রবিবার ২৮ নবেম্বর ২০২১
Online Edition

ক্রিকেট এবার বিগ থ্রি বলয়ের বাইরে

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সর্বশেষ সভায় যুগান্তকারী অনেক সিদ্বান্ত নেয়া হয়েছে। তাতে কিছুটা হলেও খর্ব হয়ে গেছে বিতর্কিত বিগ থ্রি’র অনেক প্রস্তাবনা। তিন মোড়লের বলয়ের বাইরে চলে এসেছে ক্রিকেট, এমনটাই মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। তিন বছরের কম সময় আগে ২০১৪ সালে পাস হয়েছিল ‘বিগ-থ্রি’ নীতি।
‘বিগ-থ্রি’ নীতিতে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আইসিসির সম্ভাব্য আয়ের ভাগ বণ্টনের একটা বর্ণনা দেয়া হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, আগামী ৮ বছরে আইসিসি’র আয়ের ২৭.৪ শতাংশই যাবে বিসিসিআই, ইসিবি ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কাছে। অস্ট্রেলিয়া পাবে ২.৭ ভাগ অর্থ, ইংল্যান্ডের ভাগে ৪.৪ ভাগ। আর ভারত একাই নিয়ে নেয়ার কথা ২০.৩ ভাগ! এত দিন এ নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে তত্ত্বটা ছিল, ৮ বছরে আইসিসি থেকে ভারত নিয়ে নেবে ৫৭১.৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার। সেটাই হয়ে যাচ্ছে ২৯০ মিলিয়ন! আইসিসি’র নতুন প্রস্তাবিত নীতিতে এক হাজার ২৭২ কোটি ৪০ লাখ টাকা হারাচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। সে জন্যই দুবাইয়ে সর্বশেষ সভায় বিসিসিআই চেষ্টা করেছে যে কোনো উপায়ে এই প্রস্তাব পাস হওয়া আটকাতে। জিম্বাবুয়ে ভোট প্রদান থেকে বিরত থাকায় ও শ্রীলঙ্কাকে নিজেদের পাশে পাওয়ায় ভোটাভুটিতে শেষ ফলাফল ছিল ৭-২। আর এতেই সাহস পাচ্ছে বিসিসিআই। কারণ, আইসিসি’র যে কোনো প্রস্তাব পাস হতে হলে কমপক্ষে তিন-চতুর্থাংশ ভোট পেতে হয়। এপ্রিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যখন নেয়া হবে তার আগেই আর্থিকভাবে দুর্বল বোর্ডগুলোকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করবে বিসিসিআই। জিম্বাবুয়ের মতো বোর্ডগুলোকে বিসিসিআই কোনো লোভনীয় প্রস্তাবও দিতে পারে ভোট টানার জন্য। ভারতীয় বোর্ডের এক কর্মকর্তা তো বলেই দিয়েছেন, ‘৮-২ ভোটের প্রাধান্য দরকার ওদের। আর চার সদস্য যদি প্রস্তাবের বিপক্ষে থাকে তাহলে এটা কখনো পাস হবে না। আমরাই জিতবো।’
নতুন প্রস্তাবে বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট আগের তুলনায় অনেক বেশি আয় করবে। আগের প্রস্তাবে বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল মাত্র ৫৪৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। সেটা এবার বেড়ে হতে যাচ্ছে তিনগুণ। তবুও বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিজেদের পক্ষে টানার আশা ছাড়েনি বিসিসিআই, ‘বাংলাদেশ কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাড়তি একটা ম্যাচ মানেই আর্থিকভাবে ওদের জন্য অনেক বড়। ওদের সঙ্গে ভারত শুধু চার বছরে একবার খেললেই হবে এবং তাদের জন্য আয়ের অনেক বড় উৎস।
আইসিসি বোর্ড মিটিংয়ের মূল বিষয় ছিল অর্থকেন্দ্রিক। এ সভায় আইসিসি’র লাভ, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে লাভের সমবন্টন- এসব নিয়ে আলোচনা হয়। এ আলোচনায় ২০১৪ সালে ভারত ক্রিকেট বোর্ড কর্তৃক পরিকল্পিত ‘তিন মোড়ল’ প্রথার অবসানের প্রস্তাব এসেছে। অবশ্য সদ্য শেষ হওয়া ২ দিনের সভায় শুধু বিভিন্ন বিষয়ের পরিমার্জন প্রস্তাব এসেছে। কোনো প্রস্তাবেরই সিদ্ধান্ত আসেনি। তাই অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে এ বছর এপ্রিলে আইসিসি’র পরবর্তী সভা পর্যন্ত। চলতি আলোচনা সভার দ্বিতীয় দিনে উল্লেখযোগ্য ছিল আইসিসি’র আর্থিক লাভের সমবণ্টন নীতি।
২০১৪-১৫ মৌসুমে ‘তিন মোড়ল’ নীতি প্রবর্তন করে আইসিসি থেকে মোটা অঙ্কের লালে নিজেদের পকেট ভরার পরিকল্পনা ছিল ভারত ক্রিকেট বোর্ডের। ২০১৫ থেকে ২০২৩ এফটিপি’র মধ্যে সব ধরনের আয়ের বেশির ভাগ অর্থ যাওয়ার কথা ছিল ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের। এর মধ্যে ভারতের পকেটেই সবচেয়ে বেশি ৪৫০ মিলিয়ন ডলার যাওয়ার কথা ছিল। এতদিন সংবাদ মাধ্যমে আসছিল আসন্ন ৮ বছরে (২০১৫ থেকে ২০২৩) ৫৭১.২৫ মিলিয়ন ডলার আয় করবে ভারত। কিন্তু ভারত গঠিত ‘বিগ থ্রি’ প্রথা ভেঙে দেয়ার প্রস্তাব করে নতুন লাভ বণ্টনের পদক্ষেপ নিয়েছে চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর পরিচালিত আইসিসি’র বোর্ড কমিটি। নতুন প্রস্তাবে ভারতের আয় ধরা হয়েছে ২৯০ মিলিয়ন ডলার। এতে নিজেদের পরিকল্পিত আয়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৪ শতাংশ কম আয় করবে ভারত। আর এ কারণেই আইসিসির নতুন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়নি ভারত।
টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশসহ বাকি সাতটি দেশ আইসিসি’র নতুন লাভ বণ্টন প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী কোনো প্রস্তাবের পক্ষে আটটি দেশের ভোট থাকলে তা পাস হবে। একটি দেশের ভোট না পাওয়ায় আপাতত প্রস্তাবটি পাস হয়নি। এছাড়া খেলা-সংক্রান্ত পরিমার্জন প্রস্তাবে নতুন উঠে এসেছে ওয়ানডে ক্রিকেটেও সুপার ওভার এবং টোয়েন্টি-২০’তে ডিআরএস চালুর প্রস্তাব। উঠে আসা দ্বি-স্তর টেস্ট লিগ, ১৩ দলের ৩ বছরের ওয়ানডে লিগ নিয়ে কোনো আলোচনা না হলেও নতুন দুইটি বিষয় সবুজ সংকেত পেয়েছে। তাই আসন্ন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা মহিলা বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল ও ফাইনালে কোনো ম্যাচ টাই হলে তা নিষ্পত্তির জন্য সুপার ওভারের লড়াই হবে।
এছাড়া টোয়েন্টি-২০’তে ডিআরএস ব্যবহারের বিষয়েও সায় দিয়েছে আইসিসি প্রধান নির্বাহীদের কমিটি। তবে টোয়েন্টি-২০ তে মাত্র একবার আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে কোনো দল। এই তত্ব কিছুটা হলেও নতুনত্ব আনবে ক্রিকেটে।
যা থাকছে নতুন প্রস্তাবে
- টেস্ট ক্রিকেটকে দুই স্তরে ভাগ করার প্রস্তাব উঠেছে আইসিসি’র নির্বাহী কমিটির সভায়। র‌্যাঙ্কিংয়ের সেরা ৯ দলকে প্রথম স্তরে ও দশম দলসহ আর দু’টি সহযোগী সদস্যকে শর্ত সাপেক্ষে টেস্ট খেলার সুযোগ দিয়ে এই দু’টো স্তর ভাগ করা হবে। সে ক্ষেত্রে এখন ৯ নম্বরে থাকা বাংলাদেশ থাকবে টেস্টের প্রথম স্তরে। দ্বিতীয় স্তরে দশম স্থানে থাকা জিম্বাবুয়ের সঙ্গে টেস্ট মর্যাদার জন্য বিবেচিত হতে পারে আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড।
- ১৩ দল নিয়ে একটি ওয়ানডে লিগের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তিন বছর মেয়াদি এই ওয়ানডে লিগের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা। এই ১৩ দলের লিগে টেস্ট খেলুড়ে বর্তমান ১০ দলের সঙ্গে থাকবে আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড। এছাড়া আইসিসি’র সহযোগী সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে প্রতিযোগিতা ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগের চ্যাম্পিয়ন দলও ১৩ নম্বর দল হিসেবে এই লিগে থাকবে।
- আঞ্চলিক টোয়েন্টি-২০ প্রতিযোগিতার প্রস্তাবও দেয়া হয়েছে। এই আঞ্চলিক টোয়েন্টি-২০ প্রতিযোগিতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে টোয়েন্টি-২০ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা।
- বৈঠকে ২০১৭ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফির প্লেয়িং কন্ডিশন অনুমোদিত হয়েছে। এই প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচটা টাই হলে ‘সুপার ওভারে’র ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। একই ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে আইসিসি নারী বিশ্বকাপেও।
- ডিআরএস’র নিয়মিত ব্যবহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে নির্বাহী কমিটির সভায়। এ ব্যাপারে এর প্রয়োগের বিষয়ে একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা আগামী জুন মাসে অনুমোদিত হবে। আন্তর্জাতিক টোয়েন্টি-২০ গুলোতেও ডিআরএস নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত হবে। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি দল ব্যাটিংয়ের সময় একটি করে রিভিউ নেয়ার অধিকার পাবে।
- আফগানিস্তানের দীর্ঘ পরিসরের ঘরোয়া প্রতিযোগিতা আহমেদ শাহ আবদালি আঞ্চলিক টুর্নামেন্টকে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঘরোয়া টোয়েন্টি-২০ প্রতিযোগিতাকে দেয়া হচ্ছে লিস্ট ‘এ’ মর্যাদা। এর ফলে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার দিকে এক ধাপ এগিয়ে গেল আফগানিস্তান।
- নির্বাহী কমিটির সভায় বাজে উইকেট ও দর্শক আচরণের জন্য ডিমেরিট পয়েন্টেরও প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি ডিমেরিট পয়েন্ট থাকবে পাঁচ বছরের জন্য। কোনো মাঠ পাঁচটি ডিমেরিট পয়েন্ট পেলে সেই মাঠ আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের অধিকার হারাবে এক বছরের জন্য।
- আইসিসি’র দুর্নীতিবিরোধী আইন সংশোধন করে মোবাইল ফোনের তথ্য বের করার অধিকারও পেতে যাচ্ছে আকসু।
- এছাড়াও অর্থনৈতিক বণ্টননীতির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আইসিসি’র সংবিধানে কিছু সংশোধনী এনে তা পাসও করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তগুলোর মধ্য দিয়েই কার্যত শেষ হচ্ছে আইসিসিতে ‘তিন মোড়লে’র রাজত্ব।
বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ
ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের আয়ে লাগাম টেনে ধরলেও লাভবান হয়েছে বাংলাদেশ, ওয়েষ্ট ইন্ডিজ আর জিম্বাবুয়ের মতো দলগুলো। আইসিসি’র নতুন প্রস্তাবিত নীতিতে এক হাজার ২৭২ কোটি ৪০ লাখ টাকা হারাচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। তবে খুশির খবর আছে নীচু স্তরের দলগুলোর জন্য। নতুন প্রস্তাবে আগের তুলনায় অনেক বেশি আয় করবে বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট। আগের প্রস্তাবে বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল মাত্র ৫৪৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট পেত আরও কম, ৫২৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কান বোর্ডের পাওয়ার কথা ছিল ৬৪৬ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে পাস হয়েছিল ‘তিন মোড়ল’ নীতি। ‘বিগ-থ্রি’ নীতিতে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আইসিসির সম্ভাব্য আয়ের ভাগ বণ্টনের একটা বর্ণনা দেয়া হয়েছিল।
তাতে বলা হয়েছিল, আগামী ৮ বছরে আইসিসি’র আয়ের ২৭.৪ শতাংশই যাবে বিসিসিআই, ইসিবি ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কাছে। ভাগ বাটোয়ারাটাও ছিল অদ্ভুত। অস্ট্রেলিয়া পাবে ২.৭ ভাগ অর্থ, যুক্তরাজ্যের ভাগে ৪.৪ ভাগ। আর ভারত একাই নিয়ে নেয়ার কথা ২০.৩ ভাগ! এত দিন এ নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে তত্ত্বটা ছিল, ৮ বছরে আইসিসি থেকে ভারত নিয়ে নেবে ৫৭১.৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার (বাংলাদেশী মূল্যমানে সেটা চার হাজার ৫৪৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা)! তবে এদিন জানা গেছে, ৫৭১.৫ মিলিয়ন নয়; অঙ্কটা আসলে ৪৫০ মিলিয়ন ইউএস ডলার (তিন হাজার ৫৭৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা)।
এই পরিমাণ টাকা নিশ্চিত পাওয়ার কথা ছিল বিসিসিআইয়ের। কিন্তু নতুন যে অর্থনৈতিক মডেল পাস হতে যাচ্ছে, সেখানে বিসিসিআইয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে মাত্র ২৯০ মিলিয়ন ডলার বা দুই হাজার ৩০৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক ঝটকায় বিসিসিআইয়ের ভাগের অঙ্কটা কমে গেল ১ হাজার ২৭২ কোটি ৪০ লাখ টাকা!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ