রবিবার ১২ জুলাই ২০২০
Online Edition

প্রকৃতদের নাম বাদ দিয়ে একাত্তর সালের শিশু-কিশোরদের নাম অন্তর্ভুক্ত

খুলনা অফিস: খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কমিটি এবং এই কমিটি কর্তৃক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে করা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা। বৃহস্পতিবার খুলনা প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই দাবি জানান মুক্তিযোদ্ধারা।
সম্মেলনে লিখিত বক্তৃতায় মুক্তিযোদ্ধা প্রনয় কুমার মন্ডল বলেন, গত ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখে কয়রা উপজেলায় উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই সম্পন্ন হয়। এ জন্য জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) একটি বাছাই কমিটি গঠণ করে দেয়। জামুকার নীতিমালা অনুযায়ী, যাচাই বাছাই কমিটির সভাপতি হবেন সংশ্লিষ্ট উপজেলার তালিকাভুক্ত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা।
কিন্তু কয়রা উপজেলার জন্য গঠিত কমিটির সভাপতি করা হয় রূপসা উপজেলার তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা এমএম মুজিবর রহমানকে। এই কমিটির সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম কোথায় যুদ্ধ করেছেন তা বলতে পারেন না কেউ। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কয়রা উপজেলার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান সানা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত যাচাই বাছাই কমিটির কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।
সম্মেলনে আরো বলা হয়, জামুকার নীতিমালা অনুযায়ী লালবার্তা অন্তর্ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না থাকলে তাদেরকে যাচাই বাছাইয়ের আওতায় আনা যাবে না। কিন্তু সেই নীতিমালার তোয়াক্কা না করে যাচাই বাছাই কমিটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে অভিযোগ ছাড়াই তাদেরকে যাচাই বাছাই করেছে। এমনকি লালবার্তা অন্তর্ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাসহ সকল মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আসামীর মত দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদেরকে অসম্মান করে তাদের বৃহৎ একটা অংশকে বাদ দিয়েই তালিকা সম্পন্ন করেছে।
কয়রা উপজেলার বর্তমান মুুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এডভোকেট কেরামত আলী ছিলেন জাসদ গণবাহিনীর নেতা। যাচাই বাছাইকালে তিনি বিতর্কিত বাছাই কমিটিকে প্রভাবিত করে গণবাহিনীর সদস্য মুক্তিযোদ্ধাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন। উক্ত কেরামত আলী ও তার গণবাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কমান্ডার রেজাউল করিমসহ অগণিত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে হত্যা করেছে।
যাচাই বাছাই কমিটি জাসদ গণবাহিনীর নেতা কেরামত আলীর দ্বারা এতো বেশী প্রভাবিত হয়ে কাজ করেছে যে, মুক্তিযোদ্ধা, ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুজিব বাহিনীর সদস্য, কয়রা উপজেলার সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আব্দুর রহমান সানা, বট কৃষ্ণ ঢালী, নজরুল ইসলামসহ ১০৭ জন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কমিটির সদস্য মো. শফিকুল ইসলামের আপন মামা মুজিবর রহমানকে।
এছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা হতে হলে যুদ্ধকালীন সময়ে বয়স সর্বনিম্ম ১৩ বছর নির্ধারণ করা হলেও বর্তমান উপজেলা কমান্ডার কেরাতম আলীর কাছ থেকে অনৈতিক সহায়তা গ্রহণ করে তার আপন ভাইপো গোবিন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. ইলিয়াস হোসেনকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করেছে যাচাই বাছাই কমিটি। যুদ্ধের সময় মো. ইলিয়াস হোসেনের বয়স ছিলো মাত্র ৮ বছর।
এ সময় কয়রা থানার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জিএম মতিউর রহমান, জিএম মওলা বক্স, বট কৃষ্ণ ঢালী, এসএম মহিউদ্দিন, রনজিত কুমার রায়, কিরণ চন্দ্র ম-ল, নূর মোহাম্মদ সানা, কেরামত আলী, শাহজাহান আলী মোড়ল, গোলাম মোস্তফা সানা, মুরারী মোহন সানা, ইসমাঈল হোসেন, আব্দুল মজিদ মিস্ত্রী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
কয়রা থানার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাওলা বক্স সাংবাদিক সম্মেলনে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার তিন সন্তান বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছে। তারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে গর্ববোধ করতো। আর ষড়যন্ত্র কারীরা আমার নাম বাদ দেয়ায় আমার সন্তানরা সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে। তাদের কাছে আমিও সঠিক জবাব দিতে পারছি না। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কে ঊর্র্ধ্বে রাখা উচিৎ। পাশে বসে থানা আরেক বয়োবৃদ্ধ শিক্ষক এসএম মহিউদ্দিন চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ৭১ সালে জীবনবাজী রেখে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছি। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরে আমার জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে কোন অপরাধে আমাকে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে তা আমি জানি না।
সমাজের কাছে আমাকে ভুয়া সাজিয়ে হেয় করা হচ্ছে। এর প্রতিকার না পেলে মনোকষ্ট নিয়েই বাকি সময় পার করতে হবে বলে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তার পাশে থাকা একমাত্র ছেলে মাহফুজুর রহমান বলেন, আমাদের সরকারি ভাতা বা টাকার দরকার নেই। মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে এসে আমার পিতা অপবাদ নিয়ে মারা যাবে তা সন্তান হিসেবে সহ্য করতে পারছি না। আমি ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে দাবি জানাচ্ছি-অপবাদ দিয়ে কোন মুক্তিযোদ্ধাকে নিরবে হত্যা করা না হয়।
এ ঘটনার পর আমার আব্বু মানষিকভাবে ভেঙে পড়েছে। এমনকি স্ট্রোক করে এখন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ