বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ভালোবাসা হোক নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ

মোঃ আমান উল্লাহ : ইদানীং ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করছে একশ্রেণীর মানুষ পাশ্চাত্যের অনুসরণে। দিবসটির উৎপত্তি বা ইতিহাস যাই থাকুক না কেন ভালোবাসা বিষয়টি যথেষ্ট সংবেদনশীল, ক্ষেত্র বিশেষে আপেক্ষিক এবং মানব জীবনের সাথে অতি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত একটি বিষয়। এমনকি মানব জাতি ছাড়াও এই পৃথিবীর নির্বাক সৃষ্টিকুলের মাঝেও এর অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। অতএব এটি একটি বৈশ্বিক, বিশালতর ও ব্যাপক বিষয়। সুতরাং ভালোবাসাকে একটি দিনের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখার বিষয়টি এর চিরন্তন বৈশিষ্ট্যের সাথে সাংঘর্ষিক ও বৈপরিত্যপূর্ণ এবং এর মাহাত্ম্য ও তাৎপর্যের সাথে বেমানান ও অসঙ্গতিপূর্ণ। তাই একান্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই ভালোবাসার স্বরূপ বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা এখানে অল্প-বিস্তর আলোচনার প্রয়াস পাব।
ভালোবাসা হবে একান্তই অকৃত্রিম বা আন্তরিক। কৃত্রিম ভালোবাসা দিয়ে অর্থাৎ ভালোবাসার অভিনয় করে কোন চাহিদা পূরণ, কোন স্বার্থ আদায় কিংবা কোন প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে প্রায় সময়েই দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকে। বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা সাময়িক আবেগের বশবর্তী হয়ে ভালোবাসার খেলায় মেতে উঠে যা কোনক্রমেই আন্তরিক নয়। এসব কর্মকাণ্ড প্রকৃতপক্ষে ভালোবাসা নয়, বরং ভালোবাসার বিপরীতার্থক। কোন ভালোবাসা যদি আন্তরিক না হয় তাহলে তার পিছনে কোন না কোন অসৎ-উদ্দেশ্য বর্তমান থাকবে- একথা নির্র্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়। কাজেই আন্তরিকতাই ভালোবাসার প্রধান উপাদান হওয়া উচিত।
আন্তরিকতার সাথে আরেকটি বিষয় আমরা যুক্ত করতে পারি। তা হলো দায়িত্ববোধ বা দায়িত্বশীলতা। ভালোবাসার সাথে যদি দায়িত্ববোধ বর্তমান থাকে তাহলে সেই ভালোবাসাই হবে শক্তিশালী ও স্থায়িত্বপূর্ণ। হোক তা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা, পিতা-পুত্রের মধ্যকার ভালোবাসা কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক ভালোবাসা। ভালোবাসার মধ্যে দায়িত্ববোধ নামক উপাদানটি বর্তমান থাকলে নিজে ঠকার যেমন কোন সম্ভাবনা নেই, পক্ষান্তরে অপরকে ঠকানোর ক্ষেত্রেও তা প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে।
আরেকটি বিষয় সব সময়ের জন্যই মনে রাখা প্রয়োজন তা হলো শৃংখলা। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই শৃংখলা জরুরী। এর অভাবে জীবন ব্যর্থতায় ভরে উঠে। তেমনি ভালোবাসার ক্ষেত্রেও শৃংখলাপূর্ণ ভালোবাসা হওয়া জরুরী। উচ্ছৃংখলা ভালোবাসাকে বিশৃংখল করে তোলে। শৃংখলা মোতাবেক না চললে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, এমনকি পঙ্গু হয়ে যাবার সম্ভাবনাও থাকে। আমি আক্ষরিক অর্থে পঙ্গু হয়ে যাবার কথা বলছি না, বরং আমি যা বলছি তা হলো জীবন যাপনের পঙ্গুত্ব।
কোন ভালোবাসা শৃংখলাপূর্ণ হবে তখনই যখন তা হবে সুনিয়ন্ত্রিত। নিয়ন্ত্রিত ভালোবাসা মানে চার দেয়ালের মধ্যে দিন কাটানো নয়। বরং নিয়ন্ত্রিত ভালোবাসা হলো যেখানে উচ্ছৃংখলা থাকবে না, যে ভালোবাসা বল্গাহীন হবে না এবং যে ভালোবাসায় বেলেল্লাপনা থাকবে না। এইরূপ ভালোবাসাই হলো গঠনমূলক এবং ধর্ম, দেশ ও সমাজের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ভালোবাসা যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারণ করে তা সংরক্ষণ করতে পারলেই তা হবে নিয়ন্ত্রিত ভালোবাসা, অন্যথায় নয়।
প্রকৃত ভালোবাসা সব সময় এবং সবার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে। তবে গ্রহণযোগ্যতার পূর্ব শর্ত হলো- তা হতে হবে নৈতিক, আইনসিদ্ধ এবং সমাজের জন্য উপকারী। যে ভালোবাসা সমাজে আদর্শিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা প্রাপ্ত হয় বুঝতে হবে যে তাতে বড় কোন ত্রুটি বিদ্যমান নেই, অতএব বড় কোন ক্ষতির আশংকাও নেই। কাজেই ভালোবাসার আগে-পরে এর গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখতে হবে।
ভালোবাসা হবে সার্বজনীন তথা সবার জন্য। সবার জন্য শিক্ষা, সবার জন্য স্বাস্থ্য- এই কথাগুলো যেমন আমরা ব্যবহার করি তেমনি আমরা বলতে পারি- সবার জন্য ভালোবাসা। এই ভালোবাসাকে বিবাহপূর্ব একটি বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ করে যারা ভালোবাসার ফেরি করে বেড়ায় তারা প্রকৃতপক্ষে দেশ ও ধর্মের কলংক। এদের দ্বারা সমাজের কল্যাণার্থে কিছু হবে একথা কোনক্রমেই বিশ্বাস করা যায় না। অতএব ভালোবাসা হবে স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, মা-মেয়ে, নেতা-কর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ক্রেতা-বিক্রেতা সর্ব পর্যায়ের মানুষের মধ্যকার ভালোবাসা। তবে একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, এই পৃথিবীতে মায়ের ভালোবাসার চেয়ে নিখাদ কোন ভালোবাসা নেই, হতেও পারে না। উপরন্তু আমাদের সমাজে গরীবÑধনী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, উচ্চ বংশ-নিম্ন বংশ, কর্মকর্তা-কর্মচারী ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভালোবাসার প্রভেদ হয়ে থাকে। ভালোবাসার এরূপ রকম-ফের কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। উল্লিখিত অর্থেই ভালোবাসা সার্বজনীন হয়ে উঠতে পারে এবং তা কোন অসম্ভব ব্যাপার নয়।
লেখার শুরুতেই আমরা উল্লেখ করেছি যে, “ভালোবাসা দিবস” উদযাপনের নাম করে ভালোবাসাকে একটি দিনের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা এর বৈশিষ্ট্যের সাথে একেবারেই বেমানান। অধিকন্তু প্রতিটি দিনই যদি হয় আমাদের জন্য ভালোবাসার দিন তাহলে সেটিই হবে যথার্থ মানবতা। এমন অবস্থায় এই পৃথিবীতেই স্বর্গসুখ নেমে আসতে পারে। এমনটি যদি কারো প্রত্যাশিত না হয় তাহলে সাফ কথা হলো- তেমন ব্যক্তি পৃথিবীতে বসবাসের উপযুক্ত বিবেচিত হতে পারেন না।
কাজেই আমরা অনুধাবন করতে পারলাম যে, ভালোবাসা একটি ব্যাপকতর বিষয়। এটা যেমন কোন ঠুনকো বিষয় নয়, তেমনি ঠুনকো কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে ভালোবাসা কর্পুরের ন্যায় উবে যেতেও পারে না। অর্থাৎ ভালোবাসা হতে হবে পরিপূর্ণ ভালোবাসা, যেখানে থাকবে না কোন বিভক্তি তথা খ-িত রূপ। পরিপূর্ণ ও ব্যাপকতর ভালোবাসাই কেবল মানব জীবনের পূর্ণতা বিধানে অবদান রাখতে পারে।
এত কিছুর মাঝে একটি কথা মনে রাখতেই হবে যে, আমরা যদি সুপাত্রে ভালোবাসা প্রদান না করতে পারি তাহলে অনেক সময় তার ফল বিষময় হয়ে উঠে। ভালোবাসার নাম করে বিবাহপূর্ব যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে পরে পস্তানো তেমনই অপ্রত্যাশিত দৃষ্টান্ত। তাই ভালোবাসার পাত্র সম্পর্কে অবশ্যই সতর্ক নজর রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্যানুসন্ধান করতে হবে। কেননা, ভালোবাসার পাত্র যথাযথ হলে তা সোনায় সোহাগা রূপ লাভ করে থাকে।
ভালোবাসার রূপ আলোচনা করতে গিয়ে এ পর্যায়ে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। এই উপাদানটির অভাবে ভালোবাসার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে পড়বে। এতদ্ব্যতীত যে কোন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির উদ্ভবও হতে পারে। সেই গুরুত্বপূর্ণ বিয়টি হচ্ছে নৈতিকতা। নৈতিকতাবিহীন বিশ্ব পাপাচার, ব্যাভিচার ও স্বৈরাচারে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে যা আমাদের কারোর কাম্য নয়।
পরিশেষে বলব, আমরা যদি আমাদের অগাধ ও অকৃত্রিম ভালোবাসাকে অর্থবহ করে তুলতে চাই তাহলে আমাদেরকে উল্লিখিত উপায়-উপকরণসমৃদ্ধ ভালোবাসার অধিকারী হতে হবে। তেমনটি সম্ভব হলে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ তথা গোটা বিশ্ব হয়ে উঠবে প্রশান্তির আধার। এরূপ প্রত্যাশার বাস্তবায়ন ঘটাতে এই নিবন্ধের কেন্দ্রীয় কথা এবং আমাদের একান্ত কামনা: ভালোবাসা হোক নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ