বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ধর্মঘটের দায়

গত মঙ্গলবার ধর্মঘটের নামে জনগণকে জিম্মি ও ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকরা সারাদেশে যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি করেছিল তার দায় কার এবং কোন বিশেষজন বা কোন গোষ্ঠী শ্রমিকদের উসকানি ও প্রশ্রয় দিয়েছিলেন সে প্রশ্নের উত্তর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এসব আলোচনায় আঙুল ওঠানো হচ্ছে একজন প্রভাবশালী ও ক্ষমতাদর্পী মন্ত্রীর দিকে। তিনি শুধু মন্ত্রী নন, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের প্রধান নেতাও। গতকাল দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এমনকি খোদ ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও এই মন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে জোর সমালোচনা চলছে। তার বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে সোচ্চার হয়েছেন মন্ত্রীসহ অনেক নেতাই। তাদের বাইরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একই মন্ত্রীর ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি সেই সাথে বলেছেন, একজন প্রতিমন্ত্রীও পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা পালন করেছেন। এই দু’জন নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য শ্রমিকদের উসকানি দিয়েছেন। তাদের দিয়ে ধর্মঘট করিয়েছেন। 

ওদিকে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক স্মারকলিপিতে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে ওই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে শপথ ভঙ্গের অভিযোগ এনেছেন। স্মারকলিপিতে অ্যাডভোকেট ইউনুস আলী আকন বলেছেন, সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শপথ ভঙ্গ করার দায়ে এবং ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বেআইনী ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানানোর দায়ে তাকে মন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। কারণ, আদালতের দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট করানোর মধ্য দিয়ে ওই মন্ত্রী আদালত অবমাননার শামিল অপরাধ করেছেন। সিনিয়র অনেক আইনজীবীও একই অভিযোগ তুলেছেন। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘটের উসকানি ও নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও ওই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। 

এভাবে সব মিলিয়েই এ অভিযোগ অনস্বীকার্য হয়ে উঠেছে যে, মঙ্গলবারের আকস্মিক পরিবহন ধর্মঘটের পেছনে ওই বিশেষ মন্ত্রীর উসকানি ও মদদ ছিল। প্রকৃতপক্ষে শ্রমিকদের দিয়ে ধর্মঘট তিনিই করিয়েছিলেন। এ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে। যেমন একটি খবরে জানানো হয়েছে, সোমবার দুপুরে খুলনায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে শ্রমিক নেতাদের বৈঠকে চলমান ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়ার পর দিবাগত গভীর রাতে ওই মন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত পরিবহন শ্রমিক নেতাদের বৈঠকে মঙ্গলবার আকস্মিকভাবে ধর্মঘট শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। প্রকাশিত রিপোর্টগুলোতে মন্ত্রীর কিছু বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে, যার প্রতিটিই উসকানিমূলক। যেমন তিনি বলেছেন, চালকরা নাকি মনে করে, মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ মাথায় নিয়ে গাড়ি চালানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্যই তারা নাকি স্বেচ্ছায় ‘অবসরে’ গিয়েছিল, ধর্মঘট করেনি! 

উল্লেখ্য, ঢাকা ও মানিকগঞ্জের পৃথক দুটি আদালতের রায়ে একজন চালককে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছিল। এ আদেশ দুটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর উদ্দেশ্যেই পরিবহন শ্রমিকরা মঙ্গলবার হঠাৎ ধর্মঘট শুরু করেছিল। অথচ আদালতের দেয়া যে কোনো রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর এবং রায় পরিবর্তন করানোর আইনসম্মত পন্থা হলো উচ্চতর আদালতে আপিল করা। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী শ্রমিক নেতাদের দায়িত্ব ও করণীয় স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। একজন ঝানু শ্রমিক নেতা হিসেবে ওই মন্ত্রীরও কথাটা নিশ্চয়ই জানা রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও  তিনি এমন এক কঠোর ও বেআইনী কর্মসূচির দিকে শ্রমিকদের ঠেলে নিয়ে গেছেন যা সকল মূল্যায়নেই আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে। অর্থাৎ একজন মন্ত্রী হয়েও তিনি আদালত অবমাননার পথে পা বাড়িয়েছেন। বলা যায়, ক্ষমতাদর্পী বলেই মন্ত্রী মহোদয় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করতে সামান্য দ্বিধা করেননি। একই কারণে তার বিরুদ্ধে শপথ ভঙ্গের অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন দল ও মহল তাকে মন্ত্রীর পদ থেকে বিদায় করার এবং আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রকাশিত রিপোর্টগুলো সত্য হলে ওই বিশেষ মন্ত্রী এবং তার সহযোগী হিসেবে বর্ণিত একজন প্রতিমন্ত্রী শপথ ভঙ্গের পাশাপাশি আদালত অবমাননার গুরুতর অপরাধ করেছেন। দুটি অপরাধই আইনত দণ্ডনীয়। প্রসঙ্গক্রমে আমরা জনগণের কষ্ট-ভোগান্তি ও ক্ষয়ক্ষতির কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, যেগুলো অপূরণীয়। ৩৯ ঘণ্টার সব ক্ষয়ক্ষতির দায়-দায়িত্বও বিশেষ মন্ত্রীকেই বহন করতে হবে। তাছাড়া শ্রমিকরা পুলিশের গাড়িতে ও ক্যাম্পে আগুন দিয়েছে। পুলিশের গুলীতে একজন শ্রমিক নিহতও হয়েছে। অর্থাৎ ক্ষয়ক্ষতি ধারণার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আমরা আশা করতে চাই, বিষয়টি নিয়ে পানি বেশি ঘোলা হয়ে ওঠার আগেই সরকার তথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিক থেকে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী অভিযুক্ত মন্ত্রীর ব্যাপারে উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নেয়া হবে। সেটা না করে মন্ত্রীকে যদি ছাড় দেয়া হয় তাহলে কিন্তু এই অভিযোগই শক্তিশালী হয়ে উঠবে যে, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে সম্ভাব্য আন্দোলন প্রতিহত করার এবং মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে দেয়ার কৌশল হিসেবে সরকারই আসলে ওই মন্ত্রীকে দিয়ে হঠাৎ ধর্মঘট করিয়েছিল। তেমন অবস্থায় মানুষের সকল দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতির দায়-দায়িত্বও সরকারের ওপরই বর্তাবে। নিহত শ্রমিকের পরিবারকে যথোচিত ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রশ্নও আসবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ