সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

বিশ্বনেতারা কখন স্বাভাবিক পথে হাঁটবেন

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে জনপ্রিয়তার দিক থেকে সবার চেয়ে নিচে অবস্থান করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। লন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট তাদের এক জরিপে জানিয়েছে, ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম এক মাসে জনপ্রিয়তায় অতীতের সব প্রেসিডেন্টের চেয়ে তলানিতে অবস্থান করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ক্ষমতা নেয়ার পর প্রথম এক মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের গড় রেটিং বা জনপ্রিয়তা হলো শতকরা ৬১ ভাগ। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবস্থান করছেন শতকরা ৪০ ভাগে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত সংস্থা গ্যালাপ ওই জরিপ পরিচালনা করেছে। এর এগ ক্ষমতার মেয়াদের প্রথম মাসের শেষ দিকে জনপ্রিয়তার সর্বনিম্নে ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। তার জনপ্রিয়তা ছিল শতকরা ৫১ ভাগ। সর্বনিম্ন রেটিং এর একটু উপরে ছিলেন আরেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড রিগ্যান। এ পর্যায়ে তার জনপ্রিয়তা ছিল শতকরা ৫৫ ভাগ। এদিকে ক্ষমতা গ্রহণের সময়েও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ছিল সর্বনিম্নে। রিয়েল এস্টেটের সাবেক ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা দুনিয়ায় চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। ক্ষমতায় এসেই তিনি ৭টি মুসলিম প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বন্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আদালত তার এ আদেশ বাতিল করে দেয়। এছাড়া হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করে ট্রাম্প তার সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সংবাদ মাধ্যমকে। গবেষকরা বলছেন, বহুল বিতর্কিত মুসলিম বিরোধী আদেশ তার জনপ্রিয়তার বেশি ক্ষতি করেছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ ত্যাগ করেছেন মাইকেল ফ্লিন। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোর শত্রু রাশিয়ার সঙ্গে তিনি এবং ট্রাম্পের নির্বাচনী শিবিরের ও প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের এই দহরম মহরমকে অনেকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না। বিষয়টি তাদের কাছে শুধু রহস্যজনক নয়, সন্দেহজনক বলেও বিবেচিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে নয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কর্মকা- বিশ্বে অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমরা জানি মহাবিশ্বের ছোট্ট একটি গ্রহ আমাদের এই পৃথিবী। স্রষ্টা তো মানববান্ধব করে পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু পৃথিবীর শাসকরা কি পৃথিবীটাকে মানুষের বসবাসযোগ্য রাখতে পারছেন? এই প্রশ্নের সদুত্তর বর্তমান সভ্যতার শাসকদের কাছে নেই। বিগত বছরগুলোতে তো মার্কিন শাসকরা ন্যায়, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও বৈচিত্র্যের কথা উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করতেন। কিন্তু ট্রাম্পের যুগে এসে হঠাৎ করে এমন কি হয়ে গেল যে বৈচিত্র্যের ঐক্যের বদলে মার্কিন প্রশাসন এখন বিভেদ ও বিদ্বেষের পতাকা তুলে ধরছে! মানুষ কি এ জন্য সমাজবদ্ধ হয়েছিল? মানুষতো উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য সমাজবদ্ধ হয়েছিল, রাষ্ট্র গঠন করেছিল।
মনুষ্য সমাজের বাইরেও সৃষ্টি জগতে আরো বহু কিছু আছে। সৌরজগত তো অনেক বিশাল ও রহস্যময়। সমুদ্র জগত কিংবা প্রকৃতি জগতের কতটুকুই বা আমরা জানতে পেরেছি। ওই সব জগতের বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে গেলে মনুষ্য সমাজ নিয়ে এখন তেমন অহংকার করা যায় না। তবে সৌরজগত ও প্রকৃতি জগত থেকে মনুষ্য সমাজের অনেক কিছুই শেখার আছে। শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের কারণেই টিকে আছে সৌরজগত ও প্রকৃতি জগত। আমরাও বলতে পারছি, ওরা মানব-বান্ধব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান সভ্যতায় পরাক্রমশালী রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র নেতারা কতটা মানব-বান্ধব? দাম্ভিক অনেক মানুষের মতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সৌর জগত ও প্রকৃতি জগতের ভিত্তি কিংবা শৃঙ্খলা উপলব্ধি করতে পারেননি তাই তো তিনি একের পর এক অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে মার্কিন সমাজে এবং বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা। তবে আশার কথা হলো, খোদ মার্কিন সমাজের অনেকেই ট্রাম্পের অস্বাভাবিক অভিযাত্রার সাথী হতে চাচ্ছেন না।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিতে অসন্তুষ্ট হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এশিয়ান-আমেরিকান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের আরো ১০ সদস্য পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ার টাং টি নিগুয়েন ও ভাইস চেয়ার মেরি ওকাদা ছাড়াও আছেন মাইকে বিউন ক্যাথি কো চিন, জ্যাকব ফিটিজিমানো, ডেফনি কোয়াক, ডিজে মেইলার, মলিক পাঞ্চোলি, লিন্ডা ফেন, সনজিতা প্রধান। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তারা অভিবাসন ও শরণার্থীদের নিয়ে ট্রাম্পের দেয়া নির্বাহি আদেশ এবং ওবামা আমলে নেয়া স্বাস্থ্য সেবা বাতিলের বিষয় উল্লেখ করেন। এছাড়া নতুন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা বসতে চেয়ে ১৩ জানুয়ারিতে চিঠি দিলেও তিনি কোন সাড়া দেননি বলে পদত্যাগ পত্রে জানানো হয়। এমন চিত্র থেকে উপলব্ধি করা যায়, ট্রাম্পের অস্বাভাবিক নীতি ও দাম্ভিক আচরণ খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সচেতন মানুষেরও পছন্দ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ‘অভিবাসীবিহীন একটি দিন’ কর্মসূচি পালন করা হয়। অভিবাসীদের প্রতি একদিনের জন্য কর্মবিরতি ও স্কুল বর্জনের ডাক দেয় অভিবাসনপন্থী শিবির। এ কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাজধানীর বেশ কয়েকটি খ্যাতনামা রেস্টুরেন্ট তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখেন। কোন কোন রেস্টুরেন্ট তাদের বসার চেয়ারগুলো টেবিলের ওপর চিৎ করে রেখে দেয় এটা বোঝানোর জন্য যে, অভিবাসীদের ছাড়া এই হাল হবে তাদের ব্যবসায়ের। ওয়াশিংটন, বোস্টন, শিকাগো, ফিলাডেলফিয়া, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে ওই কর্মসূচি ব্যাপক সাড়া ফেলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বলা হয়, ‘যারা সরাসরি শ্বেতাঙ্গ জন্মসূত্রে নাগরিক নয়, তাদের ওপর এতবড় নিপীড়ন ব্যবস্থা প্রতিরোধ করতে সপ্তাহের একটা কর্মদিবসে অবশ্যই আমাদের একত্র হওয়া দরকার এবং প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা’। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই বলছেন, যদি ব্যাপকহারে লোকজন এই কর্মসূচিতে অংশ নেয় তবে কী ঘটবে? কেমন দেখাবে যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোকে? ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিভেদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্র নানা ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার লোকদের একটি দেশ। অনেকেই বলে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্র আসলে অভিবাসীদের একটি দেশ। এ কারণেই অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ দর্শনকে ধারণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। কিন্তু ট্রাম্প এখন চলছেন ওই নীতির বিপরীতে। তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন অচিরেই ট্রাম্পের বোধোদয় ঘটবে এবং তিনিও ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ দর্শনকে ধারণ করে রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক পথে হাঁটবেন। নইলে তাঁর হিসেবে ক্ষতির মাত্রাই বাড়বে। ট্রাম্পের মত একজন ব্যবসায়ী কি ক্ষতির অঙ্কটা বুঝবেন না?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ