সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

বিএসএফ ডিজি’র নতুন কথা

সীমান্তে বাংলাদেশীদের মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসায় বিএসএফ সদস্যদের ওপর কথিত অপরাধীদের আক্রমণ নাকি অনেক বেড়ে গেছে। ভারতের সীমান্তরক্ষীরা নাকি চোরাচালানীসহ দুর্ধর্ষ অপরাধীদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে। বিজিবি’র সঙ্গে অনুষ্ঠিত ৪৪ তম সীমান্ত সম্মেলনে কথাগুলো বলেছেন বিএসএফ-এর ডিজি কে কে শর্মা। পিলখানায় বিজিবি সদর দফতরে দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এই সম্মেলন শুরু হয়েছিল গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। সম্মেলন শেষ হয়েছে ২২ ফেব্রুয়ারি। সাধারণত এ ধরনের কোনো সম্মেলন শেষ হওয়ার পরই উভয়পক্ষ সংবাদ সম্মেলন করে থাকে। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটেছে। সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে একদিন আগে, ২১ ফেব্রুয়ারি। সেখানেও দুই বাহিনীর পক্ষ থেকে সম্মেলনে আলোচিত বিভিন্ন বিষয়বস্তু সম্পর্কে লিখিত বক্তব্য পেশ করেছেন বিজিবি’র জনসংযোগ কর্মকর্তা।
এই সংবাদ সম্মেলনেই বিএসএফ-এর ডিজি তার সৈনিকদের ওপর আক্রমণ বেড়ে যাওয়ার নতুন ও বিচিত্র তথ্যটি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিএসএফ প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করায় সীমান্তে বাংলাদেশীদের মৃত্যুর সংখ্যা কমে গেছে সত্য কিন্তু উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে অপরাধীদের ভয়ংকর আক্রমণ। মিস্টার শর্মা আরো বলেছেন, তার সৈনিকেরা নন-লিথাল বা প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র দিয়ে ফায়ার করে বলেই মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। বিএসএফ যে ‘আত্মরক্ষার’ স্বার্থেই অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে- সে কথাটারও পুনরাবৃত্তি করেছেন মিস্টার কে কে শর্মা। একই কারণে এসব ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড না বলে মৃত্যু হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশী নাগরিকদের ওপর গুলী চালানোর এবং তাদের হত্যা করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সীমান্তে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন বিজিবি’র ডিজি মেজর জেনারেল আবুল হোসেন। এ উদ্দেশ্যে বিএসএফ-এর প্রতি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার এবং ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন তিনি।
সীমান্তে হত্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে পশু ও মাদকের চোরাচালান প্রবণ এলাকায় সমন্বিত যৌথ টহল দেয়ার এবং সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে সীমান্ত সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন ও বিধি-বিধান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বিজিবি ও বিএসএফ-এর পক্ষে যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারেও উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছেন। সীমান্তে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ক্ষেত্রে যৌথভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, শনাক্তকরণ ও মূল্যায়নের বিষয়ে একমত হলেও ঘটনার তদন্তের প্রশ্নে বিজিবি’র ডিজি বলেছেন, হত্যাকাণ্ড যেহেতু ফৌজদারি অপরাধ সেহেতু এসবের তদন্ত করবে উভয় দেশের পুলিশ। এই তদন্ত করার এখতিয়ার বিজিবি বা বিএসএফ-এর নেই।
যৌথ অনুশীলন, দুঃসাহসিক প্রশিক্ষণ, মাউন্টেইন ক্লাইম্বিংসহ আরো কিছু বিষয়ে একমত প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে শেষ হলেও বিজিবি ও বিএসএফ-এর এই সীমান্ত সম্মেলন কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের মনে আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে পারেনি। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে বিএসএফ-এর ডিজি’র একটি বক্তব্যকে প্রাধান্যে আনা হচ্ছে- যার মূলকথায় তিনি বলেছেন, বাংলাদেশীদের মৃত্যুর সংখ্যা কমে আসার পাশাপাশি চোরাচালানীসহ অপরাধীদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিএসএফ-এর সৈনিকরা। মিস্টার শর্মার এই কথাটাকে নতুন পর্যায়ে হত্যাকাণ্ড শুরু করার অশুভ কৌশল মনে করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তিনি আসলে অজুহাত তৈরি করতে চেয়েছেন. যাতে আবারও হত্যাকাণ্ড শুরু হলে বলা যায়, তিনি তো অপরাধীদের আক্রমণ সম্পর্কে ঢাকা সম্মেলনেই জানিয়ে রেখেছেন! আমরা জানি না, সীমান্ত সম্মেলনে রাখা বক্তব্যে কথিত আক্রমণের বিষয়ে বিএসএফ-এর পক্ষ থেকে কোনো তথ্য-পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়েছে কি না। হয়ে থাকলেও বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করার কোনো যুক্তি আছে বলে আমরা অন্তত মনে করি না। কারণ, সত্যিই তেমনটি ঘটলে এতদিনে সে খবর বাংলাদেশ ও ভারতের গণমাধ্যমে চলে আসতো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও খবরে পরিণত হতো- যেমনটি হয়েছে বাংলাদেশীদের হত্যার বিষয়টি।
প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, চোরাচালানীদের সঙ্গে বিএসএফ সৈনিকদের ঘনিষ্ঠতা ও যোগসাজশের ব্যাপারে অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ রয়েছে। বলা হয়, পশু ও ড্রাগ থেকে সোনা ও অস্ত্র পর্যন্ত চোরাচালানের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিএসএফ-এর সৈনিকরাই প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। এর ফলে চোরাচালান শুধু বাড়ছেই। বড়কথা, ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আসছে অস্ত্র এবং নানা ধরনের নেশার সামগ্রী। অনেক উপলক্ষেই প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, আসাম, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মনিপুর ও ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তসংলগ্ন এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে নেশা সামগ্রীর অসংখ্য কারখানা। যশোর-কুষ্টিয়া থেকে সিলেট ও কুমিল্লা পর্যন্ত দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন ভারতীয় এলাকায় রীতিমতো হাট বসছে প্রতিদিন। বেচাকেনা চলছে প্রকাশ্যে। বস্তা বোঝাই করে অস্ত্র ও নেশার সামগ্রী বাংলাদেশের ভেতরে নিয়ে আসছে চোরাচালানীরা। সবই ঘটছে বিএসএফ-এর চোখের সামনে। কোথাও তারা দেখেও না দেখার ভান করছে, কোথাও আবার তারাই সহযোগিতা করছে। একই বিএসএফ আবার ফেলানীর মতো কিশোরীর ব্যাপারেও যুদ্ধংদেহী হয়ে উঠছে।
সুতরাং মিস্টার শর্মা যা-ই বোঝাতে চেয়ে থাকুন না কেন, বিএসএফকে অন্তত ‘সাধু-সন্ন্যাসী’ বানিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। কারণ, দেখা গেছে, কখনো ঘুষের লেনদেন নিয়ে মতপার্থক্য ঘটলে তখনই বিএসএফ গুলী চালিয়ে থাকে। আর মৃত্যুও কেবল বাংলাদেশীদেরই হয়! এভাবে ভারতীয়রা কখনো মারা গেছে- এমন তথ্য-প্রমাণ কিন্তু এবারের মতো অতীতেও বিএসএফ-এর কোনো ডিজি দেখাতে পারেননি। অথচ যে কোনো চোরাচালানে ভারতীয়দের ভূমিকাই প্রধান থাকার কথা। কারণ, চোরাচালান অনেক বেশি হয় ভারতের দিক থেকে। বাংলাদেশকে ভারতীয় পণ্যের বাজারও তারাই বনিয়েছে। এমন অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বিএসএফ-এর ওপর কথিত আক্রমণও ভারতীয় চোরাচালানীরাই চালাচ্ছে- যদি মিস্টার শর্মার অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে। একই কারণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও ভারতকেই নিতে হবে। একে নতুন পর্যায়ে বাংলাদেশীদের হত্যার অজুহাত বানানো চলবে না। 
আমরা আশা করতে চাই, সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যাকাণ্ডকে ‘মৃত্যু’ বলে চিহ্নিত করার এবং ‘আত্মরক্ষার অধিকারের’ নামে বিএসএফকে হত্যার ওপেন লাইসেন্স দেয়ার অপতৎপরতা বন্ধ করা হবে। কোনো ধরনের অপকৌশল গ্রহণ করার পরিবর্তে সততার সঙ্গে সীমান্ত প্রহরার ব্যবস্থা নেয়া হলেই বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে হত্যা ও মৃত্যু বন্ধ হবে। শান্তি ফিরে আসবে। আমাদের ধারণা, ভারতের সাধারণ মানুষও সেটাই চান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ