রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

অজ্ঞাত স্থান থেকে হুম্মাম কাদেরকে ফেরত 

স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপি নেতা মরহুম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পুত্র হুম্মাম কাদেরকে ফেরত দিয়ে গেছে ‘অজ্ঞাত বাহিনী’। গত বুধবার রাত ৩টায় ‘অজ্ঞাত বাহিনী’ হুম্মাম কাদেরকে তাদের ধানমন্ডির বাসার কাছে রেখে গেছে বলে জানা গেছে। পারিবারের দাবি, সাত মাস আগে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুম্মাম কাদের চৌধুরীর বেশ কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ছবিতে দেখা যায় হুম্মাম বেশ শুকিয়ে গেছেন। চুল কাটেননি অনেকদিন ।

এদিকে দীর্ঘ সাত মাস পর হুম্মাম কাদের বাড়ি ফিরে আসায় আশার সঞ্চার করেছে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের নিখোঁজ ছেলে বিগ্রেডিয়ার আবদুল্লাহিল আমান আযমী এবং মীর কাশেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাশেমের (আরমান) স্বজনদের মাঝে। তারা আশা করছেন, আযমী ও আরমানও একদিন ফিরে আসবেন। পথের দিকে তাকিয়ে আছেন কখন তারা ফিরবেন।  

জানা গেছে, সাত মাস আগে ৪ আগস্ট দুপুরে ঢাকা সিএমএম আদালতের সামনে থেকে ‘ডিবি’ পরিচয়ে হুম্মাম কাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় । তার আইনজীবী মিনহাজ উদ্দিন চৌধুরী শিবলী তখন জানিয়েছিলেন, নিম্ন আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে আদালতে গেলে এ ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে হাজিরার সময় হুম্মাম কাদের ও তার মা ফারহাত কাদের চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। তারা নিয়মিত হাজিরা দিতেই সেখানে গিয়েছিলেন। এ সময় ডিবি পরিচয় দিয়ে আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই হুম্মামকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।’ পরে হুম্মামকে ছাড়াই ফারহাত কাদের ওই মামলায় হাজিরা দেন বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।

তবে হুম্মামকে পুলিশ আটক করেছে কিনা, আটক করা হলে তাকে কোথায় নেয়া হয়েছে, এসব বিষয়ে পুলিশের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি তৎকালীন সময় থেকে আজ অবধি।

মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু তার আগেই ইন্টারনেটে সেই রায় প্রকাশ হয়ে যায়। এই ঘটনায় সালাউদ্দিন কাদেরের স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী, ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সাকা চৌধুরীর আইনজীবী ফখরুল ইসলামসহ সাতজনের বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলার করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগ।

মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে হুম্মামদের পারিবারিক বন্ধু পরিচয় দিয়ে সায়েম নামের একজন বলেন, তিনিও ওই গাড়িতে ছিলেন। ছয়জন গাড়ির গতিরোধ করে। হুম্মামকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ডিবির পরিচয় দেয় তারা। হুম্মামকে ডিবি কার্যালয়েই রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন সায়েম।

ব্যারিস্টার আরমান ও আযমীর অপেক্ষায় স্বজনরা

দীর্ঘ সাত মাস পর  হুম্মাম কাদের বাড়ি ফিরে আসায় আশার সঞ্চার করেছে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার আবদুল্লাহিল আমান আযমী এবং মীর কাশেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাশেমের (আরমান) স্বজনদের মাঝে। তারা আশা করছেন, আযমী ও আরমানও একদিন ফিরে আসবেন। পথের দিকে তাকিয়ে আছেন কখন তারা ফিরবেন।  

মরহুম মীর কাশেম আলীর স্ত্রী খোন্দকার আয়েশা বলেন, আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত যে কতটা কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা কাউকে বুঝাতে পারবো না। সবসময় পথের তাকিয়ে থাকি- এই বুঝি আমার সন্তান (আরমান) ফিরছে। সাত মাস পর হুম্মাম কাদের বাড়ি ফিরে আসায় আমরা কিছুটা হলেও আশাবাদী একদিন আমার সন্তান ফিরে আসবে।  

গত বছরের ৯ আগস্ট  মীর কাশেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাশেম (আরমান) এবং ২২ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার আমান আযমীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে। নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাদের আর কোনো খবর নেই।

মিরপুর ডিওএইচএস-এর বাসা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাশেম আরমানকে। তাকে উঠিয়ে নেয়ার আগের রাতে ইউনিফর্ম পরিহিত পোশাকে র‌্যাব গিয়েছিল বাসায়। তখন তাকে তাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য চাপ দিলে আরমান জানতে চায় কেন যেতে হবে। তাদের সাথে কোনো ওয়ারেন্ট রয়েছে কিনা!

এ নিয়ে কাটাকাটির একপর্যায়ে র‌্যাব পরিচয়ধারীরা সেই রাতে তাকে না নিয়েই চলে যায়। কিন্তু পরের রাতে সাদা পোশাকে আসা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে মা, বোন এবং স্ত্রীর সামনে থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়।

তার ১৩ দিনের মাথায় সেনাবাহিনীর সাবেক চৌকস কর্মকর্তা যিনি কর্মজীবনের শুরুতে সোর্ড অব অনার পেয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার আযমীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে নেয়ার সময় বাসার আশেপাশের রাস্তায় লাগানো সরকারি সিসি ক্যামেরাও খুলে ফেলা হয়। এমনকি বাসায় নিজেদের ব্যবস্থাপনায় লাগানো সিসি ক্যামেরাও তছনছ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করে, ব্যারিস্টার আহমেদ বিন আরমানের এক খালাতো ভাই তার খালার খোঁজ-খবর নিতে বাসায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সঙ্গে রান্না করা কিছু খাবারও নিয়েছিলেন খালার জন্য। মিরপুর ডিওএইচএসের বাসার সামনে প্রবেশ করতেই পুলিশের বিশেষ শাখার লোক তাকে আটকায়। কেন এই এলাকায় গিয়েছে, গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা ইত্যাদি বলে প্রায় একঘণ্টা আটকে রাখে। পরে রান্না করা খাবার না নিয়েই মাত্র ২০ মিনিটের জন্য মীর কাশেম আলীর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়া হয়।

গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি। ৭ মাস পার হয়ে যাচ্ছে। তাদের পরিবার পথ চেয়ে অপেক্ষায়। কখন ফিরবে আপনজন। কিন্তু র‌্যাব-পুলিশের পক্ষ থেকে তাদেরকে আটকের বিষয়টি বরাবরই অস্বীকার করা হচ্ছে। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় জিডি করা হয়। কিন্তু পুলিশ তাদের খুঁজে বের করার বিষয়ে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেয়নি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, তাদের পরিবারের কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। অভিযোগ করলে পুলিশ তাদেরকে খুঁজে বের করবে।’

যেভাবে তাদের উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল

গত ২২ আগস্ট রাত ১২ টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (সাবেক) আমান আযমীকে মগবাজার কাজী অফিস লেনের বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি ঘটনার দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৮-১০টি গাড়ি ওই গলিতে প্রবেশ করে। তারা সবাই ছিল সাদা পোশাকে। সাদা পোশাকে আসা ব্যক্তিরা মহল্লার সিসি ক্যামেরা খুলে ফেলে এবং গলির বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়। মরহুম গোলাম আযমের বাসায় প্রবেশ করে তার বড় ছেলেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে কয়েকমাস পেরিয়ে গেলেও আযমীর কোনো খোঁজ মিলেনি। আত্মীয়রাও তার কোনো সন্ধান পাননি।

বাড়ির কেয়ারটেকারকে উদ্ধৃত করে ঘটনার সময় জামায়াতে ইসলামীর ওয়েব সাইটে বলা হয় ‘আযমীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় গোয়েন্দা পুলিশের সদস্য কোথায় কোথায় সিসি ক্যামেরা আছে দেখিয়ে দিতে বলে। পরে তারা মহল্লা থেকে সিসি ক্যামেরাগুলো খুলে নিয়ে যায়।’

মরহুম গোলাম আযমের লন্ডন প্রবাসী ছেলে সালমান আল-আযমী অভিযোগ করেন তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো মামলা নেই। শুধু গোলাম আযমের ছেলে হবার কারণেই সরকার পরিকল্পিতভাবে তাকে তুলে নিয়ে গুম করেছে।’

সাদা পোশাকে নিরাপত্তা বাহিনী গোলাম আযমের ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য শত শত মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাদেরই একজন মগবাজার কাজী অফিস লেনের দোকানদার আব্দুল মালেক। তিনি জানান, এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য আমরা সবাই দেখেছি। অথচ দীর্ঘদিনেও তার খোঁজ মিলেনি।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমীর রহস্যজনক গুম বিষয়ে ঢাকা মহনগর পুলিশের রমনা থানার অফিসার ইনচার্জ মসিউর রহমান বলেন, ঘটনার সময় (২২ আগস্ট) খবর পেয়ে পুলিশের একটি টহলদল কাজী অফিস লেনে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তার আগেই আগন্তুকরা সেখান থেকে চলে গেছে। ঘটনার পর দিন পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করার জন্য লোকজন থানায় আসে। যেহেতু অভিযোগটি ‘তুলে নেয়ার’ তাই আমরা মামলা করতে বলেছি। কিন্তু তারা (আযমীর পরিবার) মামলা না করেই চলে গেছে।

৯ আগস্ট জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাশেমকে (আরমান) রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসের বাসা থেকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়। ১০ আগস্ট আরমানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার পল্লবী থানায় এ বিষয়ে জিডি করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন ৯ আগস্ট রাত ১১টার দিকে সাদা পোশাকে একটি মাইক্রোবাস আরমানকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় পাঁচজন লোক তাদের বাসায় যায়। তারা কলিং বেল চাপলে তিনি দরজা খুলে দেন। ওই ব্যক্তিরা নিজেদের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেয়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আরমানকে তাদের সঙ্গে যেতে বলেন। ওই ব্যক্তিরা কোন সংস্থার জানতে চাইলে তারা বিস্তারিত পরিচয় না দিয়ে শুধু আরমানকে তাদের সঙ্গে যেতে বলেন। কিন্তু আরমান তাদের সঙ্গে যেতে রাজি না হওয়ায় আরমানকে টেনে-হিঁচড়ে নিচে নিয়ে নামিয়ে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে তুলে নেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ দাদন ফকির বলেন, আরমানের স্ত্রী থানায় একটি জিডি করছেন। কারা তাকে তুলে নিয়েছে সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জিডির তদন্ত অব্যাহত আছে।

একরকম গৃহবন্দী সবার পরিবার

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (সাবেক) আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও ব্যারিস্টার আহমেদ বিন কাশেমকে গুম করার মধ্য দিয়েই তৎপরতা থেমে যায়নি। দু’জনের পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্য এখন নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে থেকে একরকম গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর হয়রানি ও মারধরের শিকার হয়ে বাসার গৃহকর্মীরা অনেক আগেই চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। বাসার বাজার করতে গেলেও আসা-যাওয়ার পথে পুলিশী তল্লাশির মুখে পড়তে হয়। 

পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসআই) ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সার্বক্ষণিকভাবে ওই দু’জনের বাসায় কঠোর নজরদারি রেখেছে। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। ফলে পরিবারের অপর সদস্যরাও একরকম গৃহবন্দী হয়ে পড়েছেন। কোনো স্বজন বাসায় দেখা করতে গেলে তাদেরকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এমনকি মারধরেরও শিকার হতে হয়। এমতাবস্থায় পরিবার দু’টি অনেকটাই অঘোষিত কারাগারে দিনাতিপাত করছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ