তোমার (লালন পালনের জন্যে) পিতা-মাতারও কৃতজ্ঞতা আদায় করো; (অবশ্য তোমাদের সবাইকে) আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে। যদি তারা উভয়ে তোমাকে এ বিষয়ের ওপর পীড়াপীড়ি করে যে, তুমি আমার সাথে শেরেক করবে, যে ব্যাপারে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের দু’জনের (কারোই) কথা মানবে না, তবে দুনিয়ার জীবনে তুমি অবশ্যই তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে, তুমি কথা তো শুধু তারই শোনবে যে ব্যক্তি আমার অভিমুখী হয়ে আছে, অতঃপর তোমাদের আমার দিকেই ফিরে আসতে হবে, তখন আমি তোমাদের বলে দেবো তোমরা (দুনিয়ার জীবনে) কি কি কাজ করতে।’ পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা এ সম্পর্কে বলেন, ‘তাঁদের একজন বা উভয়জন যদি তোমার কাছে বৃদ্ধাবস্থায় থাকে তখন তাদের আচরণে রাগ করে উহ্ করবে না এবং তাদেরকে ধমকও দেবে না।’’ বৃদ্ধ বয়সে কথা সহ্য করার শক্তি থাকে না, দুর্বলতার কারণে নিজের গুরুত্ব প্রাধান্য পায়, এর ফলে সাধারণ কথাও কর্কশ অনুভূত হয়, সুতরাং এ নাজুক অবস্থার প্রতি দৃষ্টি দিয়ে নিজের কোনো কথা বা কাজে মাতা-পিতাকে অসন্তুষ্টই হবার সুযোগ দেবে না। হযরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, পিতার সন্তুষ্টিই আল্লাহর সন্তুষ্টি, পিতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি। (তিরমিযি) রাসূল (সা.) বলেছেন, সে ব্যক্তি অপমানিত হোক, আবার সে অপমানিত হোক এবং আবার সে অপমানিত হোক। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কে সে ব্যক্তি? উত্তর দিলেন, যে ব্যক্তি তার ‘মাতা-পিতাকে বৃদ্ধাবস্থায় পেলো অথবা তাদের কোনো একজনকে পেলো- তারপরও (তাদের খেদমত করে) বেহেশতে প্রবেশ করতে পারেনি।’ (মুসলিম)
২. পিতা-মাতার অধিকার সম্পর্কে রাসূল (সা.) যা বলেছেন: পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার সম্পর্কে রাসূলের (সা.) শিক্ষা কুরআনের শিক্ষারই বিস্তৃতি। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো আল্লাহর দৃষ্টিতে উত্তম কাজ কি? উত্তরে নবীজী বলেন, ‘সময়মতো নামায পড়া, পিতা-মাতার প্রতি ভালো এবং দয়ালু হওয়া এবং আল্লাহর পথে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয়া। এ থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে পিতা-মাতার প্রতি সদয় হওয়া বিনয়ী হওয়ার বিষয়টি নামাযের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মাঝে অবস্থিত। পিতা-মাতার প্রতি ভালো ব্যবহার করলে পুরস্কার পাওয়ার ঘোষণার কথাও আছে। আল্লাহর রাসূল (সা.) তো এক হাদিসে বলেছেন, যারা পিতা-মাতা ও আল্লাহর অনুগত, তারা বেহেশতের সর্বোচ্চ জায়গাতে থাকবে। আরেক জায়গাতে পিতা-মাতার প্রতি দয়াকে জিহাদের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা তাদের সেবা করবে তারা হজ্বের অথবা জিহাদের সমান পুরস্কার পাবে। তিনি আরো বলেছেন যে, পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির মাঝে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, রাসূল (সা.) যেভাবে বলেছেন পিতা-মাতার সাথে সুন্দর ব্যবহার করতে আমরা সেভাবে করতে পারিনি।
একবার রাসূলের (সা.) কাছে এক ব্যক্তি এসে বললো, ‘আমি আল্লাহর পথে জেহাদ করতে চাই। সত্যের জন্য জীবন দিতে চাই। কিন্তু তা করতে পারছি না।’ রাসূল (সা.) জানতে চান যে, তার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কিনা। ঐ ব্যক্তি জানান, তার মা জীবিত আছেন। তখন রাসূল (সা.) বলেন, ‘যাও তাঁর সেবা করো, তুমি তাদের সমান পুরস্কার পাবে যারা হজ্ব ও জেহাদ করে।’ অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘মায়ের পায়ের দিকে খেয়াল রাখবে যাতে তাঁর সেবা করতে পারো।’ আরেক হাদিসে তিনি বলেন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।
৩. পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ: পিতা-মাতার ভরণপোষণ করা সন্তানের দায়িত্ব। আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায় যে সন্তান তার স্ত্রী ছেলে কিংবা মেয়ে নিয়ে সংসার করছে। পিতা-মাতা অসহায় মানুষের মতো অন্যের দ্বারে দ্বারে জীবিকা আহরণের জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। তিনটি অবস্থায় পিতা-মাতার ভরণপোষণ করা সন্তানের  দায়িত্ব। যেমনঃ পিতা-মাতা অক্ষম হলে এবং তাদের জীবন ধারণের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ না থাকলে। তাদের চলার মতো জীবিকা তারা উপার্জন করতে না পারলে। তাদের ভরণ-পোষণের সামর্থ্য সন্তানের থাকলে। তবে একদিন ও একরাতের পরিমাণ খাদ্য ঘরে অতিরিক্ত থাকলেই সামর্থ্যবান বলে ধরা হবে।
একবার হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.) হযরত ইবনে আব্বাসকে (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি চান যে, দোযখ থেকে দূরে থাকুন এবং বেহেশতে প্রবেশ করুন? ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, নিশ্চয়ই! হযরত ইবনে ওমর (রা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন আপনার মাতা-পিতা কি জীবিত আছে? ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন জি, হ্যাঁ আমার মাতা-পিতা জীবিত আছে। ইবনে ওমর (রা.) বললেন, আপনি যদি তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করেন তাঁদের ভরণ-পোষণের দিকে খেয়াল রাখেন, তাহলে নিশ্চয়ই আপনি বেহেশতে প্রবেশ করবেন। তবে শর্ত হলো যে, কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে। আর একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। রাসূলের (সা.) কাছে এসে একজন বললো যে, তার পিতা তার কিছু সম্পত্তি নিয়ে নিতে চায়। তখন রাসূল (সা.) বললেন, তুমি এবং তোমার সম্পদ সবই তোমার পিতার। কাজেই কোনো মুসলিম তাদের পিতা-মাতা অথবা দাদা-দাদীর সেবাযত্নে যেন কার্পণ্য না করে। যদি সে এই দায়িত্ব পালন না করে তবে আইন প্রয়োগ করে তাকে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে হবে। মাতা-পিতাকে সর্বদা সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করবে। তাদের ইচ্ছা ও মেজাজের বিপরীত এমন কোনো কথা বলবে না যা দ্বারা তারা তাদের অন্তরে ব্যথা পায়। বিশেষত বৃদ্ধাবস্থায় যখন তাদের মেজাজ বা স্বভাব খিটখিটে হয়ে যায়, তখন মাতা-পিতা এমন কিছু দাবি করে বসে যে, যা অবাস্তব। এমতাবস্থায় তাদের প্রতিটি কথা সন্তুষ্টচিত্তে সহ্য করবে এবং তাদের কোনো কথায় বিরক্ত হয়ে এমন বলবে না যা দ্বারা তাদের অন্তরে ব্যথা পায় এবং তাদের আবেগে আঘাত লাগে।
দুনিয়াব্যাপী পিতা-মাতার হক সন্তানেরা সঠিকভাবে পালন করতে পারছে বলে মনে হয় না। নিকটঅতীতে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম একটি অভিনব আইন প্রণয়ন করতে চলেছে, যাতে সরকারি কর্মচারীরা তাদের বাবা-মায়ের ঠিকমতো দেখাশোনা না করলে তাদের বেতন থেকে একটা অংশ কেটে নেয়া হবে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ইদানীং এমন বহু অভিযোগ উঠেছে যে, আর্থিক স্বাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও ছেলেমেয়েরা অসুস্থ বাবা-মায়ের দিক থেকে নজর ফিরিয়ে নিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে হাজারো পিতা-মাতা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
কখনও কখনও আদালতের রায়ে তারা সন্তানের বাড়িতে আবার ফিরে যাওয়ার অধিকারও পেয়েছেন। তবে এই সামাজিক সমস্যা শুধু ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ তা কিন্ত নয়। পৃথিবীর বহু দেশে এমনকি ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশেও পিতা-মাতারা সন্তানের নির্মম অত্যাচারে জীবন পর্যন্ত দিয়েছেন যা প্রত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হয়েছে। মহান আরশের অধিপতির নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন দয়া করে আমাদের ভুল-ত্রুটিকে ক্ষমা করে দেন, পাশাপাশি পিতা-মাতার অনুগত সন্তান হিসেবে কবুল করে নেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ