বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেন আফ্রিদি

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : আগামী ১ মার্চ বয়স ৩৭ বছর পূর্ণ হবে আফ্রিদির। টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছিলেন আগেই। টি-টোয়েন্টিতেও অবসর নিচ্ছেন, এই গুঞ্জন উঠেছিল। তবে এবার আর গুঞ্জন নয়, তা রূপ নিয়েছে বাস্তবে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকেও বিদায় বলে দিলেন ‘বুমবুম’ খ্যাত শহীদ খান আফ্রিদি। আর তাতে ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনে ইতি টানলেন পাকিস্তানের বুমবুম খ্যাত এই ক্রিকেটার। যদিও দেশের ঘরোয়া টি টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে যাবেন বলে জানান আফ্রিদি। প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের হয়ে ৯৮টি টি-টোয়েন্টি খেলে ১৪০৫ রান করেছেন আফ্রিদি। বল হাতে নিয়েছেন ৯৭ উইকেট। ৩৯৮টি ওয়ানডে খেলে নামের পাশে যোগ করেছেন ৮০৬৪ রান। সর্বোচ্চ রানের ইনিংস ১২৪। একদিনের ক্রিকেটে তার  উইকেট সংখ্যা ৩৯৫টি। ২৭টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন আফ্রিদি। রান করেছেন ১১৭৬। সর্বোচ্চ স্কোর ১৫৬। উইকেট দখলে নিয়েছেন ৪৮টি। ২০১০ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেন আফ্রিদি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর একদিনের ক্রিকেট থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। গত বছর পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক ছিলেন।  কিন্তু ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভালো করতে পারেনি আফ্রিদির নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান। সঙ্গে যোগ হয়েছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কাছে হার। পাকিস্তান আসর থেকে ছিটকে যায় দ্রুতই। পরবর্তীতে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কের পদ থেকে সরে দাঁড়ান এই অলরাউন্ডার। এবার তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিলেন। অবসরের ঘোষণা তিনি আগেও দিয়েছেন। তবে কখনও নিজের ভাবনা বদলেছে, কখনও ‘পরিবার ও বন্ধুদের প্রবল চাপে’ বদলে গেছে সেই সিদ্ধান্ত। এবার আরও একবার অবসরের কথা জানালেন শহীদ আফ্রিদি।
গেল রোববার রাতে পাকিস্তান সুপার লিগে করাচি কিংসের বিপক্ষে পেশোয়ার জালমির ম্যাচের পর আফ্রিদি জানান, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আর খেলবেন না। গত ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির পর থেকে অবশ্য এমনিতেই দলে নেওয়া হচ্ছে না তাকে। অবসর না নিলেও আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাকে নেওয়ার সম্ভাবনা ছিল সামান্যই। ২০১০ সালের পর আর টেস্ট খেলা হয়নি আফ্রিদির। ২০১৫ বিশ্বকাপ শেষে বিদায় জানান ওয়ানডে ক্রিকেটকেও। সেই সময় বলেছিলেন, ২০১৬ ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি শেষে ছেড়ে দেবেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সব সংস্করণই। কিন্তু টুর্নামেন্টের আগে জানান, পরিবার ও বন্ধুরা তাকে প্রবল চাপ দিচ্ছে অবসর না নিতে। টুর্নামেন্টের পর নেতত্ব ছাড়লেও অবসর নেননি। কিন্তু পাকিস্তান দলও আর বিবেচনা করেনি তাকে। সেই সময়ের কোচ ওয়াকার ইউনুস আনুষ্ঠানিক রিপোর্টে বলেছিলেন, অধিনায়ক আফ্রিদি কি বলতে বা বোঝাতে চাইছেন, এটা নিয়ে দ্বিধায় থাকত ক্রিকেটাররা। ম্যানেজার ইন্তিখাব আলম তার প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, আফ্রিদি একদমই দিশাহীন একজন অধিনায়ক। তার ও দলের পারফরম্যান্স ও কোচ-ম্যানেজারের প্রতিবেদন মিলিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায়, আফ্রিদিকে আর নেয়া হবে না। মাঝে বার দু’য়েক আলোচনা হয়েছিল একটি ম্যাচে সুযোগ দিয়ে তাকে মাঠ থেকে বিদায় জানানোর।
শেষ পর্যন্ত হয়নি সেটিও। করাচির বিপক্ষে ম্যাচের পর আফ্রিদির কথায় স্পষ্ট হলো, মাঠ থেকে বিদায় নেয়া আর হচ্ছেই না তার। “আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে আমি বিদায় বলে দিয়েছি। এখন আমি খেলছি ভক্তদের জন্য এবং এবং এই লিগ আরও বছর দু’য়েক খেলতে চাই। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিয়েছি।”  ১৯৯৬ সালের অক্টোবরে কেনিয়ার চার জাতি প্রতিযোগিতায় অভিষেক হয়েছিল শহীদ আফ্রিদির। জীবনের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই ৩৭ বলে সেঞ্চুরি করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন ক্রিকেট দুনিয়ায়। এরপর থেকে আফ্রিদি যেন পাকিস্তান ক্রিকেটের এক অধ্যায়ই। ২১ বছর পর সেই অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলেন এই অলরাউন্ডার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায়টা তার একপ্রকার হয়েই গিয়েছিল। গত বছর ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দেয়ার পর আর পাকিস্তান দলে সুযোগ পাননি। বর্ণাঢ্য আনুষ্ঠানিকতায় বিদায় নিতে চেয়েছিলেন, সেটি হয়নি। আফ্রিদি অবশ্য জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিলেও আরও দুই বছর পাকিস্তানের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি লিগ পিএসএল-এ খেলে যাওয়ার ইচ্ছা আছে তার। বিদায় ঘোষণার দিনে পাকিস্তান সুপার লিগে দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেছেন তিনি। শারজায় পেশোয়ার জালমির হয়ে করাচি কিংসের বিপক্ষে ২৮ বলে ৫৪ রানের ইনিংসটি যেন মনে করিয়ে দিয়েছে পুরনো দিনের আফ্রিদিকে। বিদায়ের ঘোষণাটা আফ্রিদি দিলেন তাই তৃপ্তি নিয়েই, ‘আমি আমার ভক্তদের জন্য খেলি এবং পিএসএল-এ আরও দুই বছর খেলতে চাই। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায়ই নিয়ে নিচ্ছি। এই মুহূর্তে আমার দাতব্য সংস্থা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি আমার দেশকে দায়িত্ব নিয়ে ও পূর্ণ পেশাদারির সঙ্গেই প্রতিনিধিত্ব করেছি। হঠাৎ কেন বিদায় বললেন আফ্রিদি? গত কয়েকদিন ধরে ক্রীড়াঙ্গনে এমই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। বলা নেই, কওয়া নেই, নেই কোনো আনুষ্ঠানিকতা। পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) খেলছেন। ব্যাট হাতে কিংবা বল হাতেও সময়টা ভালোই যাচ্ছিল।  ম্যাচ শেষে হঠাৎ-ই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিলেন শহীদ খান আফ্রিদি? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে যা দেয়ার, তা দিয়ে ফেলেছেন আফ্রিদি? আর দেয়ার বাকি নেই? তাছাড়া পাকিস্তান জাতীয় দলও কি তার কাছ থেকে আর নতুন কিছু আশা করছে না? অনেক প্রশ্নই হয়তো চলে আসবে। দীর্ঘ ২১ বছরের ক্যারিয়ারে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে দু’হাত ভরে দিয়েছেন আফ্রিদি। ব্যাটে-বলে ক্যারিশমা দেখিয়েছেন রীতিমতো। চার-ছক্কা আর উইকেট শিকারে নিজেকে প্রমাণ করে গেছেন। টেস্ট, ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টি সব ফরম্যাটেই কার ব্যাট চলেছে সপাটে। ক্রিকেট যে বিনোদন, তার-ই নাম আফ্রিদি! আবারো অভিমান থেকেই যেন তিনি এ ঘোষণা দিয়েছেন।
দেশের জন্য যার এতো অবদান, সে কিনা একটি বিদায়ী ম্যাচও খেলতে পারবেন না? এমন কেমন আচরণ। হয়তো অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হবে না দেখেই দুর্দান্ত ফর্মে থাকা অবস্থাতেই আফ্রিদি তিন ফরমেটের ক্রিকেটকে ‘আল বিদায়’ বলেছেন। ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’ বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত এ প্রবাদ বাক্যটির সাথে হয়তো মিলে যেতে পাকিস্তানের অলরাউন্ডার ক্রিকেটার বুমবুম খ্যাত শহীদ আফ্রিদির ক্ষেত্রে। যদি না দেশটির ক্রিকেট সংস্থা থেকে তাকে আনুষ্ঠানিক বিদায় দেয়ার আয়োজন করতো।
ওয়ানডে ইতিহাসের রেকর্ড গড়া দ্রুততম সেঞ্চুরীর মালিক আফ্রিদির অবস্থা অনেকবারই দলে নড়বড়ে ছিল। এই আছেন তো আবার নেই। তবে বাজে পারফরমেন্সের কারণে দল থেকে বাদ পড়ার ঘটনা তেমনটি তার জীবনে বেশী ঘটেনি। যদিও বাজে পারফরম্যান্সের কারণেই তিন বছর আগে ইংল্যান্ডে হওয়া চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে স্থান হয়নি তার। সাবেক কোচ ওয়াকার ইউনুসের সাথে অভিমান করে দল থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। পরে পিসিবি’র অনুরোধে তিনি বিদায় নিয়ে আবার ফিরে আসেন। দলে ফিরেই তিনি তার আবশ্যকতার প্রমাণ দিয়েছেন। সেবার শ্রীলংকা সফরে তিনি একাই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন সাঙ্গাকারা বাহিনীকে। ঘোষণা দিয়েছিলেন দল চাইলে তিনি আরো কিছুদিন খেলতে রাজি। এখনো দেশকে তার অনেক কিছু দেয়ার বাকি আছে।
চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে দলের সবাই বাজে খেলায় আবারো তার ডাক পড়ে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির দল থেকে বাদ পড়ার পর পুনরায় দলে ফেরা আফ্রিদি বলেছিলেন, ১৭ বছর পাকিস্তান দলে খেলার পর পরবর্তী ম্যাচে তার খেলার নিশ্চয়তা না থাকাটা অত্যন্ত কষ্টের বিষয়। জিও নিউজকে আফ্রিদি বলেন, এমনকি ১৭ বছর পরও আমি জানি না পরবর্তী ম্যাচের দলে আমি থাকবো কি না। এমনকি ১৭ বছর পরও প্রতিটি ম্যাচই আমার শেষ ম্যাচের মতো এবং এটা অবশ্যই ঠিক নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমার ক্যারিয়ার ও বয়সের এ পর্যায়ে আমার জন্য সব সময় নিশ্চিত থাকা উচিত যে, আমি খেলছি, পরবর্তী ম্যাচে সুযোগ পেতে আমাকে কোন দুশ্চিন্তা করতে হবে না।’ 
২০০৯ টি-২০ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক আফ্রিদি। সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়ও তিনি। কিন্তু পরের বিশ্বকাপেই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদির। ২০১২ বিশ্বকাপেও হাফিজের নেতৃত্বে এক লড়াকু দলের অন্যতম সিপাহসালার মনে করা হচ্ছিল আফ্রিদিকে।
কিন্তু ব্যর্থ বুমবুম। যে ম্যারকুটে ব্যাটিং এর কারণে তিনি বুমবুম হয়েছিলেন, সেটিই আজ ফিকে হতে বসেছে। অথচ এই টি-২০ ফরমেটই ভাবা হচ্ছিল তার আদর্শ জায়গা। ওয়ানডে ক্রিকেটে যে আফ্রিদি বারবার চার-ছক্কার ফুলঝুরি ছড়িয়ে নিখাদ বিনোদন দিতেন, সেই তিনি হতাশ করেছেন দর্শকদের।
ওয়ানডেতে ৩৭ বলে সেঞ্চুরি হাঁকানো বুমবুমকে আর দেখতে পায়নি ক্রীড়ামোদীরা। ক্রমেই তিনি হয়ে গেছেন তার ছায়া।
ক্রিকেটের ক্ষুদ্রতম সংস্করণে তার ব্যাট সেভাবে কথা বলেনি কখনো। মাঝে মাঝে সামান্য জ্বলে ওঠার আভাস দিলেও পরক্ষণেই প্রত্যাশার পারদে ছাই ঢেলে দিয়েছেন নিজেই। যা তার সাথে মানানসই নয় মোটেই। কারণ তার ওয়ানডে পারফরমেন্স সে কথারই প্রমাণ দেয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ