সোমবার ০১ মার্চ ২০২১
Online Edition

অখণ্ড ভারত স্বপ্নে পণ্ডিত জওহর লাল নেহরু

মনসুর আহমদ : পণ্ডিত নেহ্রু সম্পর্কে আলোচনায় শুরুতেই আসে কংগ্রেসের কথা। ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বোম্বাইতে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। A.O. Hume    নামক জনৈক ভারত দরদী সিভিলিয়ন ছিলেন এর প্রধান উদ্যোক্তা। বাংগালী ব্যারিস্টার মি. উমেশ চন্দ্র ব্যানার্জি কংগ্রেসের প্রথম নির্বাচিত সভাপতি।  কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার এক বছর পরে সুরেন্দ্রনাথ কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং ১৯১৮ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত ছিল বাঙালী বর্ণ হিন্দুর প্রধানতম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তাদেরই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সযত্নে লালিত এবং নিজেদের শ্রেণীগত স্বার্থ সংরক্ষণের মুখপাত্র হিসাবে ছিল  তার অস্তিত্ব। গান্ধী ১৯১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয়দের  অধিকার রক্ষার আন্দোলনের নেতা হিসাবে আবির্ভূত হন। তিনি সেখানে কিছুটা সফলতা অর্জনের পর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন এবং তার কর্ম ধারায় কংগ্রেকে ধর্মীয় রূপ দিলেন।  তাঁর আগমনের দুই বছরের মধ্যে তিনি হিন্দু প্রধান কংগ্রেসে স্থান করে নেন। অতঃপর কংগ্রেসের কর্তৃত্ব বাঙালী বর্ণ হিন্দুর হস্তচ্যুত হয়ে গেল। ১৯২০ সালের ডিসেম্বরে নাগপুরে কংগ্রেসের অধিবেশন অনুষ্ঠত হয়। কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনের পর মি. জিন্নাহ্ কংগ্রেস হতে পদত্যাগ করেন। কংগ্রেসের নেতৃত্ব উগ্রপন্থীদের হাতে চলে যাওয়াতে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীও কংগ্রেস থেকে সরে দাঁড়ান। এ ভাবে কংগ্রেসে উগ্রপন্থীদের একাধিপত্য স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে গান্ধীর একান্ত অনুগত শিষ্য নেহরু কেমব্রিজ থেকে ফিরে এলে গান্ধী তার গুরুদায়িত্ব ভার অর্পণ করলেন  যুবক নেহ্রুর ওপর।
নেহেরুর গোটা রাজনৈতিক জীবন ছিল মুসলিম স্বার্থ বিরোধী। গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ায় ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন প্রণীত হয়। এ আইনকে কংগ্রেস প্রত্যাখ্যান করে। নেহেরু একে দাসত্বের সনদ হিসাবে আখ্যায়িত করেন।  ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন অনুযায়ী ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক আইন সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নেহরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস নির্বাচনে আশাতীত বিজয় অর্জন করে। বিজয় উল্লাসে আত্মহারা নেহরু ঘোষণা দিয়ে বললেন,..there “were  only two parties”  in the country_ “congress and the British.”  ‘দেশে মাত্র দু’টি দল আছে- কংগ্রেস এবং সরকার। আর যারা আছে তাদেরকে অবশ্যই কংগ্রেসের কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। যারা আমাদের সাথে নেই , তারা আমাদের বিরোধী।’
জিন্নাহ্ উত্তরে বললেন, “There is a third party... the Muslims,” তিনি আরো বললেন,-  We are not going to be dictated to by any body, We are willing  to co- operate with any group of a progressive and independent character, provided its programme and policy correspond to our own. We are not going to be camp-follower of any party. We are ready to work as equal partners for the welfare of India.
পণ্ডিত নেহেরু এবং কংগ্রেস জিন্নার প্রতি ঘৃণা সূচক মনোভাব পোষণ করে তার ‘to work as equal partners’  প্রস্তাবকে নাকোজ করে দেন। এ ব্যাপারে ইউরোপিয়ান নেতা Sir Percival Griffiths বলেন:-
The congress High command  refused to sanction congress- League coalitions and in the Hindu majority provincess ministries consisting only of congressmen were formed. In the United Provinces , For example, Muslim representatives were invited to join the ministry, but only one condition that they became members of the Congress party  and that Muslim league ceased to exist.   In other provinces, similar conditions were imposed, and with one exeption members of the Muslim League were rigorously  excluded from office.
নেহরু ছিলেন অখণ্ড ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৪৭এ ব্রিটিশ -ভারত ভাগ হওয়ার সময়ে কংগ্রেসের এক অধিবেশনে নেহরু আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, আবেগ যখন থিতিয়ে আসবে , উত্তেজনা যখন প্রশমিত হবে , তখন পুনরেকত্রিকরণ ও ঐক্যবদ্ধ হবার চেতনা নতুন করে বিকশিত হবে।’ বস্তুত ভারতের সমরকুশলবিদরা ও  পরিকল্পকগণ ১৯৪৭ সাল থেকে আজ অবধি ঐ লক্ষ্যকে সামনে রখেই তাঁদের কর্মকাণ্ডকে বিন্যস্ত করেছেন। ভারতের প্রধান মন্ত্রী নেহেরু তাঁর  ‘ডিসকভারী অফ ইন্ডিয়া ’ গ্রন্থে যে বিশাল ভারতের স্বপ্ন ও তাগিদে ভারতীয়দের প্রণোদিত করার চেষ্টা নিয়েছিলেন, সেই বিশাল ভারতের মানচিত্র হিন্দুকুশ থেকে চীন দেশের দক্ষিণাঞ্চল সহ ইন্দো-চীন পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়াকে বাদ দেয়া হয়নি। বিশাল ভারতের স্বপ্নে বিভোর নেহ্রু এবং তার বিশ্বস্ত প্যাটেল ১৯৪৭ -এ ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনকে কখনই অন্তর থেকে মেনে নেননি। ভাবিষ্যতে পুনরেকত্রীকরণ মাধ্যমে অখণ্ড বিশাল ভারত বিনির্মানের  লক্ষ্যই তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিবেশীদের সাথে আচরণ নির্ণীত হয়েছিল। ১৯৪৭ -এর পর থেকেই নেহরুর নেতৃত্বাধীন ভারত পাকিস্তানকে তার প্রধান শত্রু নির্ণয় করে  পাকিস্তানকে খণ্ড বিখণ্ড করার যে লক্ষ্যভেদী পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন  তার বাস্তবায়ন তিনি তাঁর জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারেননি। নেহ্রু যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তাঁর দুহিতা ইন্দিরা সেখানে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছিলেন।
পণ্ডিত নেহরুর বাবা মতিলাল নেহ্রুও মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কম যাননি। ভারতের শাসনতান্ত্রিক ব্যাপার  পর্যালোচনার জন্য বৃটিশ সরকার সাইমন কমিশন নামে একটি কমিমন গঠন করে। কংগ্রেস সাইমন কমিশন বর্জন করে। কংগ্রেস কর্তৃক সাইমন কমিশনের নিন্দা করা হচ্ছিল । তারই জবাবে নেহ্রু রিপোর্ট রচনার ব্যবস্থা করা হয়। নেহেরু রিপোর্ট রচনায় ছিলেন মতিলাল নেহ্রু। ১৯২৮ সালে নেহ্রু রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। দেখা গেল মুসলমানদের আশা অকাক্সক্ষার প্রতি কোন সহানুভূতি তাতে প্রকাশ পায়নি। সব চাইতে নৈরাশ্যজনক ব্যাপার হলো যে নেহেরু রিপোর্ট মুসলমানের স্বতন্ত্র নির্বাচনের প্রথা বিলুপ্তির জন্য মত প্রকাশ করা হয়।  শুধু তাই নয়, রিপোর্ট আরও এক কাঠি উপরে গিয়ে বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশের মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত আসন বাতিল করে দেয়। ফলে রাজনৈতিক মতবাদ নির্বিশেষে মুসলমান নেতারা এই রিপোর্টের প্রতিবাদ করে। এই রিপোর্টের উপরে মন্তব্য করতে গিয়ে মওলানা শওকত আলী বলেন যে যৌবনে তিনি শখ করে একটি গ্রে হাউন্ড কুকুর পুষতেন। কিন্তু তিনি কখনো কুকুরটিকে খরগোশ তাড়া করতে দেখেন নি।  কিন্তু এ রিপোর্ট তাঁর মতে একটি গ্রে হাউন্ড একটি খরগোশকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
এই রিপোর্টের সংশোধনী হিসেবে জিন্নাহ্ তাঁর চৌদ্দ দফা প্রস্তাব পেশ করেন। ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ তারিখে গ্রেট বৃটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।  ভারতের বড় লাট ঘোষণা দেন যে, ভারতও জার্মানির সাথে যুদ্ধে রত। এই ঘোষণা নিয়ে কংগ্রেসের সাথে বড় লাট লিনলিথগোর মতবিরোধ হয়। এই বিরোধ নিয়ে অক্টোবর মাসের শেষের দিকে সকল প্রদেশের কংগ্রেস মন্ত্রী সভা পদত্যাগ করে।  কংগ্রেস মন্ত্রী সভা পদত্যাগ করলে মুসলিম লীগ ২২শে ডিসেম্বর, ১৯৩৯ সাল তারিখে ভারতব্যাপী ‘নাজাত দিবস’ পালন করে।  এ দিনটি ছিল কংগ্রেসের  জুলুম, নির্যাতন, - পীড়ন এবং অবিচার হতে মুক্তির দিন । মুসলমানরা এ দিনটিকে নাজাত দিবস হিসাবে  পালন করায় নেহরু উষ্মা প্রকাশ করে ১৯৩৯ সালের ডিসেম্বর মাসে জিন্নাহকে লিখেন, “মনে হয় আমাদের উদ্দেশ্য বিপরীতমুখী এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা বিভক্ত। আমাদের মধ্যে সমঝোতার জন্য আলোচনা অসম্ভব ও বৃথা।”
ভারতীয়দের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে বৃটিশ সরকারের নীতি ক্যাবিনেট মিশনে সুস্পষ্ট হয়। মুসলিম লীগ নেতা এতে তাঁদের পরিকল্পিত পাকিস্তান দাবির স্বীকৃতি লক্ষ্য করলেন কিন্তু কংগ্রেস নেতারা দেখলেন এককেন্দ্রিক সরকার গঠনের মধ্যে তাঁদের অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন। এ সময় পণ্ডিত নেহরু প্রস্তাবিত গণপরিষদের ক্ষমতা সম্পর্কে নিজস্ব ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি বললেন যে, কেন্দ্রীয় গণপরিষদের  ক্ষমতা হবে  সার্বভৌম। ইহা যে সংবিধান প্রণয়ন করবে বৃটিশ সরকার তার কোন রদবদল করতে পারবে না। লীগ এই বিবৃতির তীব্র প্রতিবাদ করে। অতঃপর ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে বোম্বাইয়ের মুসলিম লীগ সম্মেলনে পাকিস্তান অর্জনের জন্য প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরবর্তীতে দেশময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়। তখন দেশে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। মি. এটলী ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তাঁদের ভারত ছেড়ে যাবার কথা ঘোষণা করেন। সেই উদ্দেশ্যে লর্ড মাউন্টব্যাটেন নতুন ও শেষ বড় লাট হয়ে আসেন।
 বড় লাট হয়ে এসে নেহ্রুর সাথে প্রথম সাক্ষাতে মাউন্টব্যাটেন জিন্নাহর ব্যক্তিগত কিছু ব্যাপারে জিজ্ঞাসা বাদ করেন। এক সময় নেহরু জিন্নাহ্ সম্পর্কে বললেন, “Jinnah Òknew that Pakistan could never stand up to constructive critism , and that he had Òensured that it should never be subject  to it.”
দেশ বিভক্তির দু’মাস পরে স্টেটম্যান পত্রিকার সম্পাদক মাউন্টব্যাটেনের সাথে এক নৈশভোজে মিলিত হন। সে নৈশ ভোজে মাউন্টব্যাটেন ও লেডী মাউন্টব্যাটেনকে মনে হচ্ছিল যেন তারা প্রো-হিন্দু হয়ে গেছেন। সে রাতে গভর্নমেন্ট হাউজের পরিবেশটি যেন প্রায় যুদ্ধাবস্থায় পৌঁছে গেল। মনে হচ্ছিল পাকিস্তান, মুসলিম লীগ এবং মি. জিন্নাহ যেন শত্রু...।
 দেশ বিভক্তি ও ভারতের ক্ষমতা হস্তান্তরের ‘বৃহত্তর পরিকল্পনা’য় ছিল যে বাংলা এবং পাঞ্জাব প্রদেশকে ভাগ করা হবে। মি. জিন্নাহ্ ও মুসলিম লীগের সোহ্রাওয়ার্দী এ পরিকল্পনার সাথে একমত ছিলেন না। কিন্তু জিন্নাহ্কে বার বার চাপ প্রদান করা হচ্ছিল এ পরিকল্পনা মেনে নিতে। এক সময় ভাইসরয় মাউন্ট ব্যাটেন জিন্নাহ্কে বললেন, ‘Mr Jinnah! I do not intend to let you wreck all the work that has gone into this settlement.’ তিনি   জিন্নাহকে আরো বললেন, ‘you will lose  your Pakistan, probably for good.’  লর্ড  ইসমে ভাইসরয়ের পক্ষ থেকে যখন জিন্নাহকে স্মরণ করিয়ে দিলেন যে,  ভারত  ভাগ করতে হলে  জনগণের ইচ্ছানুসারে বাংলা ও পাঞ্জাবকেও ভাগ করতে হবে তখন জিন্নাহ্ উত্তর দিলেন, “Better  a moth eaten Pakistanthat no Pakistan at all.” 
পক্ষান্তরে যখন নেহরুর হাতে এ প্রস্তাব সম্মলিত পরিকল্পনা  পৌঁছল তখন তিনি তা পড়ে বললেন, “While there could never be complete approval by congress, on balance they accept it.” এ ভাবেই নেহেরু বেঙ্গল প্রভিন্স বিভক্তিতে সম্মতি প্রদান করলেন, যা ছিল মুসলমান স্বার্থ বিরোধী এক কার্যক্রম। কংগ্রেসের মুসলিম স্বার্থ বিরোধী আচরণ রূপ ফুটে উঠেছিল জিন্নাহর এক কথায় । তিনি ভাইসরয়কে বলেছিলেন, “The Congress want to inherit everything: they would even  accept Dominion Status to deprive  me of Pakistan.” 
এ প্রস্তাবে নেহরুর  রাজি হওয়াটা ছিল এক চক্রান্তের অংশ, যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিল বঙ্গ ভঙ্গ থেকে। বঙ্গ ভঙ্গ পরিকল্পনা বিষয়ে পণ্ডিত নেহরুর ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। তদানীন্তন কংগ্রেস নেতা কুমিল্লার আশরাফ উদ্দীন চৌধুরীর এক পত্রের জবাবে ১৯৪৭ সালের মে  মাসে নেহ্রু তাঁকে যে চিঠি লিখেন, তাতে বলেন:‘ অখণ্ড ভারতের নীতিকে আমরা জলাঞ্জলি দিয়েছি, এ কথা সত্য নয়। তবে আমরা কোন কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না।
ভারত বিভাগ মেনে নেব আমরা একটি শর্তে যে, বাংলা ও পাঞ্জাবকে বিভক্ত করতে হবে।  কারণ একমাত্র এ পথেই অখণ্ড ভারত পুনরায় ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে।’ এ প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন যে  ব্রিটিশ শাসনোত্তর ভারতীয় শাসক গোষ্ঠী কখনই ১৯৪৭- এর ব্রিটিশ ভারত বিভাজনের বিষয়টিকে  স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত বলে মেনে নেয়নি। নেহ্রু মুসলমানদের পাকিস্তান দাবিকে অনেক ছোট করে দেখতেন। তিনি এক আমেরিকান রিপোর্টারকে বলেছিলেন, There is now a demand on the part of some Muslim for partition of India.... Few take it  seriously…” তার এ দাবি ছিল আসলে অসত্য।  শুধু তাই নয় ভারতীয় তাত্ত্বিক ও রাজনীতিকগণ হিন্দুকুশ থেকে শুরু করে ইন্দোচীন পর্যন্ত একটি মনোময়  রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে আসছেন। পণ্ডিত জওহর লাল নেহরু  একে দেখছেন ‘বিরাট ভারত’ হিসেবে। ১৯৪৭ সাল থেকে আজ অবধি ভারতেরশাসক শ্রেণী ‘বিরাট ভারত’ স্বপ্ন কখনো পরিত্যাগ করেনি। নেহরু ছিলেন অখণ্ড ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা। ১৯৪৭এ ব্রিটিশ-ভারত ভাগ হওয়ার সময়ে কংগ্রেসের এক অধিবেশনে নেহেরু আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, আবেগ যখন থিতিয়ে আসবে, উত্তেজনা যখন প্রশমিত হবে, তখন পুনরেকত্রিকরণ ও ঐক্যবদ্ধ হবার চেতনা নতুন করে বিকশিত হবে।’ বস্তুত ভারতের সমরকুশলবিদরা ও পরিকল্পকগণ ১৯৪৭ সাল থেকে আজ অবধি ঐ লক্ষ্যকে সামনে রখেই তাদের কর্মকা-কে বিন্যস্ত করেছেন। ভারতের প্রধান মন্ত্রী নেহেরু তাঁর  ‘ডিসকভারী অফ ইন্ডিয়া ’ গ্রন্থে যে বিশাল ভারতের স্বপ্ন ও তাগিদে ভারতীয়দের প্রণোদিত করার চেষ্টা নিয়েছিলেন, সেই বিশাল ভারতের মানচিত্র হিন্দুকুশ থেকে চীন দেশের দক্ষিণাঞ্চল সহ ইন্দো-চীন পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়াকে বাদ দেয়া হয়নি। বিশাল ভারতের স্বপ্নে বিভোর নেহেরু এবং তার বিশ্বস্ত প্যাটেল ১৯৪৭ -এ ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনকে কখনই অন্তর থেকে মেনে নেননি। ভবিষ্যতে পুনরেকত্রীকরণ মাধ্যমে অখণ্ড বিশাল ভারত বিনির্মাণের  লক্ষ্যই তার পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিবেশীদের সাথে আচরণ নির্ণীত হয়েছিল। ১৯৪৭ -এর পর থেকেই নেহেরুর নেতৃত্বাধীন ভারত পাকিস্তানকে তার প্রধান শত্রু নির্ণয় করে  পাকিস্তানকে খণ্ড বিখণ্ড করার যে লক্ষ্যভেদী পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন তার বাস্তবায়ন তিনি তাঁর জীবদ্দশায় দেথে যেতে পারেন নি। নেহরু যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন, তার দুহিতা ইন্দিরা সেখানে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছিলেন। তখন তিনি আনন্দ গৌরবে বলেছিলেন, ‘হাজার সালকা বদলা লিয়া’ অর্থাৎ পাকিস্তানকে ভেঙে তিনি হাজার বছরের মুসলিম শাসনের প্রতিশোধ নিলেন। ধর্মের বিরুব্ধে নেহ্রুর ছিল প্রকাশ্য ক্ষোভ। তিনি বলেছেন, “যে জিনিসটাকে ধর্ম এবং সংগঠিত ধর্ম বলা হয়, তাকে ভারতে ও অন্যান্য যায়গায় দেখে দেখে আমার মন আতংক গ্রস্ত হয়ে পড়েছে। আমি প্রায়ই ধর্মের নিন্দা করে এসেছি এবং প্রায়ই তাকে উচ্ছেদ করার বাসনা পর্যন্ত প্রকাশ করেছি। আমার প্রায় সব সময়ই এ রকম মনে হয়েছে যে, এটা অন্ধ বিশ্বাস, প্রগতির বিরোধী, অযৌক্তিক ভক্তি, গোঁড়ামী, অলীক কল্পনা ও কুসংস্কার, মানুষকে অন্যায় ভাবে শোষণ এবং কায়েমী স্বার্থ ও সুবিধাবাদীদের স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখার পক্ষপাতী।” তিনি ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বিকৃত ভাবে পেশ করতে লিখেছেন, “ইসলামী সভ্যতা সংস্কৃতি স্বতন্ত্র কোন জিনিস নয়। শত শত বছর আগে মোগল ও পাঠানদের শাসনকালে মুসলমান সমাজে যে রীতি প্রথা চালু হয়ে গিয়েছিল তারই নাম দেয়া হয়েছে ইসলামী সভ্যতা ও তমদ্দুন। আজ যে সকল মুসলমান  ইসলামী তাহজীব ও তমদ্দুন রক্ষা করার নামে হৈচৈ জুড়ে দিয়েছেন, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, অতীতের সেই ঐতিহাসিক উত্তারাধিকারকে এ পরিবর্তিত যুগে হুবহু চালু রাখা। তাই তারা প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রগতির শত্রু।” নেহরুর লক্ষ্য ছিল যে মুসলমানরা যেন অনৈসলামী জাতীয়তায় বিলীন হয়ে যায়। আর “যেসব সামাজিক ও রাজনৈতিক   সংঘ বা সংস্থা এ পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে, তাদেরকে নিশ্চিহ্ন  করে  দিতে হবে।”- এটাই ছিল তার সিদ্ধান্ত। তাদের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা আজও বলবৎ রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ