শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রাজধানীতে অবৈধ লেগুনা-ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের দাপট? জিপির নামে দৈনিক লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি

তোফাজ্জল হোসেন কামাল: যানজটের নগরী ঢাকার ব্যস্ততম রাস্তা দখল করে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক (অটোরিকশা) ও ফিটনেসবিহীন লেগুনার স্ট্যান্ড। এসব গাড়ির চালকের আসনে বসে আছেন আনাড়ী আর অদক্ষ ব্যক্তিরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্করাও চালকের ভূমিকায়। এসব চালকের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। ইজিবাইক ও লেগুনার স্ট্যান্ডের ফলে তীব্র যানজটের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারীরা। অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও পুলিশের বিরুদ্ধে দৈনিক লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। পুলিশকে মাসোহারার টাকা দিতে দেরি হলেই শুরু হয়ে যায় রেকার ও ডাম্পিং বাণিজ্য। আর নেতাদের চাঁদার টাকা একটু পরে দেয়ার অজুহাত দেখালেই শুরু হয় গাড়ি আটকিয়ে রাখার নির্যাতন।

যানজটের এই নগরীর গণপরিবহনে সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা লেগুনা বাহনটির ‘রুট পারমিট’ না থাকলেও ‘বৈধ’ কাগজ নিয়ে সব রুটেই চলছে দুর্দান্ত প্রতাপে। এমনকি এদের কাগজ আছে কি নেই সে নিয়েও কারো কোনও মাথা ব্যাথা নেই। চকচকে প্রাইভেট কার থামিয়ে গাড়ির কাগজ পরীক্ষা করলেও এসব লেগুনাকে দাঁড় করিয়ে কখনও কাগজ চেক করতে দেখা যায় না। গায়ে কেবল নিজেদের ইচ্ছেমতো রুটটা লিখে নিলেই হয়। এসব কারণ হিসেবে ট্রাফিক সার্জেন্ট ও অন্যান্য গাড়ির চালকরা বলছেন, ট্রাফিক পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে তাদের লেনদেনের চুক্তি আছে। এমনকি এসব গাড়ির মালিকানায়ও আছে পুলিশ!

সকাল সাড়ে দশটা। চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের দিকে যেতে হাতের বাঁয়ে থেমে গেল একটি লেগুনা। গায়ে লেখা ফার্মগেট-পল্লবী। গাড়ি থেকে নেমে ছেলেকে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ালেন সায়মা খাতুন। তিনি বলেন, ‘যেখান-সেখানে এসব লেগুনা বন্ধ হয়ে গেলে পথেই নেমে যেতে হয়। এদের সঙ্গে কথা বলে কোনও লাভ নেই।’

কেন এসব গাড়িতে ঝুঁকি নিয়ে চলেন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে। এরা একটু আগে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। মূলত সে কারণেই চড়া। তবে এসব গাড়ির হাল ভীষণ খারাপ।’ গত এক বছরে কখনও এদের গাড়ির কাগজ চেক করতে দেখেছেন কিনা প্রশ্নে তিনি না সূচক বক্তব্য দেন।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। শ্যাওড়াপাড়ার জ্যামে আটকা গাড়ি। হঠাৎই বাম পাশের মহল্লার রাস্তায় ঢুকে পড়ে একের পর এক লেগুনা। একজন কাজীপাড়া নামবো বলে চিৎকার দিতে সামনের রিক্সাকে ধাক্কা দিয়ে লেগুনা ব্রেক করে এবং ওই যাত্রীকে নামিয়ে দেয় মহল্লার ভিতরে। এভাবে মহল্লায় কেন গাড়ি ঢুকলো প্রশ্নে চালক মনির বলেন, ‘এই জ্যামে না বসে ভিতর দিয়ে আগে যেতে পারবো।’ কিন্তু যাত্রীরা তো আপনি রোকেয়া সরণি দিয়ে যাবেন বলে উঠেছে, প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘কথা বলে নিয়েছি, কাজীপাড়ার একজন ছিল তাকে নামিয়ে দিয়েছি।’

কোনও রুট নির্ধারিত না থাকা বিষয়ে ট্রাফিক সার্জেন্টরা বলছেন, ‘এটির পিছনে বড় ধরনের সিন্ডিকেট আছে। এদের কেউই কিছু করতে পারে না।’

লেগুনা চালনার ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে এটির প্রমাণ মেলে খোদ সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথাতেই। তিনি বলেন, ‘মাইক্রোবাস কেটে যে লেগুনা বানানো হচ্ছে তার কোনওটিরই বৈধ কাগজপত্র নেই। এখানে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হেলপার বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে ট্রিপপ্রতি ১০ টাকা নেয়া হয়। পুলিশের গাড়ি বলে কাগজ ছাড়া চালাতে পারি। না হলে তো বসেই থাকা লাগতো।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এলাকার একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, এসব গাড়ির মালিক-চালকদের সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশ ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের লেনদেনের চুক্তি রয়েছে। আমরা জানি কিন্তু কিছু বলি না। কারণ এদের সব জায়গায় সেটিং আছে। খামখা আমাকে আমার জায়গা থেকে সরায়ে দেয়া হবে, কী দরকার। তিনি আরও বলেন, ‘এসব গাড়ি চালায় ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোররা, হেলপার হিসেবে থাকে ১২ বছরের নীচের শিশুরা। আমাদের সামনে দিয়েই এসব চলছে। কিন্তু বলার কিছু নেই।’

মালিবাগ মোড় থেকে মুগদা এলাকায় যাতায়াত করে মৃদুল পরিবহনের অর্ধশত লেগুনা। এ সবের মধ্যে একটু নজর দিলেই দেখা যায় চালকের আসনে বসে আছে অপ্রাপ্তবয়স্করা। হেলপার হিসেবে শিশুরা কাজ করছে। এই রুটে যাত্রীদের আধিক্যের কারনে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই লেগুনার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে গড়ে ওঠেছে চাঁদাবাজির যৌথ সিন্ডিকেট। জিপির নামে তোলা চাঁদার অংশ সংশ্লিষ্ট চার থানা এলাকার থানা পুলিশের কাছে মাস শেষে পৌঁছালেও মাঝ পথে হাত উঠিয়ে লেগুনা থামিয়ে চাঁদাবাজীতে পুলিশের কতিপয় সদস্য কি আচরন করেন ,তা সরেজমিন চোখে পড়ার মতো। যৌথ চাঁদাবাজীর কারনে সম্প্রতি ওই রুটের ভাড়া যাত্রী প্রতি দু’টাকা বাড়াতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজধানীর রাস্তায় বিপুল সংখ্যক অবৈধ যানবাহন চলাচলের কারণে ভয়াবহ যানজটের কথা স্বীকার করে ট্রাফিক পুলিশের উপ-কমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মাঝে মাঝে আমরা ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র ও ফিটনেস না থাকা যানবাহন আটকের জন্য অভিযান চালাই। এসব ক্ষেত্রে কখনও কখনও এদের মালিকরা এসে রাজধানীতে চলাচল করবে না এমন মুচলেকা দিয়ে এবং কাগজপত্র সংশোধন করে নেবে সেই শর্তে ছাড়িয়ে নিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু কথা রাখে না।’ এসব লেগুনার সঙ্গে পুলিশের মালিকানার সম্পর্ক থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে জানা নেই।’

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির চেয়ারম্যান মো. মশিয়ার রহমান বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। লেগুনার রোড পারমিট আছে কিনা বা রুটগুলো সম্পর্কে আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো। যদি অবৈধ হয় তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেব।’

দুর্ঘটনা আর লাখ টাকা চাঁদাবাজি

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, গত দুই মাসের মধ্যে অটোচাপায় দক্ষিণখান থানার এপিএস গার্মেন্টের সামনে এক নারী পোশাক শ্রমিক, উত্তরখান বালুরমাঠ এলাকায় শিশু, আটিপাড়ায় যুবকসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। উত্তরার বিভিন্ন স্থানে লেগুনা ও অটোচাপায় আহত হয়েছেন প্রায় পঞ্চাশজন।

আব্দুল্লাহপুরের পূর্ব পাশের বেড়িবাঁধে দেখা যায়, রাস্তার দু’পাশেই অটো ও লেগুনার দীর্ঘ লাইন। গাজীপুরের কালীগঞ্জে যাওয়ার অন্যতম দ্রুত পথ এটা এবং উত্তরখান-দক্ষিণখান যাওয়ার অন্যতম ব্যস্ততম সড়ক। দুপাশেই দীর্ঘ লাইনের কারণে ব্যাপক সময় নষ্ট হয় যাত্রীদের।

লাইনম্যানদের ৭/৮ জনের হাতে রয়েছে কাঠ ও লোহার রড। যারা নেতার (নিয়ন্ত্রণ কর্তার) হয়ে টাকার বিনিময়ে লাইনম্যান হিসেবে কাজ করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন লাইনম্যান জানান, এ সড়কে প্রায় ৪৫০টি অটো রয়েছে এবং প্রতিটি অটো থেকে দৈনিক ১০০ টাকা করে নেয়া হয়। চাঁদাবাজদের ভাষায় সংক্ষেপে চাঁদাকে জিপি বলা হয়। এর নেতৃত্বে রয়েছেন দক্ষিণখান ফায়দাবাদের এক আওয়ামী লীগ নেতা। অপরদিকে এই সড়কের ৮০টি লেগুনার নেতৃত্বে রয়েছেন উত্তরখান মাস্টারপাড়ার এক স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা। সেখানে প্রতিটি লেগুনা থেকে নেয়া হচ্ছে দৈনিক ৩০০ টাকা করে। 

একই এলাকার পশ্চিম পাশের মিনিবাস চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামীণ সেবা, ক্লাসিক পরিবহন, বিসমিল্লাহ্ পরিবহন, সৈকত পরিবহন, দেওয়ান পরিবহন, দোয়েল পরিবহন, আবু সালেহ পরিবহন, এম অ্যান্ড এম এন্টারপ্রাইজসহ নানা নামে আব্দুল্লাহপুর টু নবীনগর ও আশুলিয়াগামী প্রায় ২৫০টি মিনি বাস রয়েছে। প্রতিটি বাস থেকে দৈনিক ৪০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

উত্তরার হাউজ বিল্ডিং একালার পূর্ব পাশের উত্তরা ৮ নং সেক্টরস্থ আবহাওয়া কোয়ার্টারের সামনে আওয়ামী লীগের এক নেতার নেতৃত্বে শতাধিক ইজিবাইকের নিয়ন্ত্রণ করছে লাইনম্যান ছাত্তার ও শফিক। যার প্রতিটি থেকে দৈনিক ১২০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এলাকার পশ্চিম পাশে থাকা ৭০টি লেগুনার নেতৃত্বে উত্তরার এক কাউন্সিলর নিজেই। নিয়ন্ত্রণে হাউজ বিল্ডিংয়ে কাজ করছে কাউসার ও দিয়াবাড়ী এলাকায় সেলিম। প্রতিটি লেগুনা থেকে হাউজবিল্ডিং এলাকায় ২০০ টাকা ও দিয়াবাড়ী এলাকায় ১২০ টাকা করে নেয়া হচ্ছে। লাইনম্যান হিসেবে রয়েছে পনিরসহ ৭/৮ জন। 

স্থানীয়রা জানান, আজমপুরের পূর্ব পাশের ইজিবাইক স্ট্যান্ডের নেতৃত্বে রয়েছে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা ও তার দুই ভাই। এ স্ট্যান্ডের পাঁচ শতাধিক গাড়ি থেকে দৈনিক ১০০ টাকা করে আদায় করছে লাইনম্যান রানা, ছোট বিকাশসহ অন্তত ১০ জন। এ স্থানে ইজিবাইক এমনভাবে রাস্তা দখল করে আছে যেন, প্রতিনিয়ত সাধারণ জনগণকে চলার পথে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আজমপুরের পশ্চিম পাশের এক লেগুনা চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৪০টি লেগুনার চালকদের কাছ থেকে দৈনিক ২০০ টাকা করে আদায় করছে স¤্রাট ও মোক্তার। 

বিমানবন্দরের হাজী ক্যাম্পের সামনে থাকা হাজারো অটোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন আওয়ামী মহিলা লীগের এক নেত্রী। প্রতিটি অটোরিকশা থেকে দৈনিক ৫০ টাকা করে আদায় করছেন তিনি। তাছাড়াও বিমানবন্দর ট্রাফিক পুলিশ বক্সের ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই) আলীম চৌধুরী নামে প্রতি সপ্তাহে অটো প্রতি ১২শ’ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। টাকা দিতে না পারলেই ওই পুলিশ কর্মকর্তা ইজিবাইক পুলিশ বক্সে আটকে রেখে ডাম্পিং ও রেকার বাণিজ্য করেন। হাজী ক্যাম্পের সামনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইজিবাইক চালক এসব কথা জানান। 

আব্দুল্লাহপুর, হাউজবিল্ডিং, আজমপুর, বিমানবন্দরে উত্তোলনকৃত চাঁদার একটি মোটা অংশ আব্দুল্লাহপুরের এক টিআই, হাউজবিল্ডিংয়ের টিআই, বিমানন্দরের টিআইসহ উত্তরা পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণখান থানা পুলিশকে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও একটি ভাগ পাচ্ছে আজমপুর পুলিশ ফাঁড়ি।

ট্রাফিক পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি-উত্তর) প্রবীর কুমার রায় বলেন, ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা মহাসড়কে যানজট নিরসনেই ব্যস্ত। সদস্য সংখ্যা কম হওয়ার কারণে অবৈধ অটো উচ্ছেদে ঠিকমতো অভিযান করা সম্ভব হয় না। তবে মাঝে মধ্যেই অবৈধ অটো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ