বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রেমিট্যান্স প্রবাহে পতন

সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় অর্থনীতির সব খাতেই উন্নয়ন-অগ্রগতির সুখবর শোনানো হয়। অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব অবস্থা যে তেমন নয় সে সম্পর্কিত তথ্যও আবার প্রকাশিত হয়ে পড়ে। বিস্মিত হতে হয় তখন, যখন কর্তা ব্যক্তিদেরই কারো কারো মুখ থেকে বিপরীত তথ্য জানতে হয়। এ রকম সর্বশেষ একটি তথ্যই জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ফজলে কবির। দৈনিক সংগ্রামের অনলাইন সংস্করণের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যা- ইন্ডাস্ট্রিজের ভোজসভায় তিনি বলেছেন, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের তথা রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে গেছে। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। গবর্নর জানিয়েছেন, রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়ানোর উপায় খুঁজে বের করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুটি গবেষক দল শিগগিরই মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সফরে যাবে। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে উন্নতি ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন গবর্নর ফজলে কবির। 
বলার অপেক্ষা রাখে না, মাত্র এক অর্থবছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রায় ১৭ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য নিঃসন্দেহে আশংকাজনক। এটুকুই অবশ্য আমাদের উদ্বেগের কারণ নয়। আসল কারণ হলো, রেমিট্যান্সের পরিমাণ কমছে ধারাবাহিকভাবে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবেই গত বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে রেমিট্যান্স কমেছিল ৭০ কোটি ১৫ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের একই সময়ে যেখানে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৯৩ কোটি ৩৬ লাখ ডলার সেখানে গত বছর এসেছে ৩২৩ কোটি ২১ লাখ ডলার। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ বা পাঁচ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা। মাসওয়ারি হিসাবে শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমেছিল ২৩ শতাংশ।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রথম পতন ঘটেছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। সেবার রেমিট্যান্সের পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৩ কোটি ২৮ লাখ ডলার কমে এক হাজার ৪২২ কোটি ৮৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছিল। এর পরের বছরে রেমিট্যান্স কিছুটা বাড়লেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আবারও প্রবাহে পতন ঘটে এবং এক হাজার ৫৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার থেকে কমে এক হাজার ৪৯৩ কোটি ১১ লাখ ডলারে নেমে আসে। প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্টে জানা গিয়েছিল, আগস্ট মাসেও ৬৭ কোটি ১৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরেই পরিমাণ ১০ কোটি কমে দাঁড়ায় ৫৭ কোটি ১৬ লাখ ডলারে। সংবাদপত্রের রিপের্টে সৌদি আরবের কথা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে চিহ্নিত সৌদি আরব থেকে মাত্র এক মাসের ব্যবধানেই রেমিট্যান্স কমেছিল পাঁচ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। একই ধারার পতন দেখা গেছে আরব আমিরাতসহ অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও।
রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং তেলের দাম ও টাকার বিপরীতে বিদেশী বিভিন্ন মুদ্রার মান কমে যাওয়ার মতো কিছু কারণের উল্লেখ করা হয়েছিল। অন্যদিকে দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা কিন্তু সব কারণকে দায়ী বলে মানতে রাজি হননি। তারা বরং বলেছেন, সরকারের একদেশকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে ইসলামী ও দেশপ্রেমিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের কারণে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছে। সে কারণে ওই দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া হয় বন্ধ করেছে নয়তো অনেক কমিয়ে দিয়েছে।
উদাহরণ দিলে দেখা যাবে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৩৫ শতাংশই এসেছে সৌদি আরব থেকে। সবচেয়ে বড় সে চাকরির বাজারেই একদিকে বাংলাদেশীদের জন্য দরোজা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, অন্যদিকে কমে এসেছে শ্রমিকদের সংখ্যা। অনেক টানাপোড়েন ও দরকষাকষির পর সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মীদের নেয়ার ব্যাপারে সম্মত হলেও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অসততার কারণে নতুন পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে সংকটের। জি-টু-জি তথা সরকারি পর্যায়ে শ্রমিক পাঠানোর জটিল আয়োজন করতে গিয়ে মালয়েশিয়ার বাজার নষ্ট করেছে সরকার নিজেই। ওদিকে আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলো সরকারের রাজনৈতিক কর্মকা-ের কারণে শ্রমিক নেয়া হয় বন্ধ করেছে নয়তো অনেক কমিয়ে দিয়েছে। এভাবে সব মিলিয়েই বিদেশে বাংলাদেশীদের জন্য চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে এসেছে।
বলা দরকার, রেমিট্যান্সের এই পতন অত্যন্ত ভীতিকর। কারণ, রফতানি আয়ের প্রধান খাত গার্মেন্ট কয়েক বছর ধরেই সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। এমন অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় প্রধান খাত রেমিট্যান্সেও যখন ধস নামার খবর শুনতে হয় তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। কারণ, বিপুল পরিমাণ আমদানি ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান আসে রফতানি আয় থেকে, এতদিন পর্যন্ত যার দ্বিতীয় প্রধান খাত ছিল রেমিট্যান্স। সে রেমিট্যান্সেই পতন শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, দেশের অর্থনীতি আসলে বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে পড়েছে।
অমরা মনে করি, এমন অবস্থায় কেবলই কল্পিত সাফল্যের কথা শোনানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত আর্থিক খাতে সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেয়া, বিশেষ করে জনশক্তি রফতানি এবং রেমিট্যান্স বাড়ানোর ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠা। এজন্য সবচেয়ে বেশি দরকার সৌদি আরবসহ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। এ উদ্দেশ্যে সরকারকে ইসলামী ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নিপীড়নমূলক কর্মকা- বন্ধ করতে হবে। প্রবাসীদের স্বজনরা যাতে সহজে ও ঝামেলামুক্তভাবে তাদের নামে পাঠানো টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করতে পারে, সে ব্যাপারেও সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, ব্যাংকে গিয়ে ভোগান্তির কবলে পড়তে হয় বলেই প্রবাসীরা হুন্ডিসহ নানা অবৈধ পন্থায় টাকা পাঠিয়ে থাকেন। এটাও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ