বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

বাংলাদেশে রোল বল বিশ্বকাপ আয়োজন

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : বাংলাদেশে আরো একটি বিশ্বকাপের আসর অনুষ্ঠিত হলো। তার নাম রোল বল বিশ্বকাপ। যে খেলাটির সাথে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই পরিচিত নন, সেই খেলার বিশ্বকাপ নিয়ে গত ১৭-২৩ ফেব্রুয়ারী আলোচনা ছিল তুঙ্গে। কারণ নানান ঘটনার কারণেই মূলত আয়োজনের প্রায় প্রতিদিনই সংবাদের শিরোনাম হতে হয়েছে। নাচ-গানে ভরপুর এক বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল ঢাকায়। খেলাটি নতুন হলেও বাংলাদেশ রোলার স্কেটিং ফেডারেশন এটিকে নিয়ে নেমেছে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ভিন্নমাত্রা যোগ করার উদ্দেশ্য নিয়ে। উদ্দেশ্য মহৎ হলেও অনেকটাই অগোছালো এই বিশ্বকাপ। গত ১৭ ফেব্রুয়ারী এই বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরই শুরু হয় বিশৃঙ্খল অবস্থা। কারণ  স্কেটিং পিচ পরিষ্কারের জন্য কোনো লোকজনই খুঁজে পাওয়া কষ্টকর ছিল। ফলে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ ৩টায় নতুন কমপ্লেক্সে হওয়ার কথা থাকলেও হতে পারেনি। সেই ম্যাচ পরে হ্যান্ডবল স্টেডিয়ামে হয়েছে বিকাল সাড়ে ৪টায়। তবে শুভ সূচনা করেছে বাংলাদেশ ১৯-১ গোলে হংকংকে হারিয়ে। সর্বোচ্চ ৯ গোল করেছেন দ্বীন ইসলাম হৃদয়। এদিকে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড নিয়েও হয়েছে সমস্যা। মিডিয়ার অ্যাক্রিডিটেশনে সাংবাদিকের নাম-পদবি সবই আছে, নেই সংবাদ প্রতিষ্ঠানের নাম। এখানেই শেষ নয়। অ্যাক্রিডিটেশনের ফিতায় ‘বাংলাদেশ’ হয়ে গিয়েছিল ‘বাংলেশ’! এটা চোখে পড়ায় শুদ্ধ করে নতুন ফিতা প্রিন্ট করে আনা হয়। এর আগে সকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে দেখা গেছে কমপ্লেক্সের গ্যালারিতেই ঘুমিয়ে পড়েছেন কিছু খেলোয়াড়। তাঁরা কেনিয়া রোল বল দল। সকাল ৭টায় ঢাকায় এসে তাঁরা আবাসন খুঁজে পাননি। অগত্যা ৩টা পর্যন্ত তাঁরা গ্যালারিতে ঘুমিয়ে নিয়েছেন। এসব অসংগতি নিয়ে সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আসিফুল হাসান নিজেদের সমস্যার কথা বলেছেন এভাবে, ‘আমরা ভাবতে পারিনি এতগুলো দল আসবে। তা ছাড়া আমরা ছোট ফেডারেশন, অভিজ্ঞতা কম। প্রথমদিকে একটু সমস্যা হলেও সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো শুধরে নেবো। ’ রোলবল বিশ্বকাপের প্রথম দিনের প্রথম বেলায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি হলো নজরকাড়া, মনোমুগ্ধকর। আর দ্বিতীয় বেলায় যখন মাঠে খেলা গড়ানোর পালা, তখন অব্যবস্থাপনার ছড়াছড়ি। সময়মতো খেলা শুরু না হওয়া, মাঠ নষ্ট হয়ে যাওয়া, প্রয়োজনীয় মুহূর্তে দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনুপস্থিতি মিলিয়ে রোল বল বিশ্বকাপের প্রথম দিনটা অস্বস্তিরই জন্ম দিয়েছিল।
শুধু রোল বল বিশ্বকাপ সামনে রেখেই ১১ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স। সকালে পল্টনের এ ভেন্যুতেই ৪০ দেশের এই মহাআয়োজনের উদ্বোধন হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী ও টুর্নামেন্ট আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা আ হ ম মুস্তফা কামাল ছিলেন প্রধান অতিথি। তবে উদ্বোধনীর আসল পর্বটা ছিল খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স। গ্যাংনাম হতে মাইকেল জ্যাকসন- সব ধরনের নাচ-তালের মিশেলে ছিল বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষ হয় দুপুর ১২টার দিকে। বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ-হংকং ম্যাচে মুখোমুখি হবে বলে খুব দ্রুত উদ্বোধন অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করা মঞ্চ সরিয়ে নেওয়ার কথা।
কিন্তু খেলার শুরুর সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও দেখা গেল, মাঠ পরিষ্কারই করা হয়নি। বিভিন্ন জায়গায় চেয়ার আর খুঁটির কারণে মাঠে তৈরি হলো ছোট-বড় বিশ-ত্রিশটি গর্ত। পিচ ঢালাইয়ের ওপর রঙের যে প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল, তা উবে গেছে অনেক জায়গাতেই। কিন্তু কোথায় খেলা হবে, সেই তথ্যও তখন অজানা। যারা মাঠ পরিষ্কার করছেন, বেশ আয়েশেই করছিলেন। তাদের তাগাদা দিয়ে দ্রুত কাজ সারানোরও কাউকে দেখা গেল না। খেলা দেখতে আসা উৎসাহী অনেকের প্রশ্ন, ‘খেলা কখন শুরু হবে?’ প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর পাওয়া গেল রোলার স্কেটিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আসিফুল হাসানকে। সময়মতো খেলা না হওয়া, মাঠ নষ্ট হয়ে যাওয়া, দায়িত্বপ্রাপ্তদের না পাওয়া, একদিন আগে ফিক্সচার দিয়েও শেষ মুহূর্তে আবার বদল আনা, সেই সিডিউলও মানতে না পারা- এমন বিভিন্ন প্রশ্ন ধেয়ে গেল তার দিকে। যথাসম্ভব হাসিমুখে সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন তিনি। সব উত্তরের সারকথা দু’টি। এক, আমরা ছোট ফেডারেশন, দক্ষতা কম। দুই, আগামীকাল থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে। এক প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘এতগুলো দেশ সামলাতে গিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি।’ আরেকবার বললেন, দুঃখিত ছাড়া আমার আর কী বলার আছে! আসিফের মতে, এই সমস্যার মূলে আছে ইন্টারন্যাশনাল রোলার স্কেটিং ফেডারেশনের দুর্বলতাও। তবে এত বেশি দল অংশ নেবে, সে ধারণাও নাকি তাদের ছিল না, ‘ইন্টারন্যাশনাল রোলবল ফেডারেশনের সদস্য আছে ৫৫টি দেশ। আমাদের ধারণা ছিল ২৫ থেকে ৩০টা দেশ আসবে। কিন্তু চল্লিশটা দেশ চলে আসায় আমাদের একটু সমস্যা হচ্ছে।’
বিশ্বকাপ বা বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অন্যান্য ফেডারেশন বা বোর্ডের সহযোগিতা নেয়া হয়নি কেন- এমন একটি প্রশ্নের জবাবে ফেডারেশনগুলোর দিকেই বল ঠেলে দিলেন আসিফ, ‘আমরা সবাইকেই বলেছি। অনেকে সহযোগিতা করছে। কেউ কেউ ভেবেছে, ছোট একটা ফেডারেশন, এরা কী না কী করে। কারও কারও সহযোগিতা করা নিয়ে অনীহা ছিল।’ কেনিয়ার মূল দলকে রাখা হয়েছে ধানমন্ডির সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে। কিন্তু এরা জায়গা না পেয়ে চলে এসেছিলেন মাঠে। পরে অবশ্য তাদের স্বদেশীদের সঙ্গেই থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বড় আয়োজনে বাংলাদেশের সুনাম ধরে রাখার মিশন নিয়ে শুরু হয়েছিল রোল বল বিশ্বকাপ। ৪০টি দেশ, ৬০০ ক্রীড়াবিদ, ৩টি ভেন্যু, আট দিনের আয়োজন সব মিলিয়ে এক মহাযজ্ঞ, নাম যার ‘রোলবল বিশ্বকাপ’। হ্যান্ডবল ও ভলিবলের মিশ্রণে তৈরি স্কেটিং ঘরানার খেলা রোলবলের বিশ্ব আসর শুরু হয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারী। চলবে ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ২০১১ সালে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপের পর এটিই বাংলাদেশের মাটিতে আয়োজিত প্রথম কোনো বিশ্ব আসর। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তুলনামূলক অপরিচিত এই খেলার মূল আয়োজক বাংলাদেশ রোলার স্কেটিং ফেডারেশন। ফেডারেশনটি এর আগে রোলবলের দু’টি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছিল। ২০১৩ সালে ভারত ও নেপালকে নিয়ে হয়েছিল ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট; এর পরের বছর ছিল এশিয়ান রোলবল চ্যাম্পিয়নশিপ। তবে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে বিশেষভাবে এগিয়ে এসেছে সরকার। বিশ্বকাপ আয়োজনের সার্বিক বিষয় দেখভাল করছে সরকার গঠিত সাব-কমিটি। আজ ২৩ ফেব্রুয়ারি টুর্নামেন্টের ফাইনালের দিন পুরস্কার বিতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সের পাশাপাশি ঢাকার তিনটি ভেন্যুতে খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। যার একটি জাতীয় হ্যান্ডবল স্টেডিয়াম, অন্যটি মিরপুরের শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়াম। পুরুষ বিভাগে অংশ নিচ্ছে ৩৯টি দেশ, মহিলা বিভাগে ২৭টি। ইউরোপের দেশ স্লোভেনিয়া শুধু মহিলা বিভাগে দল পাঠিয়েছে। অংশগ্রহণকারী মোট ৪০টি দেশের মধ্যে এশিয়ার ১৭টি, আফ্রিকার ১১টি, ইউরোপের ৮টি, দক্ষিণ আমেরিকার ৩টি ও ওশেনিয়ার একটি দেশ আছে। পল্টন মাঠে তৈরি রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সটি তৈরি করা হয়েছে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর আবাসন ব্যবস্থাপনাসহ সব মিলিয়ে প্রায় ২৩ কোটি টাকার বরাদ্দ করা হয়েছে। এক যুগ আগে ভারতের পুনেতে জন্ম নেয়া রোলবল মূলত স্কেটিংয়ের পাঁচটি ভিন্ন ধরনের একটি। চওড়ায় ২০ মিটার ও লম্বায় ৪০ মিটার আয়তনের মাঠে বাস্কেটবলের মতো একটি বল দিয়ে খেলা হয়। প্রতি দলে থাকেন ১২ জন খেলোয়াড়, মাঠে থাকেন ৬ জন করে। ম্যাচের দৈর্ঘ্য ৫০ মিনিট, বিরতি হয় ২৫ মিনিট পর। সাধারণত এক হাত থেকে আরেক হাত হয়ে বল এগোয়। ড্রিবল না করে কোনো খেলোয়াড় ৩ সেকেন্ডের বেশি বল হাতে ধরে রাখতে পারেন না। রোলবলের এর আগের তিনটি বিশ্বকাপের দু’টি হয়েছিল ভারতে, একটি কেনিয়ায়। প্রথমবারের শিরোপা জিতেছিল ডেনমার্ক, পরের দু’বার ভারত। ২০১৫ সালে আয়োজিত সর্বশেষ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ৩৪ দলের মধ্যে সপ্তম হয়েছিল বাংলাদেশ। এবার নিজেদের দেশে আয়োজন বলে বাংলাদেশের প্রত্যাশা আরও বেশি কিছু।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ