সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

আমাদের ভাষা

আবুল মনসুর আহমদ : [তিন]
সে ভাষা নিশ্চয়ই জগাখিচুড়ি না হইয়া বরঞ্চ-ভূনি-খিচুড়ি হইবে যদি আমরা নি¤œলিখিত সাবধানতা অবলম্বন করি :
জগা বনাম ভুনি খিচুড়ি : ভাষায় নতুন জটিলতার আমদানি না করা, যথা :
‘করিতেছি’ অর্থে ‘করতেছি’ না বলিয়া ‘করছি’ বা ‘কচ্ছি’ বলা, ‘দেখিতেছি’ অর্থে ‘দেখতেছি’ না বলিয়া ‘দেখছি’ ‘বলা, ‘বলিতেছি’ অর্থে ‘বলতেছি’ না বলিয়া ‘বলছি’ বলা ইত্যাদি ইত্যাদি। এতে ভাষায় অনাবশ্যক জটিলতা বাড়িতেছে। কারণ ‘করছি’ ‘দেখছি’ পূর্ব-পাকিস্তানের অধিকাংশ জিলায় ‘সম্পন্ন বর্তমান কালে’র ক্রিয়া বুঝায় অর্থাৎ কাজগুলি হইয়া গিয়াছে। যদিও ঐ প্রকার ব্যবহারে পশ্চিম বাংলায় শব্দের প্রথম হরফে এবং পূর্ব-বাংলার জনগণকে অর্থের পার্থক্য বুঝান যাইবে না। সে চেষ্টাও অনাবশ্যক। কারণ পূর্ব-বাংলার প্রচলিত ‘করতেছি’ ‘দেখতেছি’ শব্দগুলি পশ্চিম-বাংলার লোকেরাও বলিতে ও বুঝিতে পারে।
২. বিভিন্ন আঞ্চলিক উচ্চারণকে হুবহু ভাষায় ফুটাইবার চেষ্টা না করা, যথা : শুনাকে ‘শোনা’, ‘ইচ্ছাকে ‘ইচ্ছে’, করবেনকে ‘কোরবেনা’ করবকে ‘কোরবো’, হলকে ‘হলো’, দেইকে ‘দি’, নাইকে ‘নি’, করতেছে ‘কত্তে’, পারতেছে ‘পাত্তে’, ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও বলিবার সময় আমরা অনেকেই ঐ রকমই উচ্চারণ করিয়া থাকি, তবু বানানের সময় ঐ উচ্চারণকে হরফে ফুটাইয়া তুলিবার দরকার নাই। ওটা উচ্চারকের উপরই ছাড়িয়া দেওয়া উচিত। যেমন ধরুন কোন কোন অঞ্চলের লোক লেখে ‘প্রথম’ ‘প্রস্তাব’, কিন্তু বলিবার সময় বলে ‘পেরথম’ ‘পেরথম’ ‘পেরেস্তাব’ ইত্যাদি। এইভাবে উচ্চারণের ব্যক্তিগত ও আঞ্চলিক স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া নিলে আমরা ‘করব’ লিখিয়াও ‘করবো’ বা ‘কোরবো’ ‘করে’ লিখিয়াও ‘কোরে’ বা ‘কৈরা’, ‘হয়ে’ লিখিয়াও ‘হোয়ে বা ‘হৈয়া’ উচ্চারণ করিতে পারিব এবং জটিলতা এড়াইয়াও আমরা পূর্ব-পাকিস্তানের সাধারণ কথ্য ভাষা সৃষ্টি করিতে পারিব।
৩. পশ্চিম-বাংলার অনুকরণে ‘ইয়া’ যুক্ত ক্রিয়াপদকে অতিরিক্ত মোচড়াইবার চেষ্টা না করা যথা:
সরাইয়া স্থলে ‘সরায়ে’র বদলে ‘সরিয়ে’, পরাইয়া স্থলে ‘পরায়ে’র বদলে ‘পরিয়ে’, পড়াইয়া স্থলে ‘পড়ায়ে’র বদলে ‘পড়িয়ে’, বেড়াইয়া স্থলে ‘বেড়ায়ে’র বদলে ‘বেড়িয়ে’, বাহির হইয়া স্থলে ‘বার হয়ে’র বদলে ‘বেরিয়ে’, পার হইয়া স্থলে ‘পার হয়ে’র বদলে ‘পেরিয়ে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব বিকৃতিতে ক্রিয়াপদকে অনাবশ্যকভাবে মূল ধাতু হইতে এতদূরে সরাইয়া দেওয়া হয় যে, চিনিবার উপায় থাকে না।
পক্ষান্তরে উক্ত ‘সরায়ে’ ‘পড়ায়ে’ ‘বেড়ায়ে ‘খাওয়ায়ে’ ‘পরায়ে’ বলিলে পূর্ব- ও ‘সরায়ে’ ‘বাড়ায়ে’ ইত্যাদি বলা হয় না। এখানে ‘সরাইয়া’ ‘বাড়াইয়া’ ইত্যাদি কেতাবী শব্দই উচ্চাণ করা হয়, শুধু হ্রস্ব ‘ই’ কে আরও একটু খাট করা হয় মাত্র। যেমন সরা’য়া বাড়া’য়া ইত্যাদি। শেষের ‘য়া’কে এখানে ‘য়ে’ করা হয় না। তবু পূর্ব-ও পশ্চিম-বাংলা-ভাষাভাষীদের নয়া মিশ্রণে পূর্ব-পাকিস্তানে যে নয়া যবান গড়িয়া উঠিবেম, তাতে পূর্ব-ও পশ্চিম-বাংলাভাষী পাকিস্তানীদের এই ভাষিক আপস আমাদের ভাষার উন্নতি বিধান করিবে বলিয়াই মনে হয়।
আপস ফর্মুলা : এই আপস-ফর্মুলা গ্রহণ করিলে উপরের ঐ মডেল বাক্যটি এইরূপ ধারণ করিবে: 
তুলার বাজার এমন মংগা আর দেখি নাই। তুলার অভাবে সূতার কলগুলি বন্ধ হয়ে গেছে। সূতার অভাবে পাল বোনো হচ্ছে না। পাল ছাড়া নৌকায় ক্ষেপ দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে হাঁড়ি-পাতিল বেচা-কেনা বন্ধ। কুমারদের হাতে খুবই অসুবিধা হয়েছে। দু’মুঠা ভাতের আশায় তারা খান্দানী পেশা থনে বার হয়ে এসেছে। তবে ভিক্ষা করে খাবার ইচ্ছা তাদের নাই। জরু-কবিলারে খাওয়ায়ে-পরায়ে বাঁচায়ে রাখবার জন্য তারা লাকড়ির পেশা ধরেছে। কাঠ কুড়াবার মতলবে তারা কুড়াল-হাতে নদী পার হয়ে সুন্দর বনে যায় খুব সকালে। সারাদিন বাদে বিকাল-সন্ধ্যায় কাঠ নিয়া ঘরে ফিরে আসে।
বলা বাহুল্য উপরের মডেল বাক্যটি আমার সাজেসশান মাত্র। এ সাজেসশানের আসল মতলব এই যে, সাধারণ শব্দই হউক আর ক্রিয়াপদই হউক কথা বলিবার সময় শিক্ষিত বক্তার মুখে সহজে বিনা চেষ্টায় বিনা-কৃত্রিমতায় আপনা-আপনি যা আসিয়া পড়ে তাই শুদ্ধ ভাষা। বিদেশী শব্দ সম্বন্ধে যা সত্য, পশ্চিম-বাংলার ক্রিয়াপদ সম্বন্ধেও  অবিকল তাই সত্য। আমি অনেক শিক্ষিত লোক ও কবি-সাহিত্যিকের মুখে একই বাক্যে একবার ‘খেয়েছি’ আবার ‘খাইছি’ ইত্যাদি দু’মিশালী ক্রিয়াপদের ব্যবহার দেখিয়াছি। এটাকে আমি দোষের মনে করি না। আমাদের মুখের কথ্য বাংলা বোধ হয় এইভাবেই তার ফর্মেটিভ মুদ্দত পার হইবে এবং হয়তো এই রূপেই স্ট্যান্ডার্ডাইজড্ হইবে।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই যে, রাজধানীর বাংগালী শিক্ষিত সম্প্রদায় তাঁদের বৈঠকখানায় স্কুলে-কলেজে ও অফিস-আদালতে মোটামুটি এই ধরনের দু’মিশালী ভাষাতেই কথা বলেন এবং চট্টগ্রাম হইতে রাজশাহী ও সিলেট হইতে খুলনা পর্যন্ত সারা পূর্ব-পাকিস্তানের শিক্ষিত-অশিক্ষিত-নির্বিশেষে সকলে এই ভাষা বুঝেন।
পরিভাষা-সমস্যা : আমাদের ভাষা-সমস্যার আরেক দিক পরিভাষা সম্বন্ধে আমাদের সুধী সমাজের একাংশের ধারণা। আমরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে উন্নত হইবার চেষ্টা করিতেছি। মাতৃভাষার মারফতে ছাত্রদেরে আমরা সকল শাখার জ্ঞান-বিজ্ঞান শিখাইবার সংকল্প নিয়াছি। তা করিতে গেলে ক্লাসে বাংলায় ঐ ঐ বিষয়ে লেকচার দিতে হইবে এবং বই-পুস্তক লিখিতে হইবে। কাজেই প্রশ্ন উঠিয়াছে আমাদের পরিভাষা সৃষ্টি করিতে হইবে। ইহাই তাঁদের অভিমত। সেই উদ্দেশ্যে তাঁরা বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ করিয়াছেন। কিছু-কিছু পরিভাষা তাঁরা সৃষ্টিও করিয়াছেন।
আমার ব্যক্তিগত মত এই যে, পরিভাষার প্রশ্ন আসলে একটা সমস্যাই নয়। আমাদের ভাষায় ইংরাজী বা বিদেশী যে-সব শব্দ চালু হইয়া গিয়াছে, ওগুলির বাংলা প্রতিশব্দ বাহির করিবার চেষ্টা নিছক পাগলামি। এমন শক্ত কথা বরার অপরাধ আমার মাফ করিবেন আপনারা। কিন্তু এ ছাড়া অন্য কোন শব্দও আমি কুঁজিয়া পাই না। ‘কাগজ’ ‘কলম’ ‘দোয়াত’ ইত্যাদি শব্দ আরবী এ অজুহাতে এক সময়ে হিন্দু পন্ডিতরা এ-সব শব্দ বাংলায় ব্যবহার করিবেন না বলিয়া যিদ করিয়াছিলেন এবং পরিভাষা সৃষ্টি করিবার চেষ্টায় ‘ভূর্জ-পত্র’ ‘লেখনী’ ও ‘মস্যাধার’ আবিষ্কার করিয়াছিলেন। আপনারা কি সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করিতে চান? আপনারা কি টেন স্টিমার টিকেট রেল ইউনিয়ন বোর্ড ইলেকশন ভোট প্রেসিডেন্ট মেম্বর জজ কোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট ইত্যাদি শব্দের প্রতিশব্দ বাহির করিতে চান? নিশ্চয়ই চান না। তবে আবার পরিভাষা কি? যা আমাদের ভাষায় চলিয়া গিয়াছে, যে-সব শব্দ আমরা দিনরাত নিজেদের কথাবার্তায় ব্যবহার করি, বুঝি এবং বুঝাই, সে সবই বাংলা শব্দ। একটি দৃষ্টান্ত দেই :
‘আগামী মার্চ মাসে আমাদের ইউনিয়ন বোর্ডের জেনারেল ইলেকশন হইবে। আমার বাবা প্রেসিডেন্টির ক্যানডিডেট হইয়াছেন। কাজেই ভোটারদের ক্যানভাস করিতে আমাদের কয়েকটা মিটিং করিতে হইবে। সেজন্য আমি স্কুলে কয়েক দিনের ছুটি চাহিয়া হেডমাস্টারের নিকট এপ্লাই করিয়াছি।’
এটা কি বাংলা ভাষা না? পূর্ব-পাকিস্তানে এমন কোনো শিক্ষিত অশিক্ষিত রোক আছে কি যে এটা বলে না বুঝে, না?
চলতি শব্দই বাংলা শব্দ : স্কুল-কলেজের বাহিরে যেটা চলে ভিতরে তা চলিবে না কেন? করেজের ভিতরের একটা দৃষ্টান্ত নেন।
‘আমাদের কলেজের ইকনমিকসের প্রফেসার গতকাল ক্লাসে খুব স্টাডি করিয়াই দিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। ওটা এত ইন্টারেস্টিং হইয়াছিল যে, আমরা সবাই তার ডিটেলড নোট নিয়াছি। তাতে প্রিটেস্টে পাস করা আমাদের অনেকের পক্ষেই খুব ইযি হইবে।’ এটা কি বাংলা ভাষা নয়? এই ভাষায় যদি প্রফেসররা লেকচার, দেন, তবে কার কি অসুবিধা হইবে? যেমন করিয়া কলেজ ক্লাস হসপিটাল প্রেসিক্রিপশন অপারেশন মেডিসিন ট্রিটমেন্ট ইন্সট্রুমেন্ট এক্সরে রেডিওলজি কার্ডিওগ্রাফ থার্মোমিটার স্টেথিসকোপ ইত্যাদি টার্ম আমাদের কথাবার্তায় ও লেখাপড়ায় ইস্তেমাল করি, তেমনি করিয়া আমরা যদি সমস্ত মেডিক্যাল লজিক্যাল বোটানিক্যাল ফিযিওলজিক্যাল ও সাইকলজিক্যাল টার্ম লেখায় ও কথায় ব্যবহার করি, তবে তাতে দোষ কি? অসুবিধা কোথায়?
দেশী ভাষায় প্রতিশব্দের তালাসে মানুষ গোঁড়ামির কোন স্তরে যাইতে পারে, তা দেখিয়াছিলাম আমি কলিকাতায়। আপনাদের হয়তো অনেকেই জানেন যে, ‘ইত্তেহাদ’ সম্পাদন উপলক্ষে পাকিস্তান হওয়ার পরেও প্রায় তিন বৎসর কাল আমার কলিকাতায় থাকিতে হইয়াছিল। সেই সময় পশ্চিম-বাংলা সরকার ডাক্তার সুনীতি চাটার্জীর নেতৃত্বে একটি পরিভাষা কমিটি নিয়োগ করেন। ঐ কমিটির রিপোর্ট বিবেচনার জন্য সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদগণের এক সভা হইয়াছিল। তাতে আমারেও ডাকা হইয়াছিল। কমিটি রিপোর্ট শুনিয়া আমাদের চক্ষু একদম চড়ক গাছ। তাঁরা মিউনিসিপ্যালিটি কর্পোরেশন হাইকোর্ট এডভোকেট সেক্রেটারিয়েট মিনিস্টার সেক্রেটারি মিলিটারি ক্যাবিনেট এসেম্বলি হোস্টেল রেস্টুরেন্ট টুর্নামেন্ট ভ্যানিটি ব্যাগ ইত্যাদি সুপ্রচলিত শব্দগুলির সংস্কৃত প্রতিশব্দ বাহির করিয়াছিলেন। আমিই ঐ রিপোর্টের প্রতিবাদে বক্তৃতা করি পথম। সভায় সমবেত শিক্ষাবিদগণ ঐ রিপোর্টের বিরুদ্ধে এত চটিয়া গিয়াছিলেন যে, আমার মতো পাকিস্তানী বাংগালীর সমর্থনে অধিকাংশ বক্তা বক্তৃতা করিয়াছিলেন। এ রিপোর্ট সে সভায় গৃহীত হইতে পারে নাই।
কিন্তু দেশ-প্রেমের উদ্দীপনা ও কৃত্রিম জাতীয়তাবোদের গোঁড়ামি সেখানে এতদূর অগ্রসর হইয়াছিল যে, জনমতের রাজনৈতিক চাপে পশ্চিম-বাংলায় এবং ভারতের অন্যান্য প্রদেশে ঐ রিপোর্ট বা অনুরূপ অন্যান্য রিপোর্ট গ্রহণ করিতে সরকার বাধ্য হইওয়াছিলেন। ফলে আজ ভারতে কাগজে-কলমে চীফ মিনিস্টারকে মুখ্যমন্ত্রী, আইন পরিষদকে বিধান সভা, কর্পোরেশনকে পৌরসভা, ভ্যানিটি ব্যাগকে ‘ফুটানি কি ডিবিয়া’, অল-ইন্ডিয়া রেডিওকে ‘অখিল ভারত আকাশবাণী’, অল-ইন্ডিয়া টেনিস টুর্নামেন্টকে ‘অখিল ভারত ঘেচুগেন্ডু ঝাপট’ বলবার চেষ্টা চলিতেছে। কিন্তু এসব অস্বাভাবিকতা কিছুতেই স্থায়ী হইতে পারে না। ভারতের জনগণ তাদের কথায় এবং লেখায় কিছুতেই এসব কষ্ট-কল্পিত কৃত্রিমতা মানিয়া নিতে পারে নাই।
আমাদের ভাষায়ও যদি আমরা অমন কোন কৃত্রিমতার আমদানি করি, তবে কালের স্রোতে তা ধুইয়া-মুছিয়া এবং জনমতের চাপে তা পিষিয়া যাইবেই। সুতরাং আমাদের কর্তব্য অতি সোজা। পরিভাষা সৃষ্টির চেষ্টায় সাহিত্যিকদের প্রতিভার অপচয় না করিয়া যে-সব বিদেশী শব্দ আমাদের কথাবার্তায় চলিয়া গিয়াছে, সেগুলি অকাতরে বই-পুস্তকে ও গোটা সাহিত্যে চালু করিয়া দেওয়া উচিত। আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা এবং অফিস-আদালতের অফিসাররা তাঁদের যাঁর- তাঁর এলাকায় কথা বলিবার সময় যে-সব বিধেমী শব্দ ব্যবহার করেন, লিখিবার সময়ও বাংলা হরফে সেইসব শব্দ ব্যবহার করিবেন। এতে গৌরব হানি হইবে না। ভাষার বিন্দুমাত্র অবনিত ঘটিবে না। বরঞ্চ তাতে আমাদের ভাষার শব্দ-সম্পদ বাড়িয়া যাইবে। এই ইলাস্টিসিটি ভাষাকে দ্রুত আধুনিক বৈজ্ঞানিক ভাষায় পরিণত করিবে।
আমার বক্তব্য শেষ হইয়াছে। আমি উপসংহারে এই আরয করিব যে, আপনারা বিাল ঐতিহ্যের অধিকারী এক নয়া জাতির কালচারের রিনেসাঁর আর্কিটেক্ট ও ইনজিনিয়ার। আমাদের দৃষ্টির স্বচ্ছতা, বুকের বল, প্রাণের সাহস, মনের উদারতা ও চিন্তার সবলতা আপনাদের দায়িত্বের উপযোগী হইতে হইবে। অতীতের ভুল শুধরাইবার সংকল্পে দৃঢ়তা, নয়া পথে পা বাড়াইবার বিপদকে বরণ করিয়া নিবার দুর্বার যিন, ব্যক্তিগত সুখ-সম্পদ ও আরাম-আয়াসে উপেক্ষা, যদি আমরা আয়ত্ত করিতে না পারি, তবে নয়া জাতি গড়িবার অধিকারী আমরা নই, মাথা হেঁট করিয়া সে সত্য আমাদের মানিয়া নেওয়া উচিত। নয়া কালচার ও নয়া ভাষা উভয় ক্ষেত্রেই এটা সত্য।
আপনারা দৃষ্টির সেই স্বচ্ছতা, চিন্তার সেই সবলতা এবং প্রাণের সেই সাহস নিয়া আগুয়ান হন, আপনাদের হাতে নয়া কৃষ্টি ফলে-ফুলে মঞ্চরিত হইয়া উঠুক, আমাদের রাষ্ট্র দুনিয়ার সভ্য রাষ্ট্রপূঞ্জের দরবারে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হউক, আমাদের মাতৃভাষা সম্পদশালী ইলাস্টিক ও বৈজ্ঞনিক ভাষায় রূপান্তরিত হইয়া একদিকে আমাদের জনগণের মুখের কথা ও মনের ভাবের বাহক হউক, অপরদিকে সে ভাষা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রকাশ ও প্রসারের উপযোগী মিডিয়াম হউক, সে ভাষা আধুনিক ও উন্নত পাক-বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব-সাহিত্যের আসরে শ্রদ্ধা ও সম্মানের অধিকারী করুক, আল্লাহ্র দরগায় এই মুনাজাত করিয়া আমি বক্তৃতার উপসংহার করিলাম।*
*১৯৫৮ সালের ৩রা মে চাটগাঁয় অনুষ্ঠিত পূর্ব-পাক সাহিত্য সম্মিলনীর কালচার ও ভাষ্য শাখার সভাপতির ভাষণের (বর্ধিত ও সংশোধিত) অংশ।  [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ