বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বড় পরিবর্তনের পথে ক্রিকেট আয় বাড়ছে বাংলাদেশের

নাজমুল ইসলাম জুয়েল : বড় পরিবর্তনের আভাষ ছিল, এবার সে পথেই হেঁটেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। সেখানে আয় বেড়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি)। নতুন প্রস্তাবে আগের তুলনায় অনেক বেশি আয় করবে বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট। আগের প্রস্তাবে বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল মাত্র ৫৪৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট পেত আরও কম, ৫২৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কান বোর্ডের পাওয়ার কথা ছিল ৬৪৬ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে পাস হয়েছিল ‘তিন মোড়ল’ নীতি। ‘বিগ-থ্রি’ নীতিতে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আইসিসি’র সম্ভাব্য আয়ের ভাগ বণ্টনের একটা বর্ণনা দেয়া হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, আগামী ৮ বছরে আইসিসি’র আয়ের ২৭.৪ শতাংশই যাবে বিসিসিআই, ইসিবি ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কাছে। ভাগ-বাটোয়ারাটাও ছিল অদ্ভুত। অস্ট্রেলিয়া পাবে ২.৭ ভাগ অর্থ, যুক্তরাজ্যের ভাগে ৪.৪ ভাগ। আর ভারত একাই নিয়ে নেয়ার কথা ২০.৩ ভাগ! এতদিন এ নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে তত্ত্বটা ছিল, ৮ বছরে আইসিসি থেকে ভারত নিয়ে নেবে ৫৭১.৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার (বাংলাদেশী মূল্যমানে সেটা চার হাজার ৫৪৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা)! তবে এদিন জানা গেছে, ৫৭১.৫ মিলিয়ন নয়; অঙ্কটা আসলে ৪৫০ মিলিয়ন ইউএস ডলার (তিন হাজার ৫৭৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা)। এই পরিমাণ টাকা নিশ্চিত পাওয়ার কথা ছিল বিসিসিআইয়ের। কিন্তু নতুন যে অর্থনৈতিক মডেল পাস হতে যাচ্ছে, সেখানে বিসিসিআইয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে মাত্র ২৯০ মিলিয়ন ডলার বা দুই হাজার ৩০৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক ঝটকায় বিসিসিআইয়ের ভাগের অঙ্কটা কমে গেল ১ হাজার ২৭২ কোটি ৪০ লাখ টাকা! অবশ্য অর্থ বণ্টনের পরিমাণটা কীভাবে ঠিক হচ্ছে সেটা বলা হয়নি এখনো। সে জন্যই দুবাইয়ের মিটিংয়ে বিসিসিআই চেষ্টা করেছে যে কোনো উপায়ে এই প্রস্তাব পাস হওয়া আটকাতে। জিম্বাবুয়ে ভোট প্রদান থেকে বিরত থাকায় ও শ্রীলঙ্কাকে নিজেদের পাশে পাওয়ায় ভোটাভুটিতে শেষ ফলাফল ছিল ৭-২। আর এতেই সাহস পাচ্ছে বিসিসিআই। কারণ, আইসিসি’র যে কোনো প্রস্তাব পাস হতে হলে কমপক্ষে তিন-চতুর্থাংশ ভোট পেতে হয়। এপ্রিলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যখন নেয়া হবে তার আগেই আর্থিকভাবে দুর্বল বোর্ডগুলোকে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করবে বিসিসিআই। জিম্বাবুয়ের মতো বোর্ডগুলোকে বিসিসিআই কোনো লোভনীয় প্রস্তাবও দিতে পারে ভোট টানার জন্য। ভারতীয় বোর্ডের এক কর্মকর্তা তো বলেই দিয়েছেন, ‘৮-২ ভোটের প্রাধান্য দরকার ওদের। আর চার সদস্য যদি প্রস্তাবের বিপক্ষে থাকে তাহলে এটা কখনো পাস হবে না। আমরাই জিতব।’
১,২৭২ কোটি টাকা আয়
কমেছে ভারতের
আইসিসি কাঠামোয় আসছে বড় পরিবর্তন। ক্রিকেটের তিন সংস্করণে পরিবর্তনের পাশাপাশি কথিত ‘তিন মোড়ল’ নীতিরও অবসানও ঘটতে যাচ্ছে। আইসিসি’র সদ্য সমাপ্ত দুবাই বৈঠকে নিশ্চিত হলো সুষম অর্থনৈতিক বণ্টননীতিও। এখন থেকে আইসিসি’র আয়ের সুষম বণ্টন হবে। এ পরিবর্তনে ছোট দেশগুলো লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্রিকেটের ‘দৈত্য’ ভারত। নতুন অর্থনৈতিক মডেলে ২০১৫-২০২৩ চক্রে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) পাবে ২৯ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ২ হাজার ৩০৬ কোটি ২২ লাখ টাকা)। কিন্তু এতে ভীষণ অখুশি বিসিসিআই। কারণ ‘বিগ থ্রি’ নীতি পাস করার পর ঠিক এ চক্রটায় তারা ৪৫ কোটি ডলার (প্রায় ৩ হাজার ৫৭৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা) আয়ের হিসাব কষছিল। নতুন নীতিতে তারা হারাতে চলেছে প্রায় ১৬ কোটি ডলার বা ১ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। তিন বছর আগে ‘বিগ থ্রি’ নীতি পাস হলে ক্রিকেট পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতা চলে যায় ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের হাতে। তখন ‘বিগ থ্রি’ নীতিতে আইসিসি’র আয় বণ্টনের একটা রূপরেখাও দেয়া হয়। বলা হয়, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আইসিসি’র আয়ের ২৭ দশমিক ৪ শতাংশই পাবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড। ক্রিকেটের সবচেয়ে ধনী দেশ ভারতের একারই পাওয়ার কথা ছিল ২০ দশমিক ৩ শতাংশ (৫৭ কোটি ১২ লাখ ডলার বা প্রায় ৪ হাজার ৫৪৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা)। যদিও এখন জানা গেল, ভারতের পাওয়ার কথা ছিল ৪৫ কোটি ডলার। এছাড়া ইংল্যান্ডের ৪ দশমিক ৪ শতাংশ (প্রায় ১ হাজার ৩৮১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা) ও অস্ট্রেলিয়ার ২ দশমিক ৭ শতাংশ (প্রায় ১ হাজার ৪৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা) রাজস্ব পাওয়ার কথা। ২০১৫-২০২৩ সময়ে আইসিসি’র কাছ থেকে বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ৫৪৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের পাওয়ার কথা ছিল আট গুণ বেশ! এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তানের ৭৪৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা করে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলংকার ৬৪৬ কোটি টাকা করে, নিউজিল্যান্ডের ৬০৬ কোটি টাকা ও জিম্বাবুয়ের ৫২৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন সুষম অর্থনৈতিক বণ্টননীতি বাস্তবায়িত হলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আয়বৈষম্য কমে যাবে। দুবাইয়ে আইসিসি’র বোর্ডসভায় নীতিগতভাবে নতুন সংবিধান পাস করা হয়, যদিও এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছে ভারত। প্রথমে তারা ভোটাভুটি পিছিয়ে এপ্রিলে নিতে চেয়েছিল। তাতে সফল না হয়ে ভারত বিপক্ষে ভোট দেয়, তারা সমর্থন পায় শুধু শ্রীলংকার।
সবসময় ভারতের সঙ্গী হিসেবে থাকা বাংলাদেশ এবার পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন আইসিসি’র ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে নতুন সংবিধান তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে এর বিপক্ষে ভোট দেয়ার সুযোগ ছিল না। নতুন বণ্টননীতিতে আগের প্রাক্কলিত আয়ের চেয়ে বিসিসিআই কম পাবে, কিন্তু এটাও তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যদিও ভারতের আশা ছিল, যেকোনো মডেলেই তারা ৪০ কোটি ডলারের কাছাকাছি আয় করবে। কিন্তু অংকটা ২৯ কোটি ডলারে নেমে যাওয়ায় ধাক্কা খেয়েছে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বাজারের দেশটি। তারা সবসময়ই বলে এসেছে, আইসিসি’র আয়ে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখায় অন্য সবার চেয়ে তারাই বেশি রাজস্ব পাওয়ার দাবি রাখে। নতুন আর্থিক মডেলে তাই ভারতের চেয়ে বেশি হতাশ হয়নি আর কোনো দেশ।
তিন মোড়লের আবির্ভাবের আগে ২০০৭ থেকে ২০১৫ চক্রে আইসিসি’র পূর্ণ সদস্য দেশগুলো মোট ৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার সমানভাবে ভাগাভাগি করে নিয়েছে প্রত্যেকে পেয়েছে ৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার করে। নতুন মডেলে ভারত পাবে ২৯ কোটি ডলার। তবু অখুশি ক্রিকেটের সবচেয়ে ধনী বোর্ড। বিসিসিআইয়ের বর্তমান প্রশাসনের দাবির সঙ্গে অবশ্য একমত হতে পারছেন না সংস্থাটির সাবেক সভাপতি ও আইসিসির চেয়ারম্যান শশাঙ্ক মনোহর। তিনি জানান, ভারত তো আগে থেকেই বেশি আয় করে আসছিল, তাই তারা কেন আরো বেশি চাচ্ছে সেটি তার বোধগম্য নয়।
বিসিসিআইয়ের নাখোশ হওয়ার কারণটাও স্পষ্ট, নতুন মডেলে প্রত্যেকটি দেশ আগের চেয়ে বেশি আয় করতে চলেছে, কিন্তু আয় কমে যাচ্ছে ভারতের। তবে এপ্রিলে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও ভোটাভুটি হবে। তখন পরিবর্তনের প্রস্তাবে কিছুটা পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে। আইসিসি সভায় অংশ নেয়া বিসিসিআই প্রতিনিধি বিক্রম লিমায়ে জানিয়েছেন, এপ্রিলে চূড়ান্ত ভোটাভুটিতে তারা আরো অনেক দেশকে পাশে পাবেন। তিনি বলেন, ‘তাদের ৮-২ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে। চারটি দেশ রেজ্যুলেশনের বিরোধিতা করলে ভোটাভুটিই হবে না। চূড়ান্ত ভোটাভুটির সময় আমরা আরো কয়েকটি দেশকে পাশে পাব। আমরা জিতবই।’ বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে একটি করে বাড়তি ম্যাচ দিয়ে পাশে টানার প্রস্তাব আকার-ইঙ্গিতে দিয়েই রাখলেন লিমায়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ