সোমবার ০১ মার্চ ২০২১
Online Edition

ফাঁসির মঞ্চে ঈমানের জয়গান কালজয়ী প্রতিভা শহীদ সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী

সত্য কালজয়ী। ঘটনার বিকৃত রূপায়ন মিথ্যাকে চিরস্থায়ী করতে পারে না। সত্য দিয়েই পৃথিবীর যাত্রা। সত্যের পিঠে ভর করেই পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত। সত্য বিনে পৃথিবী অচল। মিথ্যেরা তখনো অনস্তিত্বে। ফলে সত্যেরা খেলা করত আপন মনে। হঠাৎ কাবিলের হাত ধরে মিথ্যার আগমন। কিন্তু তাও খুব স্বল্প সময় স্থান পায় সত্যের ভিড়ে। জয় হয়েছে সত্যেরই। যুগে যুগে পৃথিবীবাসী সেই আবহমানকাল থেকে এটাই দেখে আসছে। তাই সত্যই শাশ্বত। মিথ্যা বিতাড়িত। নবী রসূলগণ ও তাঁদের পথের অনুসারীদের উপর অত্যাচারের তীব্রতা কত ভয়াবহ ছিল তা কল্পনা করাও কঠিন। এক আল্লাহর দাওয়াত তারা স্বজাতির কাছে দিতে গিয়ে কত যে নির্মমতা সহ্য করেছেন তা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি জুলুমের ইতিহাস আমাদের কারো কাছে অজানা নয়। তাঁর সাহাবাদের উপরে চালানো হতো নিরন্তর অমানুষিক শাস্তি ও নির্যাতনের ষ্টীম রোলার। একবার হযরত খাব্বাব ইবনুল আরাত (রাঃ) কাফেরদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে এ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের জন্য রাসূলের খেদমতে হাজির হয়ে বললেন,‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাদের জন্য দোয়া করবেন না? রাসূল (সাঃ) তার জওয়াবে বলেছিলেন, মনে রেখো,তোমাদের পূর্বে এই আদর্শে আদর্শবান দায়ী লোকদেরকে লোহার চিরুনি দিয়ে দেহের সমস্ত মাংস আঁচড়িয়ে খুলে ফেলা হতো। অনেককে করাত দিয়ে চিরে দু’ভাগ করে ফেলা হতো। কিন্তু এতসব অত্যাচার নির্যাতনেও তাদেরকে  দ্বীন থেকে ফিরিয়ে নিতে পারতো না। আল্লাহর শপথ আল্লাহ এই দ্বীনকে অবশ্যই বিজয়ী করবেন, ফলে এমন একদিন আসবে, যেদিন একজন পথিক জন্তুযানে আরোহন করে সানা থেকে হাজরা মাউত পর্যন্ত চলে যাবে,পথে সে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। ছাগ শিশুরও ভয় থাকবে না নেকড়ে বাঘের। কিন্তু তোমরা বড় তাড়া হুড়া শুরু করে দিয়েছ। ইসলামের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনার অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে।যুগ যুগ ধরে আবুজেহেলের প্রেতাত্মারা সত্যের আলোকে মিথ্যার আবরণে ঢেকে দিতে চেয়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালা তাদের সকল ষড়যন্ত্রের কূটচালকে ছিন্নভিন্ন করে সত্যের আলোকে প্রজ্বলিত করেছেন। ইতিহাস তার সাক্ষী। এই নিবন্ধনে কালজয়ী প্রতিভা শহীদ সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর ত্যাগ ও কুরবানীর ইতিহাস অল্প পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।
পাক ভারতে আজাদী আন্দোলনের প্রেরণা জুগিয়েছিলো মুসলিম আলেম সমাজ। আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গকারী হিসেবে তাঁরা অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছে। কোনরূপ স্বার্থচিন্তায় চালিত না হয়ে আলেম সমাজ ধর্ম রক্ষা, সমাজ সংস্কার ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাসনায় আজাদীর ঝান্ডা উর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন। ধর্মবোধ ও ইসলাম প্রীতির ফলেই তারা বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বিক্ষোভ ও অসন্তোষের তীব্র বহ্নি ধূমায়িত করে রেখেছিলেন। তাদের দেশপ্রেমে কোনো খাদ কিংবা বিলাস ছিল না। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ পুরো একশো বছর ধরে মুসলমানরা জেহাদ চালিয়েছে ইংরেজ বেনিয়া শাসক আর হিন্দু শোষকদের বিরুদ্ধে। এর পরেও তাঁরা থেমে যায়নি। আমাদের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। এটাও ইংরেজ ও হিন্দুদের মিলিত চক্রান্তেরই অংশ। বিপ্লবের অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করেছে মুসলমানরা। ইসলামের জন্য শহীদ হয়েছেন। তবু কোন ষড়যন্ত্র ও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করেনি। পৃথিবীর দেশে দেশে ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালারা মিথ্যের কাছে মাথা নত না করে ফাঁসির মঞ্চে এগিয়ে গেছেন। এটা ইতিহাসে প্রমাণিত। ১৮৭৬ সাল। পলাশীর যুদ্ধের পর ২৯ বছর গত হয়েছে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শাসন ক্ষমতা নিয়ে ইংরেজরা শক্তিমত্তার হুমকি দিয়ে, অত্যাচার জুলুম চালিয়ে কৌশলে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ভারতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো একের পর এক গ্রাস করছে। মুসলিম ভারতের এমন দুর্দিনে ১৭৮৬ সালে মধ্য ভারতের রায়বেরেলিতে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী। সৈয়দ আহমদের পিতা সৈয়দ ইরফান নিজেকে চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) এর বংশধর বলে পরিচয় দিতেন। ধর্মনিষ্ঠার জন্য সৈয়দ ইরফানের সুনাম ছিল সর্বত্র। চার বছর বয়সেই আহমদ ব্রেলভীর শিক্ষা জীবন শুরু হয়, কিন্তুলেখাপড়ায় অমনোযোগিতার দরুন তিন বছর পরে তাঁকে মক্তব থেকে সরিয়ে আনা হয়। মক্তব থেকে বেরিয়ে এসে দুরন্ত সৈয়দ আহমদ নিজের ইচ্ছানুযায়ী সমবয়সীদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে দরিদ্র, বিধবা ও অসহায়দের সাহায্য করার কাজেই নিজেকে নিয়োজিত করেন।
সৈয়দ আহমদ ১৪ বছর বয়সে পুনরায় লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠেন ও স্বীয় চাচার নিকট নিবিষ্ট মনে কোরআনের তাফসীর পাঠ শুরু করেন। এই সময়েই তাঁর ধৈর্য প্রজ্ঞা, অধ্যবসায় ও চিন্তার গভীরতা পরিস্ফুট হয়ে উঠে। পিতার মৃত্যুর পর মাত্র সতের বছর বয়সে সমস্ত পরিবারের ভরণ পোষণের ভার সৈয়দ আহমদের উপর অর্পিত হয়। ফলে নিরুপায় হয়ে তিনি নিজ জন্মভূমি রায়বেরেলী ছেড়ে চাকুরীর সন্ধানে লক্ষ্ণৌ শহরে গমন করেন। লক্ষ্ণৌতে কিছুকাল থাকার পর দিল্লীর খ্যাতনামা কামেলে পীর মওলানা আব্দুল আজীজের কথা জানতে পেরে বায়াত গ্রহণের উদ্দেশ্যে তিনি দিল্লীর পথে রওয়ানা হন এবং তিন দিনের পথ অতিক্রম করে দিল্লীতে গিয়ে পৌঁছেন।
মাওলানা আব্দুল আজীজের দরবারে সৈয়দ আহমদ বিভিন্ন বিষয়ে পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের পাশাপাশি তাঁর খিলাফত লাভ করেন। অতঃপর দেশে ফিরে এসে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন ও দেশ ভ্রমণজনিত বাস্তব অভিজ্ঞতার ফলে সৈয়দ আহমদ নিশ্চিতরূপে বুঝতে পারলেন ইংরেজদের ভারত গ্রাসের ভবিষ্যত পরিকল্পনা। দেশের এই দুঃসময়ে তাই তিনি স্থির থাকতে পারলেন না। প্রাণ তাঁর কেঁদে উঠল। মধ্য ভারতের স্বাধীন নবাব আমীর খানের সৈন্য বাহিনীতে যোগ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আজাদী সংগ্রামে।    [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ