শুক্রবার ০৭ আগস্ট ২০২০
Online Edition

আস্থা অর্জনই নয়া ইসি’র সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

স্টাফ রিপোর্টার : বিগত রকিবউদ্দীন আহমদের কমিশনের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠাই নতুন নির্বাচন কমিশনের প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে অভিমত দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। একই সাথে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করারও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করেন তারা।  নির্বাচন কমিশনের হারিয়ে যাওয়া আস্থা আস্তে আস্তে ফিরিয়ে আনতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সকল কর্মকর্তার কথাবার্তা, আচার-ব্যবহারে যেন সবার এমন আস্থা থাকে যে, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করবেন না। 

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সুশাশনের জন্য নাগরিক-সুজন আয়োজিত ‘নতুন নির্বাচন কমিশনের সামনে চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনেরা এ মত প্রকাশ করেন। সুজনের সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে  বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড.এটি এম শাসসুল হুদা, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক বিচারপতি আব্দুল মতিন, লেখক ও গবেষক সৈয়দ মকসুদ, সুজন সম্পাদক  ড. বদিউল আলম মজুমদার, সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষক আসিফ নজরুল প্রমুখ।

ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেন, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হলে তার নিজস্ব কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা বিসিএস ক্যাডার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। কারণ নির্বাচনকালে বাইরে থেকে যে জনবল নিয়োগ দেয়া হয় তাদের ওপর কমিশনের তেমন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। 

শামসুল বলেন, এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে- তারা কি চায়। আর ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) তৈরিতে এমন লোকদের দায়িত্ব দিতে হবে যেন তাদের ওপর সবার আস্থা থাকে। যাকে তাকে দিয়ে এটা করা ঠিক হবে না। 

 স্টেক হোল্ডারদের মতামত নিয়ে ই-ভোটিংয়ের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে বর্তমান কমিশনকে। ছোট ছোট নির্বাচন করে তারা প্রমাণ করবেন যে, তারা সৎ, দক্ষ, যোগ্য এবং দেশপ্রেমিক, যাতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের প্রতি মানুষের আস্থা থাকে। 

তিনি আরও বলেন, নতুন কমিশনের প্রধান কাজ হবে জনগণের আস্থা অর্জন করা। নতুন কমিশনের উচিত হবে রকীব কমিশন অহেতুক যেসব পরিবর্তন এনেছে তা ঠিক করা। এ সময় তিনি বিগত কমিশনের সময়ে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) চলমান না রাখা ও ইসি কর্মকর্তাদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিধানের পরিবর্তনের সমালোচনা করেন।

ড. হুদা বলেন, নিধিরাম সর্দার হতে গেলে ঢাল-তলোয়ার লাগবে, কর্মী বাহিনী লাগবে। ওখানে তাদের ডাউনগ্রেড করে ডেমোনাইজ করে আপনি এখন ডেপুটেশনে লোক আনার ব্যবস্থা রাখছেন। ইভেন ডিস্ট্রিক্ট ইলেকশন অফিসারও ডেপুটেশনে আনা যাবে, যেটা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সাবেক এই সিইসি আরো বলেন, কমিশন এবং কমিশনের কর্মকর্তা যারা, তাদের কথাবার্তায়, কাজকর্মে জনগণের মনে আস্থার সৃষ্টি হতে হবে। যেনো, এই লোকগুলো কোনো দলবাজি করছে না, যেটা উচিত সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনই নতুন কমিশনের বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ মনুষের মনে আশংকা, তাদের ভোট তারা দিতে পারবে কিনা। এছাড়া আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু করাও বড় চ্যালেঞ্জ। সংবিধানের পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। এমন ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে কোড অব কন্ডাক্ট সংশোধন করা যায় কিনা এটাও কমিশনকে ভাবতে হবে। 

তিনি আরও বলেন, একটা ইলেকশন কমিশন বা একটা সিস্টেমের ওপরে মানুষের যখন বিশ্বাস হটে যায়, তখন ভালো কিছু আশা করা তার পক্ষে খুব দুরূহ হয়ে যায়। যদি সেই ইনস্টিটিউশনটি প্রপারলি (সঠিকভাবে) পরিচালিত না হয়। কাজেই প্রথম চ্যালেঞ্জ এই নির্বাচন কমিশনের সামনে হচ্ছে সেই বিশ্বাসযোগ্যতাকে ফিরিয়ে আনা।

তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নয়। তাই উপজেলা বা সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রমাণ হবে না। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন হচ্ছে ক্ষমতার পালা বদলের বিষয়। 

 বিচারপতি আব্দুল মতিন বলেন, নির্বাচনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন যাতে ঘটে কমিশনকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার জন্য সব ধরনের ক্ষমতা কমিশনকে দেয়া আছে। এখন কমিশন সেগুলো ব্যবহার করবে কিনা সেটা তাদের বিষয়।

  সৈয়দ মকসুদ বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশনের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ। আগামী সংসদ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ  তৈরি করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। 

তিনি বলেন, এই নির্বাচন কমিশনের সামনে দু’টি বিকল্প আছে। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে প্রশংসিত হওয়া। দ্বিতীয়টি হলো একটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিয়ে ইতিহাসে নিন্দনীয় হওয়া। একুশ শতকে বাঙালি জাতি নিন্দনীয় হওয়াও অপছন্দ করে না। নতুন কমিশন কেবল দায়িত্ব নিল, কাজেই এখনই তাদের নিয়ে কিছু বলা ঠিক হবে না। 

 ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তারা (নির্বাচন কমিশন) সফল না হলে তারা যেমন দায়ী হবেন, ঠিক তেমনিভাবে দায়ী হবেন সরকার এবং যে অনুসন্ধান কমিটি তাদের খুঁজে বের করেছেন।

অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, আমি বিশ্বাস করি , চারজন লোক, পাঁচজন লোক বা তিনজন লোকের পক্ষে সমস্ত প্রতিকূলতাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব।

কিন্ত দলকানা শত লোক দিয়েও নির্বাচন সুষ্ঠু করা সম্ভব নয়। রকিব কমিশন বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার যে ক্ষতি করেছে তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। জনগণের আস্থা এতটাই হারিয়েছে তারা মনে করে ভোট দিলে যে ফল হবে আর না দিলেও একই ফল হবে। তাদের ভোটের আর কোন মূল্য নেই।

বিগত নির্বাচনের যে চিত্র আমরা দেখেছি তা যেন আবার দেখতে না হয়। এমনও দেখা গেছে, ভোট কেন্দ্রগুলোতে প্রশাসনের লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে কিন্তু কোন ভোটার উপস্থিতি নেই। অথচ সে কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা পাঁচ হাজার। তাহলে তারা কেন উপস্থিত হলো না। কারণ ভোটাধিকারের ব্যাপারে তাদের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে এই নেতিবাচক ধারণা কাটিয়ে উঠতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ