বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

নির্বাচন কমিশন নিয়ে অপ্রাপ্তি ও অস্বস্তি থেকেই গেছে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : রকিব উদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচন কমিশন কেমন ছিল? এমন প্রশ্ন নিয়ে প্রায়শঃই বিভিন্ন টক শো’তে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার প্রধান এবং বিভিন্ন বিদেশি সাহায্যপুষ্ট বেসরকারি সংস্থার প্রধানগণ নানাভাবে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বিদায় বেলায় সবার সেই প্রশ্নের উত্তর সিইসি রকিব উদ্দীন নিজেই দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি চেষ্টা করেছেন নিরপেক্ষ থাকার। তবে তিনি কি কি প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছেন, কি চেষ্টা করেছেন, সেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা দেননি। সিইসি ব্যাখ্যা না দিলেও তার কথায় প্রমাণিত হয়েছে, তিনি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারেননি। তার মত ব্যর্থ নির্বাচন কমিশনার অতীতে কেউ ছিলেন না। তার অধীনেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা একটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচনেই তিনি চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। সরকারি দল জোর করে কেন্দ্র দখলে নেয়। সেখানে নির্বাচন কমিশন ছিলেন দর্শক হিসেবে। অনেকেই বলছেন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ইচ্ছা পূরণেই তিনি কাজ করেছেন। বহুল সমালোচিত রকিব কমিশনের পর প্রত্যাশিত সময়ের আগেই একটি নতুন নির্বাচন কমিশন পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশন গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া কার্যত শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপের মধ্য দিয়ে। এর ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছেন এবং অনুসন্ধান কমিটির প্রস্তাব করা ১০টি নাম থেকে রাষ্ট্রপতি পাঁচজনকে নিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। তবে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু অপ্রাপ্তি ও অস্বস্তি থেকেই গেছে। এটা প্রত্যাশিত ছিল যে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর আগে অনুসন্ধান কমিটি তাদের চূড়ান্ত করা নামগুলো প্রকাশ করবে। নামগুলো প্রকাশ পেলে জনমনে তাদের সম্পর্কে কী ধারণা তার একটা প্রতিফলন পাওয়া যেত। এমনকি রাষ্ট্রপতির কাছে নাম দেওয়ার পর তা প্রকাশ এবং দু’-একদিন সময় দিয়ে কমিশন গঠন করা হলেও স্বচ্ছতার বিষয়টি নিশ্চিত করা যেত। তা না করে হাতে সময় থাকার পরও অনেকটা তড়িঘড়ি করেই কমিশন ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে বিরোধী পক্ষের কাছে এই নির্বাচন কমিশন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বিশেষ করে নতুন সিইসি একজন বিতর্কিত আমলা। তিনি বিএনপি সরকারের আমলে জনতার মঞ্চের সদস্য ছিলেন। যার কারণে তিনি চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পুরস্কার হিসেবে সচিব পদমর্যাদায় চাকরি করেন। এছাড়া এবারো তিনি সরকারের লাভজনক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। এছাড়া অন্যরাও কোন না কোনভাবে সরকারি দলের সমর্থক বলে গুঞ্জন রয়েছে। ফলে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট বলেছে, ঘোষিত নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। এদের অধীনে কখনোই নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।
এদিকে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটভুক্ত দলগুলোর উচ্ছ্বসিত ভূমিকায় রাজনৈতিক মহলে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটেছে। অনেকেই বলছেন, ইসি গঠনের পর ক্ষমতাসীনরা যেন আনন্দে আত্মহারা। তাদের দলের নেতারা নতুন ইসিদের নাম ঘোষণার পরপরই অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে। নতুন নির্বাচন কমিশনের সবাই নিরপেক্ষ ও দক্ষ। একই সাথে তারা বলেছে, এদের অধীনেই বিএনপি নির্বাচনে যাবে। দলটির নেতা মনে করেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে যে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে তাতে তারা অনেকটা নির্বিঘ্নেই দিনাতিপাত করতে পারবেন। তাদের আশা অনুযায়ী একটা নির্বাচন কমিশন গঠন করা গেছে। এটা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অর্জন বলেই তারা মনে করছেন। নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়ে খুশি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটও। পাঁচজনের কমিশনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ (সিইসি) চারজনই এসেছেন জোটের ছোট কয়েকটি শরিক দলের তালিকা থেকে। ফলে এসব দলও উচ্ছ্বসিত। জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও নতুন কমিশনের ওপর আস্থার কথা জানিয়েছে।
এদিকে শুধু বিএনপি বা ২০ দলীয় জোট নয়, নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করেন, যাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তাদের অনেকের বিরুদ্ধে দলীয় আনুগত্যের অভিযোগ রয়েছে। তাদের অধিকাংশই জনগণের কাছে তেমন পরিচিত নন ও তাদের গ্রহণযোগ্যতাও নেই। নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য না করলেও ইসি’র কার্যক্রম দেখে তারা মূল্যায়ন করবে। তবে দলটির আশা, নতুন কমিশন মেরুদণ্ড শক্ত রেখে কাজ করবে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ বলেছেন, জনগণের মধ্যে নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শক্তিশালী ও কার্যকরী নির্বাচন কমিশনের যে প্রত্যাশা ছিল, ঘোষিত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে তা পূরণ হয়নি। দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবাধীন ব্যক্তিকে প্রধান করে গঠিত নির্বাচন কমিশন কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে পারবে, তা নিয়েও ইতিমধ্যে আশংকা তৈরি হয়েছে। সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে নামের তালিকা জমা দেয়ার পর তাড়াহুড়ো করে নতুন নির্বাচন কমিশনের নাম ঘোষণা না করে যৌক্তিক সময় নিতে পারত। গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী বলেন, সার্চ কমিটি যেভাবে সব রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে নাম চেয়ে গণতান্ত্রিক যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। এ বিষয়টিকে অর্থহীন করে তুলেছে। এটা সরকারের ইচ্ছাপূরণের নির্বাচন কমিশন হয়েছে। এখানে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে জটিল ও কঠিন লক্ষ্য হিসেবে মনে করছে আওয়ামী লীগ। নতুন একটা নির্বাচন কমিশন গঠন এই লক্ষ্য অর্জনের প্রথম ধাপ। দলের নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, নিজেদের জোট ও বিরোধী অনেকের আস্থা নিয়ে প্রথম ধাপ এখন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে পাড়ি দেওয়া গেছে। এ নিয়ে সামনেও বড় কোনো চ্যালেঞ্জ আসবে বলে মনে করেন না দলের নীতি-নির্ধারকরা। দলের নেতারা ব্যক্তিগতভাবে গণমাধ্যমকে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া ও নতুন কমিশন নিয়ে তাদের আস্থা ও সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কমিটি ঘোষণার পরদিন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ আস্থা রয়েছে। রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানাই। বিএনপি এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে, আমি নিশ্চিত। তিনি বলেন, ‘বিএনপি নতুন সিইসিকে জনতার মঞ্চের সংগঠক বলছে। তাহলে কি বিএনপি জনতার বিরুদ্ধে? বিএনপির পুরো লিস্ট ধরে কমিশন গঠন করলেও বলত আমরা মানি না, মানব না।’
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দল নিজেকে খুব সতর্কভাবে যুক্ত রেখেছিল। অনুসন্ধান কমিটির কাছে নাম দেওয়া হয়েছে খুব গোপনীয়ভাবে। দলের শীর্ষ পর্যায়ের দু’-একজন বাদে অন্যরা নামের তালিকা সম্পর্কে জানতেন৬ই না। ১৪-দলীয় জোটকেও কমিশন গঠনে খুব সতর্কতার সঙ্গে কাজে লাগানো হয়েছে। জোটের অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য নাম নিয়ে পরামর্শ করেছেন আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা। সিইসিসহ আরও দু’জন কমিশনারের নাম তরীকত ফেডারেশনের দেওয়া তালিকায় ছিল। গণতন্ত্রী পার্টির তালিকায় থাকা দু’জন ব্যক্তি কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।
আমরা জানি যে প্রায় একই কায়দায় ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আগের নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল। ওই কমিশন সবার আস্থা অর্জন তো দূরে থাক বলা যায় দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ও সংস্কৃতিতে যে সুবাতাসের ধারা বইতে শুরু করেছিল তাকে কার্যত ধ্বংস করেছে। নতুন নির্বাচন কমিশনকে এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই কাজ শুরু করতে হবে। নির্বাচনী ব্যবস্থা ও কার্যক্রমের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজটি করতে হবে। এই কাজটি সহজ নয়, তবে মেরুদণ্ড সোজা রেখে এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংবিধান কমিশনকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, যথাযথ তা অনুশীলন করতে পারলে সেটা সম্ভব। সবকিছু মিলিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আশা ও প্রত্যাশা অনেক বেশি। আমরা আশা করব, কমিশনের ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, তা তারা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করবেন। ফলে নতুন এই কমিশনের কর্মকাণ্ডের ওপর গণমাধ্যম হিসেবে আমাদের নজর থাকবে। আমরা নতুন নির্বাচন কমিশনকে সফল দেখতে চাই। এবারে যাদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন হলো তাঁদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী নির্বাচন। সেই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে বলে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব জানিয়েছেন। কিন্তু অংশগ্রহণমূলক হলেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় না। আর ৫ জানুয়ারির কিংবা ১৫ ফেব্রুয়ারির মতো একতরফা নির্বাচন হলে তো নির্বাচন কমিশনেরই প্রয়োজন হবে না। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে হলে সরকার, প্রশাসন, সেই নৈতিক দল ও প্রার্থীদের নিজ নিজ সীমারেখার মধ্য থেকে কাজ করতে হবে।
ই-মেইল: jafar224cu@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ