বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গোড়াতেই গলদ

নির্বাচন কমিশন গঠন ইংরেজি হলো Election Commission Formation. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং কয়েকজন নির্বাচন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। প্রণীত আইনের বিধানাবলী সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারগণকে নিয়োগ দান করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে প্রধান বিচারপতি শপথ বাক্য পাঠ করান। প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ করতে চাইলে রাষ্ট্রপতির নিকট পদত্যাগ পত্র পেশ করবেন। নির্বাচন কমিশনারদের পদমর্যাদা সুপ্রীম কোর্টের বিচারকদের পদমর্যাদার সমতুল্য। সংবিধানের ১১৯(১) ও ১১৯(২) নং অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে। অদ্যাবধি উক্ত আইনটি প্রণয়ন না হওয়ায় এবং বিধানাবলী গৃহীত হয়নি বিধায় বর্তমানে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলে অবিশ্বাস ও দূরত্ব বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশের নবম প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম.এ আজিজ ২৩ মে ২০০৫ তারিখে দার্য়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন আওয়ামী লীগ তাঁকে মেনে নেয়নি। বরং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়ে জেলা-উপজেলাসহ সারাদেশে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলে; অবরোধ করে রাখে রাস্তা, যানবাহন হয়ে যায় বন্ধ। আমি ও আমার একজন বন্ধু সোনালী ব্যাংকের উপজেলা শাখার ম্যানেজার (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) রিক্সায় চড়ে জেলা শহর থেকে উপজেলা শহরে প্রায় ২৫/৩০ কি. মি. রাস্তা বেয়ে অফিস করতাম। তখন রাস্তায় রাস্তায় মিছিল আর শ্লোগানে শুনতাম আইজ্যারে আইজ্যা; লাগাইচছ কাইজ্যা (ঝগড়া) ইত্যাদি ইত্যাদি। একজন বিজ্ঞ বিচারককে অপমান করে গালাগাল দিয়ে যারা অভ্যস্ত আজকাল তাদের মুখে শুনি সার্চ কমিটি কর্তৃক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কর্তৃক প্রদত্ত নামগুলো ঘোষণা করলে যারা বাদ পড়বেন তারা মনে কষ্ট নেবেন এবং ভদ্রলোকদের সাথে বেয়াদবী করা হবে। সুতরাং রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেয়া সকল নাম ঘোষণা করা ঠিক হবে না। ঘটনাটি মনে পড়ে গেল এক ব্যক্তি শেখ সাদী (রহঃ) কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, আপনি এত আদব শিখলেন কোত্থেকে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন যে বেআদবের কাছ থেকে। কারণ সে যখন বেআদবী করে, আমার কাছে তা ভাল লাগে না; তাই আমি তা করিনা। এভাবেই আমি আদব শিখেছি।
মরহুম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পথ অনুসরণ করে সার্চ কমিটি গঠন করেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এবং সার্চ কমিটি গঠনের পূর্বে তিনি ৩১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করেন। পরবর্তীতে সার্চ কমিটি নিজেদের মধ্যে এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতির কাছে ১০টি নাম প্রস্তাব করেন- যা থেকে বাছাই করে এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করে রাষ্ট্রপ্রতি আব্দুল হামিদ একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়েছেন। তারা হলেন (১) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সাবেক সচিব কে.এম. নূরুল হুদা, (২) সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদার (৩) সাবেক সচিব রফিকুল ইসলাম (৪) রাজশাহীর সাবেক জেলা ও দায়রা জজ কবিতা খানম এবং (৫) সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদৎ হোসেন চৌধুরী। আমার একজন বন্ধু দাখিল মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। তার সাথে দেখা হলে জিজ্ঞেস করলাম হুজুর বর্তমানে তো নির্বাচন কমিশন নিয়ে আলোচনাই Talk of the Country এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি? তিনি বললেন, ‘ভাই এটাতো আলোচনা নয় বরং আলু ছানা/ভর্তা। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ নেত্রী যা করবেন তাই হবে। রাতে যখন ‘সময় টিভিতে’ তুষার আব্দুল্লাহর সঞ্চালনায় সময় সংলাপ শুনছিলাম; যেখানে অতিথি ছিলেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তিনি বললেন, ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে আঞ্চলিক শব্দ বিকৃতি নিয়ে কিছু বলতে গেলেই মনে পড়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিশেষ করে নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ এলাকার ভাষার কথা। তারা বাংলা বর্ণমালার স্বরবর্ণের -ো কে ‍ু অর্থাৎ চোর-কে ‘চুর’ বলে এবং আলোকে আলু (Potato) বলে উচ্চারণ করে। বাংলা বর্ণমালার ব্যাঞ্জনবর্ণের বর্গীয় অক্ষরগুলোর প্রথমটি উচ্চারণ করতে দ্বিতীয়টি উচ্চারণ করে; যেমন-‘কানা’ শব্দকে খানা এবং ‘চানা’ শব্দকে ছানা বলে উচ্চারণ করে। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ দু’জনই কিশোরগঞ্জের লোক। ভাষা ও শব্দ উচ্চারণে এলাকার প্রভাব তাঁদের উপরও পড়েছে বলেই উক্ত আলোচনা-আলু ছানায় পরিণত হয়েছে। আমার বন্ধুর কথাটি সত্যিই মনে হয়েছে। পূর্বের রকিব কমিশন প্রমাণ করেছে তাঁরা মেরুদন্ডহীন এবং হুকুম বরদার কমিশন ছিলেন। বর্তমান কমিশন কেমন হবে তাঁরা তাদের কর্মকান্ড দ্বারাই প্রমাণ করবে।
এবারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণির বাংলা পাঠ্য বইয়ের কুসুম কুমারী দাস-এর লিখা ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটিতে কবির মূল ছন্দে ওলট-পালট করাতে তা খুবই সমালোচিত হয়েছে। এটা কি এজন্যেই হয়েছে যে, আমাদের দেশে এমন ছেলে হবেই না? কবিতাটি হলো-‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে/মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন/মানুষ হইতে হবে এই যার পণ’। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার গোড়াতেই গলদ রয়েছে। বিদায়ী সিইসি কাজী রকিবউদ্দিন আহমদ কিছুদিন পূর্বে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (ই.টি.আই) প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের মান নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে ইসি সচিব মোঃ সিরাজুল ইসলামকে একটি নোটে তিনি এ অসন্তোষটির কথা জানান। প্রশিক্ষণের নামে লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। বাড়ছেনা কর্মকর্তাদের সক্ষমতা অর্থাৎ বাড়ছে ব্যয় কমছে মান। এগুলো বর্তমান সিইসি দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে মোকাবেলা করতে হবে।  ‘মানুষের, জাতির, দেশের যখন চরম অবনতি হয় তখনই এরূপ নরপিশাচ জালিমের আবির্ভাব অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে।’ স্বৈরাচার সম্পর্কে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের (১৯১৯) পর কাজী নজরুল ইসলাম।
মনীষী হেগেল বলেছেন, ‘যে জনগণ যখন যেমন নেতৃত্বের যোগ্য হয় সেই জনগণ তখন ঠিক সেই রকম নেতৃত্বেরই অধিকারী হয়।’
-আবু মনির

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ