বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মতিউর রহমান মল্লিক: একজন অমর শিল্পী

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ : সুন্দরের আলো-আঁধার নিয়ে শিল্পের পথচলা। এ সূত্র থেকেই বলা যায়, সুন্দরের সকল আয়োজনই শিল্প; আর সুন্দরের নির্মাতাগণই শিল্পী। এ কাজে যিনি যত মহৎ শিল্পকর্ম উপস্থাপন করতে পারেন তিনি তত বড় শিল্পী। বিশ্বাসী মানুষেরা তাই মহান স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহকে এবং অবিশ্বাসীরা প্রকৃতিকে সবচেয়ে বড় শিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। মানুষ কোন কিছু সৃষ্টি করতে না পারলেও স্রষ্টার মূলসূত্রকে অবলম্বন করে নতুন নতুন বিষয়কে নিজস্ব ঢঙে আবিষ্কার করেন। এজন্য মানুষের নির্মাণকেও এক ধরনের সৃষ্টি বলে আখ্যা দেয়া হয়। সাধারণভাবে সকল সৃষ্টিকর্মই শিল্পের আওতায় আনা হয়ে থাকে। তবে তাতে মননশীলতা ও নান্দনীকতার ছাপ যত বেশি থাকে তাকে তত সফল শিল্পকর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এটা হতে পারে কোন বস্তুগত শিল্পকর্ম কিংবা মানবীয় ও জৈবিক শিল্পকর্ম। একজন শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম এবং মানবিক স্বত্ত্বার মধ্যে যদি সমন্বয় ঘটে তবে তিনি হয়ে ওঠেন অমর শিল্পী। আর সে কারণেই মতিউর রহমান মল্লিককে একজন অমর শিল্পী হিসেবে আখ্যায়িক করা যায়। লেখনী, কণ্ঠ এবং সমাজ বাস্তবতায় তিনি ছিলেন একাকার। তাঁর কলমে যেমন আবিষ্কৃত হয়েছে-  ‘যে কোন কাজ করো না ভাই যে কোন কাজ করো/ তা যেন হয় সবার চেয়ে সবচেয়ে সুন্দরো” তেমনি বাস্তব জীবনেও তিনি সুন্দরকে বেছে নিতে আমৃত্যু সচেষ্ট ছিলেন।  

জীবন পরিক্রমার ভাঁজে ভাঁজে আবেগ অনুভূতির স্ফুরণই মূলত গান। ফুল-পাখিদের উচ্ছাস, নদীর ছলাৎ ছলাৎ বয়ে চলা এবং প্রকৃতির মনোহর রূপময়তার ছন্দই সঙ্গীতের আবহ। এককথায় সমকালের সমগীতই সংগীত; যা খেয়ালে কিংবা বেখেয়ালে সকল মানুষের হৃদয়বাঁশির সুরের মূর্ছনায় উচ্চকিত হয়। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই এর পথ চলা। পরিবেশ ও পরিপ্রেক্ষিত এর মায়াবী দেহে রঙ-রূপের বৈচিত্রময়তা এনে দেয়। ফলে সংগীত হয়ে ওঠে পবিত্রময়তার অপরূপ সৌন্দর্য কিংবা রুচিহীনতার নোংরা ফানুস। শিল্পী ও গীতিকার মতিউর রহমান মল্লিকের গানে পবিত্রময়তার অপরূপ সৌন্দর্যই প্রকাশ পেয়েছে; রুচিহীনতার নোংরা ফানুস নয়।

‘শোনেন সবে নবীজীর ঐ হকীকত/কেয়সা ছিল বেলালেরই মহব্বত; উড়িয়া যায়রে জোড় কবুতর মা ফাতেমা কান্দ্যা কয়/ আজ বুঝি কারবালার আগুন লেগেছে মোর কলিজায়’ কিংবা ‘এবারের মতন ফিরে যাও আজরাইল মিনতি করিয়া কই তোমারে/আসমান জমিন চেহারা তোমার আজাবের ডা-া হাতেতে তোমার’ ইত্যাদি গানগুলো এক সময় গজল নামে গাঁও গেরামের ওয়াজ মাহফিলে গাওয়া হত এবং গ্রামের সহজ সরল মানুষ বিশেষত গ্রামীণ ধর্মপ্রাণ মহিলাগণ দু’চোখের পানি ছেড়ে হৃদয় উজার করে এসব গান শুনতেন। শহুরে ওয়াজ মাহফিলে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের হাম্দ-নাতগুলো গাওয়ার চর্চা থাকলেও এগুলোকেও গজল নামে আখ্যা দেয়া হত এবং পূর্বোক্ত গানগুলোকেও গাওয়া হত গজল হিসেবেই। তবে শিক্ষিত এলাকার মাহফিলে (শহর-গ্রাম উভয়স্থানে) আল্লামা ইকবাল, রুমী, গালিব কিংবা শেখ সাদীর উর্দু ফার্সি গানের পাশাপাশি আরবী গানেরও প্রচলন লক্ষ্য করা যেত। তবে যাই গাওয়া হোক না কেন তাকে অবশ্যই ‘গজল’ নামে আখ্যায়িত করা ছিল বাধ্যতামূলক। কেননা সে সময় গান মানেই অশ্লীল কিছু এবং তা মসজিদ, মাদ্রাসা, ওয়াজ মাহফিল কিংবা মিলাদ মাহফিলে গাওয়া নাজায়েজ মনে করা হতো। যদিও উত্তর বাংলার লোকসঙ্গীতে ঐতিহ্য ধারার চর্চা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। শিল্পীসম্রাট আব্বাস উদ্দীন, আব্দুল আলীম, নীনা হামিদ, রথিন্দ্রনাথ রায়, ফেরদৌসী রহমান প্রমুখ শিল্পীদের কণ্ঠে ঐতিহ্য ধারার গান উচ্চারিত হলেও অনেক মুসলিম পরিবারে তা গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা যায়নি; বিশেষত ধর্মীয় মঞ্চে এগুলোকে না জায়েজ মনে করা হতো। এমনকি কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঐতিহ্যবাহী প্রেমময় হামদ-নাতগুলোও সর্বজনগ্রাহ্য ছিল না। এমন সঙ্কটময় সময়েও ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারের একটি অংশ গানের এ ধারাকে বিশ্বাসের সহায়ক হিসেবে ধারণ করে। আলিম-উলামা শ্রেণী ক্রমশ বিভিন্ন মাহফিলে আরবি ফারসি কবিতার পাশাপাশি নজরুলের গান-কবিতাও কোটেশন হিসেবে কিংবা বক্তৃতার অলংকার হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকেন। ফলে পঞ্চাশের দশকের পর থেকেই এসব গান-কবিতা অনেক পরিবারে গ্রহণযোগ্য এবং অনেক রক্ষণশীল পরিবারেও সহনশীল হয়ে ওঠে। এমন বৈরী ও প্রতিকূল পরিবেশে সত্তর দশকের শেষ দিকে কবি মতিউর রহমান মল্লিকের নেতৃত্বে নতুন আঙ্গিকে ঐতিহ্য ধারার গানচর্চা শুরু হয়। সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠীর সাংগঠনিক অবয়বে এ ধারা নতুন রসে সঞ্জিবীত হয়ে ওঠে। তাঁর নেতৃত্বে একঝাঁক প্রতিভাবান শিল্পী এ যাত্রায় সার্থক কা-ারীর পরিচয় দেন। সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠী ঢাকা থেকে সংস্কৃতির এ বিশ্বাসী ধারায় যে নতুন আবহ সৃষ্টি করেছিল তা বিভিন্ন নামে এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের হৃদয় অঙ্গনে বিশুদ্ধ বিনোদনের খোরাক হিসেবে সমাদৃত।

কবি মতিউর রহমান মল্লিক বিশ্বাসী সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে [দেশে বিদেশে] এক নামেই পরিচিত। কবি হিসেবে যেমন তাঁর সুখ্যাতি তেমনি সফল গীতিকার, সুরকার, শিল্পী, সংগঠক এমনকি বিশ্বাসী সংস্কৃতির সমকালীন যাত্রায় সাহসী কা-ারীও তিনি। ফররুখ আহমদ, আবদুল লতিফ, আজিজুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম, ফজল এ খোদা, সাবির আহমদ চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হুদা প্রমুখ গীতিকারগণ ঐতিহ্যধারার সঙ্গীত অংগনকে বেশ কয়েকধাপ এগিয়ে দিলেও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর মতিউর রহমান মল্লিকই হামদ-নাত ও দেশজ অনুসঙ্গ নিয়ে ঐতিহ্যবাদী গানের সবচেয়ে সফল ও স্বার্থক গীতিকার এ কথা সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়। তাঁর গান শুধুমাত্র পবিত্রময়তার অপরূপ শোভাই নয়, বরং তা যেন গানফুলের সুগন্ধি মৌ।

শিশুদের গান লিখতে হলে গীতিকারকেও যে শিশু হতে হয় তার স্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। তাঁর এমন অনেক গান রয়েছে যা শিশুকিশোরকে শুধু আদর্শ জীবন গঠনেই উজ্জীবিত করে না বরং সেগুলো দুষ্টুমি মাখা মিষ্টি বিনোদনও এনে দেয়। তাঁর গান দুষ্টুমিমাখা অভিমানী শাসনে শিশুদের মনকে সজাগ করে করে অবলীলায়। তবে একটা বিষয় ভীষণভাবে লক্ষ্যনীয় যে, শিশুদের সাথে দুষ্টুমির সময়ও কিন্তু কবি মল্লিক প্রকৃতিকে ভোলেননি। এমনকি উপমা উৎপ্রেক্ষাতেও মুন্সিয়ানা বজায় রেখেছেন, তবে তা অবশ্যই শিশুদের হজমযোগ্য।

কবি মতিউর রহমান মল্লিকের কলমে এক অসাধারণ বৈচিত্র্যতেজ লক্ষ্যণীয়। তাঁর কবিতায় গীতলতার স্বাভাবিক আবহ চোখে পড়লেও গান ও কবিতার ভাঁজে ভাঁজে পার্থক্যের দেয়াল খুব শক্ত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ আবর্তিত তৃণলতা, অনবরত বৃক্ষের গান, তোমার ভাষায় তীক্ষè ছোরা, চিত্রল প্রজাপতি, নিষন্ন পাখির নীড়ে কিংবা ছড়াকাব্য রঙিন মেঘের পালকির সাথে গানের সংকলন ঝংকার ও যতগান গেয়েছি’র মধ্যে পার্থক্যের প্রাচীর খুর মজবুত। কাব্যের শব্দগাঁথুনিতে গীতলতার দোলা থাকলেও তা গানের শব্দভঙ্গি থেকে পুরোপুরি ভিন্ন স্বাদের। এখানেই কবি মল্লিক এবং গীতিকার মল্লিকের এক অসাধারণ বৈচিত্র্যঘ্রাণ ভেসে আসে। কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী তিনি। প্রতীতি ১ এবং প্রতীতি ২ তাঁর স্বকণ্ঠে গাওয়া অডিও এ্যালবাম। বিশ্বাসী চেতনাকে শাণিত করার প্রয়াসে নির্মিত এ এ্যালবাম দীর্ঘ দুই দশক একচ্ছত্র ভূমিকা পালন করেছে বলা যায়। গানের ভাষা, সুর-কণ্ঠ এবং প্রতীকের মোহনীয় ব্যবহার তৃষিত হৃদয়কে তৃপ্ত করে তোলে। সফল গীতিকার-সুরকার ও শিল্পী হিসেবে সংগীত জগতে তিনি একজন অমর ব্যক্তিত্ব। 

কবিতা মনের কথা বলে; কথা বলে সমাজের, কথা বলে জীবনের। ইঙ্গিতময়তার মায়াজালে আটকে রাখে পাঠক হৃদয়ের বারান্দা। এক্ষেত্রে যিনি যত আঁটসাঁট বাঁধনে আটকে নিতে পারেন তিনি ততোটা সফল কবি। মতিউর রহমান মল্লিক কবিতার শরীরে মায়ার আঁটসাঁট বাঁধন কষে নিজেকে সফল করেছেন সন্দেহাতীত ভাবে। জীবনের বাস্তবতা তাঁর কবিতার উপজীব্য বিষয়। প্রেম-বিরহ, স্বদেশ, স্বদেশের মাটি-মানুষ, শহর-নগর-গ্রাম, পারিপার্শিকতা সব কিছুকে চিত্রিত করেছেন বিশ্বাসের তুলিতে। বক্তব্য উপস্থাপনেও তিনি নির্মাণ করেছেন নিজস্ব ঢঙ। ফলে কবিতার ভাঁজে ভাঁজেই তাঁর অস্তিত্বের প্রকাশ অনায়াসে লক্ষনীয়। ছন্দের যাদুকরী প্রভাব যেমন পাঠককে মুগ্ধ করে তেমনি উপমা ও চিত্রকল্প নির্মাণেও তিনি স্বকীয় বৈশিষ্টের অধিকারী। দু’একটি পঙ্ক্তির উদ্ধৃতিই আমার বক্তব্যকে সত্যায়ন করবে-

নারী।

কখনো কখনো চৈত্রের দাবদাহ/কখনো কখনো আগুনে বানানো শাড়ি

নারী!

কখনো কখনো বসন্তকাল/অনন্ত কোন আনন্দ সঞ্চারী।

(অনবরত বৃক্ষের গান)

কিংবা

ঘরের মধ্যে কী-সুন্দর ঘর পুড়ে যাচ্ছে, ঘর 

মনের মধ্যে কী-সুন্দর তুষের আগুন

ঠিক যেমন দেশের মধ্যে দেশ/প্রতিদিন বিদগ্ধ হলো

....................

মেঘনার মধ্যে এখন কি আর মেঘনা আছে?/পদ্মার মধ্যে পদ্মা?

ঠিক যেমন যমুনা সেতুর মধ্যে যমুনা থাকার কথা ছিল!

(অনবরত বৃক্ষের গান)

গান এবং কবিতার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় কবি মতিউর রহমান মল্লিককে। গানে যেমন প্রেম বিরহের ঢেউ সার্বক্ষণিক খেলা করে, সে প্রেমের আদলেই নিজকে গড়ে নিয়েছিলেন তিনি। কিংবা এভাবেও বলা যায় যে, প্রেম-বিরহের যে পাখি অনবরত তাঁর হৃদয় আঙিনায় খেলা করতো সেগুলোই সুরের মূর্ছনায় অবলিলায় বেরিয়ে এসেছে। কোন কাঠিন্যতা কিংবা আরোপিত শব্দ-সুরের কারুকাজ তাঁর গানে পাওয়া যায় না। তিনি যেমন বলেছেন-

 ‘মহানবী বলে তারে কেউবা ডাকে/আমি ডাকি প্রিয়তম

 সে আমার ধ্যান ভালবাস প্রেম/মধুময় মনোহর স্বপ্ন সম।’

সত্যি এমনই ছিল তাঁর নবীপ্রেম। হৃদয়ের আঙিনা জুড়ে রাসূলের ভালবাসার ফুল ফুটে রাখতেন তিনি। প্রতিটি কাজের উপমায় দেখতেন মহানবীর পথনির্দেশিকা। মানুষকে ভালবাসার ছবক নিয়েছেন রাসূলের (সাঃ) কাছেই। তাইতো মানুষের জন্যই নিবেদিত ছিলেন তিনি। শিল্পীত সাজে সজ্জিত ছিল তাঁর ব্যবহারিক জীবন। মানবিক দূর্বলতা ছাড়া কোন কষ্টের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েনি তাঁর আচরণ থেকে। হাজারো কষ্টের ভিড়ে তিনি এক টুকরো হাসি ধরিয়ে দিতেন সকলের ঠোঁটে। তাঁর সান্নিধ্যে গেলেই কষ্টগুলো চুয়ে চুয়ে নিঃশব্দে পালিয়ে যেতো। তাইতো হৃদয়ের উত্তাপ কমাতে সারা দেশ থেকে ছুটে আসতেন সংস্কৃতি কর্মীরা। নতুন উদ্দোমে ফিরে যেতেন কর্মচঞ্চল হৃদয় নিয়ে। তাঁর ভালবাসা এবং মানবতাবোধের মধ্যে বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠতো। তাইতো তিনি গেয়ে উঠেছেন-

‘যেজন কখনো ব্যথা দিতে জানে না/যেজন কেবলি মুছে দেয় বেদনা

হৃদয়ের আঙিনায় আপন করে নিতে আর/কার বুক এতো প্রশস্ত

তার নাম আহমদ, বড় বিশ্বস্ত।’

পরিশুদ্ধ জীবনবোধের স্বপ্ন এঁকেছেন কবি মল্লিক। দেশ-জাতি এবং বিশ্বাসের কাছে তাঁর সমস্ত দায়বদ্ধতা। জীবনের বাঁকে বাঁকে তিনি নির্মাণ করেছেন বিশ্বাসের সীসাঢালা মজবুত প্রাচীর। ঘুণপোকার চোখ রাঙানিকে প্রশ্রয় 

দেননি কখনো। তাইতো তিনি তাদের কাছে অপাঙ্ক্তেয়ও বটে। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এমন ভয় তাঁকে স্পর্শ করে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ