শনিবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

এমপি লিটন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী জাতীয় পার্টি নেতা আব্দুল কাদের খান

সুন্দরগঞ্জে আওয়ামী লীগের এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যায় সুন্দরগঞ্জের সাবেক এমপি আবদুল কাদের খানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ
  • জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে

গাইবান্ধা থেকে জোবায়ের আলী: সুন্দরগঞ্জে আওয়ামী লীগের এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যায় সুন্দরগঞ্জের সাবেক এমপি আবদুল কাদের খানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ।

গতকাল বুধবার গাইবান্ধার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মইনুল হাসান এ আদেশ দেন।

আদালতে পুলিশের এসআই শাহ আলম জানান, বেলা ১২টার দিকে পুলিশ আসামীকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে বিচারক তা মঞ্জুর করেন।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল কাদের খানকে গত মঙ্গলবার তার বগুড়ার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়।

গতকাল বুধবার সকালে সাংবাদিক সম্মেলনে পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, কাদের খান এক বছর ধরে এমপি লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া ৪ জনকে একটি গুদামে ৬ মাস ধরে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া ৪ জনের মধ্যে কাদের খানের গাড়িচালক আবদুল হান্নান, বাসার তত্ত্বাবধায়ক শাহিন মিয়া ও মেহেদী গ্রেফতার হওয়ার পর হাকিম আদালতে ‘১৬৪ ধারায় জবানবন্দী’ দেন। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই কাদের খানকে গ্রেফতার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া রানা নামের আরেকজন এখনো পলাতক।

গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সুন্দরগঞ্জের সর্বানন্দ ইউনিয়নের শাহবাজ মাস্টারপাড়ার নিজ বাড়িতে এমপি লিটন দুর্বৃত্তদের গুলীতে নিহত হন। এ ঘটনায় লিটনের বোন তাহমিদা বুলবুল বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৪-৫ জনকে আসামী করে ১ জানুয়ারি সুন্দরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ডা. কাদের খানসহ ১১০ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

এমপি লিটন খুন হওয়ায় শূন্য আসনে উপ-নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী ২২ মার্চ। এ নির্বাচনে কাদের খান জাতীয় পার্টির মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত জমা দেননি।

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডা কাদের খানের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপড়হাটি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাপড়হাটি খানপাড়া গ্রামে। ২০০৮ সালে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি সুন্দরগঞ্জের এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

পুলিশ বলছে, সুন্দরগঞ্জ আসনের সরকারদলীয় এমপি মো মনজুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থ যোগানদাতা জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খান। লিটনকে হত্যার জন্য একবছর ধরে তিনি নানাভাবে পরিকল্পনা করে আসছিলেন। গত ছয় মাস ধরে তিনি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া কিলারদের বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেন।

গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা পুলিশ সুপার আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক লিটন হত্যাকাণ্ডে কাদের খান জড়িত থাকার কথা তুলে ধরেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে আরো জানানো হয়, কর্নেল কাদের খানের গাড়িচালক আবদুল হান্নান হত্যাকাণ্ডে কিলারদের পালিয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন সহযোগিতা করেন। হত্যাকাণ্ডে তার ভাতিজা শাহীন মিয়া ও কেয়ারটেকার মেহেদীসহ চারজন অংশ নেন। এর মধ্যে রানা নামে একজন পলাতক রয়েছেন। তাকেও গ্রেফতারে তৎপর রয়েছে পুলিশ।

এদের মধ্যে হান্নান, মেহেদী ও শাহীনকে গত মঙ্গলবার ভোররাতে গ্রেফতার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দেয়ার জন্য আদালতে হাজির করা হয়। পরে তারা আদালতের বিচারক মইনুল হাসান ইউসুফের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন।

রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক সম্মেলনে বলেন, কর্নেল কাদের খান শুধু এমপি লিটনকে হত্যা নয়, উপ-নির্বাচনে অংশ নেয়া জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকেও হত্যার পরিকল্পনা করে আসছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, মূলত এমপি লিটন ও শামীম হায়দারকে সরিয়ে দিতে পারলে তিনি সুন্দরগঞ্জে আবারও এমপি নির্বাচিত হবেন। এমপি নির্বাচিত হওয়ার ইচ্ছা ও লোভ থেকেই এমপি লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, লিটন হত্যাকাণ্ডের পর থেকে রাজনৈতিক দ্বন্দ¦সহ নানা দিক নিয়ে তদন্ত ও গ্রেফতার অভিযান চালিয়ে আসছিল পুলিশ। এ সময় একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহার করা গুলী ও ম্যাগাজিনের সূত্র ধরেই কাদের খানকে চিহ্নিত করা হয়। হত্যাকাণ্ডে যে অস্ত্র ও গুলি ব্যবহার করা হয় তারও প্রমাণ মিলেছে কাদের খানের ব্যবহার করা অস্ত্র থেকেই। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আরও কোনো পরিকল্পনাকারী বা হত্যার সঙ্গে জড়িত আছে কি না তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

এ সময় পুলিশ সুপার মো আশরাফুল ইসলাম (বিপিএম, সেবা), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো ফারুক আহম্মেদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) রবিউল ইসলামসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া সংবাদ সম্মেলনে লিটনের স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদা জাহান স্মৃতি, বোন তাহমিদা বুলবুল কাকুলীসহ জেলা আ লীগের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত এমপি লিটনের স্ত্রী সৈয়দা খুরশিদা জাহান স্মৃতি ও বোন তাহমিদা কাকুলী বুলবুল হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ও জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের গ্রেফতার করায় প্রধানমন্ত্রীসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে মামলায় আসামীদের সর্ব্বোচ শাস্তি দাবি করেন।

সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিয়ার রহমান জানান, লিটন হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগে সুন্দরগঞ্জ উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে জামায়াত-শিবির, বিএনপির নেতাকর্মীসহ অন্যদের মধ্য থেকে অন্তত ১২৮ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

তিনি আরও জানান, আটকদের মধ্যে থেকে ২৩ জনকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এর মধ্যে সুন্দরগঞ্জের সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আহসান হাবীব মাসুদ, জামায়াতের অর্থের যোগানদাতা হাজী ফরিদ উদ্দিন, আশরাফুল ইসলাম, জহিরুল ইসলামসহ ১৪ জনকে রিমান্ডে নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৫২ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর জড়িত সন্দেহে ডা. আবদুল কাদের খানকে গত মঙ্গলবার বিকেলে বগুড়া জেলা শহরের কাদের খানের পরিচালিত গরীব শাহ ক্লিনিক থেকে আটক করা হয়। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে বগুড়া থেকে পুলিশভ্যানে করে গাইবান্ধা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয় কাদের খানকে।

আটক কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খান গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি। তিনি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপরহাটি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাপরহাটি (খানপাড়া) গ্রামের মৃত নয়ন খানের ছেলে। তিনি পরিবার নিয়ে বগুড়া জেলা শহরের গরীব শাহ ক্লিনিকের চারতলা ভবনের ওপরতলায় বসবাস করতেন।

অস্ত্র উদ্ধারে কাদের খানের গ্রামের বাড়িতে পুকুরে ডুবুরিরা

 অস্ত্র উদ্ধারে সুন্দরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী সাবেক সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খানের গ্রামের বাড়িতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অভিযান চালাচ্ছেন।

গতকাল বুধবার দুপুর পৌনে ৩টার দিকে উপজেলার ছাপরহাটি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাপরহাটি খানপাড়া গ্রামে জেলা পুলিশের একটি দল ও ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট আবদুল কাদের খানের বাড়িতে এই অভিযান শুরু করেন। সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিয়ার রহমান বলেন, আবদুল কাদের খানকে গ্রেপ্তারের পর তার বাড়িতে অস্ত্র ও গুলী আছে এমন আশঙ্কায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অভিযান শুরু করে।

অভিযানে পুরো বাড়ি ঘিরে রেখে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। এছাড়া বাড়ির একটি পুকুরের অস্ত্র থাকতে পারে বলে পুকুরের পানি সেচ দিচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। সুন্দরগঞ্জের সাবেক এমপি আবদুল কাদের খানের সুন্দরগঞ্জের বাড়ির পুকুরে পুলিশের নির্দেশে অস্ত্রের খোঁজ করছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। এ হত্যা মামলায় গ্রেফতার তিনজনের দেয়া তথ্যে বুধবার দুপুর ১২টার দিকে কাদের খানের সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপরহাটি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাপরহাটি (খাঁনপাড়া) গ্রামের বাড়ির পুকুরে অভিযান শুরু হয়।

সুন্দরগঞ্জ থানার এসআই ইজার আলী তথ্যটি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, রংপুর ও গাইবান্ধার সাতজন ডুবুরি লিটন হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রের সন্ধানে কাদের খানের বাড়ির পুকুরে নেমে তল্লাশি করেছেন। এখন সেখানে পানি সেচের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ওই পুকুরে লিটন হত্যায় ব্যবহার হওয়া অস্ত্র ছাড়াও আরও অস্ত্র আছে বলে তাদের কাছে তথ্য আছে।

সুন্দরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আতিয়ার রহমান জানিয়েছেন, বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত কোনো অস্ত্র বা অন্য কোনো বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার না হলেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে । এছাড়া, আবদুল কাদের খানের বগুড়া শহরের রহমান নগরের বাসভবনেও দ্বিতীয় দফার মতো তল্লাশি শুরু হয়েছে। এসময় বাসা থেকে একটি মাইক্রোবাস, দুটি ল্যাপটপ, চারটি মোবাইল ফোন ও সিসিটিভির ডিভিআর জব্দ করা হয়।

এর আগে, গত মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে রাত সাড়ে ৪টা পর্যন্ত গাইবান্ধা পুলিশের সিনিয়র এএসপি (সি-সার্কেল) রেজিনুর রহমানের নেতৃত্বে ক্লিনিক কাম বাসভবনে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। ওইদিন বিকাল ৫টায় তাকে গ্রেফতারের পর পর এক ঘন্টা তল্লাশি করে পুলিশ কর্মকর্তারা কিছুই পাননি বলে জানিয়েছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ