শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বগুড়ায় ১৩ শহীদের রক্তে ভেজা ৩ মার্চের ৪র্থ বার্ষিকী আজ

বগুড়া : মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর ২০১৩ সালের ৩ মার্চ বগুড়ায় জনতার বিক্ষোভ দমনের সময় পুলিশের গুলীতে নিহতদের একাংশ

 

বগুড়া অফিস : বিশ্ব বরেণ্য মুফাস্সির ও জামায়াত নেতা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর ছড়িয়ে পড়া গণবিস্ফোরণে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচার গুলী বর্ষণের ৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৩ সালের এই দিনে বগুড়াবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল এই ঘটনা। হাজার হাজার মানুষের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর বুলেটে ঝরে পড়েছিল ১৩টি তাজাপ্রাণ। পঙ্গু হয়েছিল অর্ধশতাধিক নিরীহ মানুষ। ১৯ জন গুলীবিদ্ধসহ আহত হয়েছিল অসংখ্য বিক্ষোভকারী। এ ঘটনায় প্রায় পৌনে দুইশ’ মামলায় আসামী করা হয় জামায়াত-শিবিরের প্রায় পৌনে দুই লাখ নেতাকর্মীকে। গ্রেফতার করা হয় এক হাজারেরও বেশি নেতাকর্মীকে। সেদিনের সেই রক্তাক্ত ঘটনার পর মিথ্যা মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে আজও ঘরছাড়া বগুড়ার হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ। জামায়াত-শিবিরের কয়েক হাজার নেতাকর্মী আজও নিজ বাড়িতে রাতে ঘুমাতে পারে না। প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে নিরাপত্তা বাহিনীর গ্রেফতার আতংক।

মানবতাবিরোধী মামলায় বিশ্ব বরেণ্য মুফাস্সির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণার পর বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল সারা দেশ। ২০১৩ সালের মার্চ দিবাগত রাতের মধ্যভাগ থেকে বগুড়ার গ্রামেগঞ্জে, শহরে বন্দরের রাজপথ নামে তৌহিদি জনতা। ফজর নামাযের পর হাজার হাজার মানুষ গ্রাম থেকে শহরের দিকে ছুটতে থাকে। জেলার শাজাহানপুর, মোকামতলা, নন্দীগ্রাম, দুপচাঁচিয়া, গাবতলীতে কয়েক লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে গুলী চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। গুলীতে শাজাহানপুরে আব্দুল্লাহ আল কাফি, আছিয়া বেওয়া (আকলিমা), মুনজিলা বেওয়া, রাজেনা খাতুন, মোকামতলায় জিয়াউর রহমান, ওবায়দুর রহমান, সহিদ মিয়া, দুলু মিয়া এবং আফিজ উদ্দিন এবং বগুড়া শহরে আলমগীর হোসেন, টিটু রহমান, আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদল নিহত হয়। পরবর্তীতে গুলীবিদ্ধ সেলিম হোসেন চিকিৎসাধীন অবস্থায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। ১৯ জন গুলীবিদ্ধসহ আহত হয় কমপক্ষে দুই শতাধিক। অনেকেই চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে দুর্বিসহ জীবন কাটছে অনেকেরই।

এ ঘটনার পর পুরো ঘটনার জন্য প্রশাসন জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করে নেতাকর্মীদের নামে একের পর এক মামলা দায়ের করে। জেলা পুলিশের হিসেব মতে, শুধুমাত্র ৩রা মার্চের ঘটনায় ৫৬টি মামলা করে পুলিশ। এছাড়া আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সর্বমোট ৭৫টি মামলা করা হয় জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে। এসব মামলায় বিএনপি নেতাকর্মী এবং সাধারন মানুষকেও আসামী করা হয়। জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিনসহ গ্রেফতার করা হয় প্রায় ১ হাজার জনকে। ৩ মার্চের চতুর্থ বর্ষপূর্তির এই দিনে পুলিশের গুলীতে নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। প্রিয়জনকে হারিয়ে সর্বশান্ত এসব পরিবারের সদস্যরা তাদের প্রিয়জনদের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে মামলাও করতে পারেনি। পুলিশ কারো মামলা নেয়নি। উল্টো এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের অভিযুক্ত করে তাদের নামে একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। অনেক নিরীহ মানুষও জেল খেটেছেন এসব মামলায়।

এই ঘটনার চার বছর পর পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে গেছে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে ৩ মার্চের রক্তঝরা স্মৃতি। সরকারের কঠোর ভূমিকার কারণে রাজপথে নেই জামায়াত-শিবিরের উল্লেখযোগ্য তৎপরতা। এমনকি এই দিনটিতেও কোনো কর্মসূচি নিতে পারেনি তারা। গুলীতে নিহতদের জন্য কোনো দোয়া মাহফিলেরও আয়োজন নেই আজকের দিনে। যদিও এই দিনের ঘটনায় দায়ের করা প্রায় দুইশ’ মামলার আসামী হয়ে ফেরারি জীবন কাটছে হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ