শুক্রবার ০৫ জুন ২০২০
Online Edition

শেষ ছুটির দিনের বইমেলা ॥ ব্যাপক সাড়া কবরীর বইয়ে

গতকাল শনিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বইয়ের স্টলগুলোতে ছোট-বড় সব ধরনের বইপ্রেমীদের ছিল উপচেপড়া ভিড় -সংগ্রাম

স্টাফ ও বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার: দেখতে দেখতেই পার হতে চলেছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। বিদায়ের ঘণ্টা বেজেছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭’রও। কিন্তু মেলা শেষ হলেও আড্ডা ফুরায়নি লিটলম্যাগ খ্যাত বহেড়াতলায়। তারুণ্যের তারণ্যের মতোই উজ্জীবিত বইমেলার অন্যতম বিশেষ এই প্রান্তটি। পুরো একটি মাস ধরেই ছোট-বড় লেখক-কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডায় জেগে থাকে লিটলম্যাগ চত্বর। গতকাল শনিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় মাসের শেষ ছুটির দিনেও লেখকদের চিরচেনা এই স্থানটিতে দেখা গেছে আড্ডার ফুরসত। এদিকে, ২৫তম দিনে মেলার বিশেষ আকর্ষণ ছিল এককালের সাড়া জাগানো চিত্রনায়িকা কবরীর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘স্মৃতিটুকু থাক’। অন্যদিকে এদিন মেলার শেষ শিশুপ্রহরে শিশুচত্বরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অনেকে।      
গত তিন বছর ধরেই অমর একুশে গ্রন্থমেলা মানেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। প্রতিদিনই বইপ্রেমীরা ভিড় জমাচ্ছেন সেখানে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির কাছে গ্রন্থমেলা মানেই বাংলা একাডেমি। মূলত তাদের মেলার মূল শোণিতধারা বহেড়াতলায়। আশির দশকের সামরিক-স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকে প্রত্যেক মেলায় এখানেই ভিড় করতেন তারুণ্যদীপ্ত প্রতিবাদীরা হাতে-ব্যাগে নিজেদের ছোটকাগজ আর স্বউদ্যোগে প্রকাশিত বই নিয়ে। বরাবরের মতো এবারও বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের পাশের জায়গায় বসেছে লিটলম্যাগ চত্বর। প্রতিদিনই সেখানে জমছে সৃষ্টিশীল তারুণ্যদীপ্ত একঝাঁক তরুণের আড্ডা। মেলার শেষ পর্যায়ে এসেও আড্ডা ফুরায়নি এই ঐতিহাসিক এই স্থানটিতে। চলতি বছরে বহেড়াতলায় বসেছে ১১০টি লিটল ম্যাগাজিন।
গতকাল বিকেলে লিটলম্যাগ চত্বরে গিয়ে দেখা গেল বেশ জনাকীর্ণ পরিবেশ। সেখানে দাঁড়িয়ে কথা হলো ছোটকাগজের নিয়মিত পাঠক হাসান হাফিজ টুটুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখন তরুণরা নিজেদের মতামত সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারেন না। কিন্তু ছোটকাগজে সহজেই তারা তাদের মতপ্রকাশ করতে পারেন। সে সঙ্গে সামনের দিনগুলোর সাহিত্যের ধারাটাও বুঝতে পারেন। লিটলম্যাগ খেয়ার সম্পাদক বলেন, ছোটকাগজের পাঠকের আনাগোনা একেবারে কম নয়। তাই বিক্রিবাট্টাও খুব একটা মন্দ নয়। ছোটকাগজের মূল ভাবটিই হচ্ছে, এর মধ্যে কোনো আপসকামিতা নেই।
গতকাল যেমন ছিল মাসব্যাপী মেলার শেষ ছুটির দিন, তেমনি অষ্টম তথা শেষ শিশুপ্রহরও। এ দুই  উপলক্ষে সকালেই গ্রন্থমেলার দ্বার খুলে দেয়া হয়। সকাল থেকেই আসতে থাকেন বইপ্রেমী সকল শ্রেণীর মানুষ। মেলায় অন্যান্য ছুটির দিনের মতোই ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী অংশে দীর্ঘ লাইন অতিক্রম করে মেলায় প্রবেশ করতে হয় দর্শনার্থীদের। শেষ সময়ে স্টলগুলোতে দেখা গেছে চোখে পড়ার মতো ভিড়। বিক্রেতারাও যেন বেচার নেশায় বিভোর হয়ে গেছেন। বইয়ের দাম আর টাকা নেয়া ছাড়া তাদের যেন অন্য কথার কোনো সময়ই নেই।
ইস, শিশু চত্বরটা যদি আরও বড় করা হতো!: বটগাছ ঘিরে গড়া ‘সিসিমপুর’ এর মঞ্চে হালুম, টুকটুকি আর ইকড়ি এসেছিল গত বছরও। ছিল বিশাল মঞ্চ আর ছোটদের মাঝে জনপ্রিয় এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে মজা-গল্প-খেলাধুলা করতে সামনে ছিল ছোট্ট সোনামণিদের জন্য বড় পরিসরের জায়গাও।
রেলগাড়ি, সাপ-লুডু, বল ছুড়ে ছুড়ে বর্ণ, ফুল-ফল-গাছ-প্রাণী চেনানোর মজাদার খেলার সুযোগও ছিল। সিসিমপুরের কর্মীরা শেখাতেন নানা স্বাস্থ্যবিধি, দিতেন উপহার আর শিশুদের সঙ্গে গল্প করতেন। ফাঁকে ফাঁকে মঞ্চের ওপরই লাফালাফি, দৌড়-ঝাঁপ করে বেড়ানোর সুযোগও মিলতো। বইমেলার শিশু চত্বরের মাঝামাঝিতে সিসিমপুর স্টল-মঞ্চটি ছিল অনেক খোলামেলা পরিবেশে, সামনে আর এ অংশটিতে আসবার জায়গাটিও অনেক ফাঁকা রাখা হয়েছিল, মঞ্চ ঘিরে ছিল দড়ির সীমানাচিহ্ন বাবা-মায়ের হাত ধরে ছোটদের ভালোভাবে আসা, ঠিকমতো দেখতে আর খেলতে পারার সুবিধার জন্য। 
তবে এবার সবকিছুই এত ছোট্ট হয়ে গেছে যে, হালুম, টুকটুকি আর ইকড়িদের আসবার নির্দিষ্ট সময়ের ফাঁকে  ২৫/৩০ জন শিশুর দৌড়ানো-লাফানো ছাড়া আর তেমন কোনো আনন্দের সুযোগ থাকছে না। তাও সংকীর্ণ পরিসরের কারণে নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অভিভাবকদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজরদারি করতে হয়- ‘পাছে না পড়ে গিয়ে ব্যথা পায়’। বার বার চেচিয়ে সতর্ক করতে হয় যার যার আদরের সন্তানকে। আবার কিছুক্ষণ পর পর নতুনদের সুযোগ করে দিতে বাধ্য হয়েই মঞ্চে থাকা ছোটদের নামিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, আর অনেকেই না নামার জেদ ধরছে, অনেকে নেমে যাচ্ছে কাঁদতে কাঁদতে।
অভিভাবক আর শিশুরা সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়ে যাচ্ছেন নির্দিষ্ট সময় পর পর ইকড়িরা যখন মঞ্চে এসে পারফরম করছে। আগেরবার সব ছোটরাই সুযোগ পেয়েছে ওদের দেখবার আর এবার চারপাশে লাগোয়া স্টল আটকে দাঁড়িয়ে বা বড়দের কোলে-ঘাড়ে চড়েও সম্ভব হচ্ছে না।
বইমেলার শেষ সময়ে ‘শিশু প্রহরে’ এবারে প্রথম বইমেলায় এসেছিল সাত বছরের অবন্তিকা। গাদাগাদি আর ভিড়ে দূরে দাঁড়িয়ে বারবার উঁচু হয়েও ইকড়িদের প্রদর্শনী দেখতেই পায়নি সে আর তার অনেক বন্ধুরা। অথচ সকাল থেকে তিনদফা মঞ্চে উঠেছিল ওরা। আর গতবারের মেলায় সব ধরনের মজাই করতে পেরেছিল এসব ছোট্টমণিরা। শেষমেষ বার বার মঞ্চে উঠে কিছুক্ষণ করে লাফালাফি-দৌড়ে সিসিমপুর মঞ্চ ছাড়তে হয়েছে।
এ বিড়ম্বনার কারণ জানা গেল, শিশু চত্বরটির পরিসর কমে যাওয়া। তাই সন্ধ্যার পরে বইমেলা ছেড়ে যাওয়ার সময় অবন্তিকার আক্ষেপ, ‘ইস, শিশু চত্বরটা যদি আরও বড় করা যেতো!’
মাইলস্টোন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রোজাও শিশু চত্বরে এসে বেশি ভিড়ের কারণে বই বাছতে-কিনতে পারছিল না। এ বছরের মেলায় প্রথম এসেছে টুকটাক লেখালেখি করা মেয়েটিও। তার পছন্দ, ছড়া, গল্প, ডিটেকটিভ বই। সঙ্গে আসা বাবা সাইফুল আলম ও মা জেসমিন আরাও শিশু চত্বরের কম পরিসর নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন। বললেন, বইমেলা তো কেবল বইয়ের মাধ্যমে ছোটদের জগৎ চেনানোর, শেখানোর উপলক্ষই নয়, নাগরিক ‘বন্দিজীবন’ থেকে খানিকটা ‘মুক্তি’ দেয়ারও। আনন্দে-উচ্ছ্বাসে-উৎসবে বই কেনার সুযোগ করে দেয়ার দাবিও জানান তারা।
গত তিন বছর ধরে বাংলা একাডেমির উল্টোদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তৃত পরিসরে বইমেলা সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিশু চত্বরও বসছে সেখানে। তবে এবার শিশু চত্বরের জায়গা কমানো এবং চত্বর লাগোয়া বিশাল জায়গাজুড়ে ডিএমপি’র পুলিশ কন্ট্রোলরুম ও সেটিকে ঘিরে রাখতে গিয়ে বাঁশ-দড়িতে ঢেকে রাখা ঠিক হয়নি বলে মন্তব্য করছেন অনেকে।
ফুলকি বইকেন্দ্রের প্রকাশক শিশু সাহিত্যিক-সংগঠক মোহাম্মদ তৌহিদুজ্জামান বলেন, ‘দেড়যুগ আগে আমাদের দাবি-শিশুবন্ধনের কারণে বাংলা একাডেমি বইমেলায় শিশু চত্বর করেছিল। তবে বাংলা একাডেমির স্বল্প পরিসরের বইমেলার ভিড়-ঠেলাঠেলিতে আর কম জায়গার শিশু চত্বরের বিড়ম্বনা ছিল অনেক। মাঝে মাঝে ছোটদের হারিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও শোনা যেতো তথ্যকেন্দ্রের মাইকে’। 
অন্যবারের চেয়ে বিক্রিও কমে গেছে বলে আক্ষেপ করেছেন শিশু চত্বরের বেশিরভাগ শিশুতোষ বইয়ের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান-স্টলের প্রকাশক-কর্মীরাই। ছোটদের মেলার জুয়েল আহসান ‘মোটামুটি’ বলে বেচা-কেনার দুর্দশা তুলে ধরলেও গতবার বেশি ছিল বলে জানান তিনিও।  
কবরীর বইয়ে ব্যাপক সাড়া: একুশের বইমেলায় আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে মিষ্টিমেয়েখ্যাত চিত্রনায়িকা কবরীর আত্মজৈবনিক বই ‘স্মৃতিটুকু থাক’। এ বইতে তার না বলা কথার পসরা সাজিয়েছেন। অর্ধশতক ধরে বাঙালির আগ্রহজুড়ে থাকা কবরী এই বইয়ের মধ্য দিয়ে লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটালেন। তার বইটি প্রকাশ করেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর পাবলিশিং লিমিটেড- বিপিএল।
গতকাল বইমেলায় কবরীর এই বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আকস্মিকভাবেই উপস্থিত হন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, ‘কবরী সম্পর্কে কী বলবো, কবরী আমাদের সময়কার হার্টথ্রব। তার সেই স্মৃতি এখনও আমাদের মধ্যে।’
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে কালো জামদানি পরা কবরী ছাড়াও বরেণ্য চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম, বিডি নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে মোড়ক উন্মোচনের পর কবরী যখন বাংলা একাডেমি অংশ গিয়ে বিপিএলের স্টলে বসেন, তখন সেখানে উপস্থিত সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। অভিনেত্রী জীবন পেরিয়ে কয়েক বছর আগে কবরী যখন সংসদে ছিলেন আওয়ামী লীগের আইনপ্রণেতা হিসেবে, তখন বিপরীত দিকেই ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ। কবরীর একটি বই কিনে নেন মওদুদ, বইয়ে নেন অটোগ্রাফও। বেশ কিছুক্ষণ কথাও বলেন তারা।
মেলার বাংলা একাডেমি অংশের ৬৫-৬৬ নম্বরে বিপিএলের স্টলে বসে ভুবনমোহী সেই হাসিমুখে রেখেই অটোগ্রাফের আবদার মেটাচ্ছিলেন কবরী। বইটির ব্যাপক কাটতি বলে জানালেন সংশ্লিষ্টরা।
১৫৬ পৃষ্ঠার বইটির ভূমিকা লিখেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, ‘কিংবদন্তিতুল্য চিত্রনায়িকা কবরীর লেখা আত্মজীবনী ‘স্মৃতিটুকু থাক’-এর পান্ডুলিপি পাঠ করে আমার মনে হলো, আমি কোনো কবির রচিত আত্মজৈবনিক গদ্য পাঠ করছি।’
বইটি কবরী উৎসর্গ করেছেন তার মা লাবণ্যপ্রভা পাল ও বাবা কৃষ্ণ দাস পালকে। এতে তার অভিনীত জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোর পোস্টারের পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্লভ আলোকচিত্রও রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ