বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

নতুন নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে

সাবেক সচিব কে এম নূরুল -দাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিযুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রপতির গঠন করা পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত প্রধান দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২০ দলীয় জোট তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, এই ইসিকে দিয়ে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব। অমন সরাসরি প্রতিক্রিয়ার বড় কারণ হিসেবে সিইসির রাজনৈতিক অতীতকে প্রাধান্যে এনে গত মঙ্গলবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জনতার মঞ্চে যোগদানকারী জনাব -দা একজন যুগ্ম-সচিব হিসেবে চাকরি জীবন শেষ করেছিলেন। আওয়ামী লীগের সমর্থক ও অনুসারী হওয়ায় পরবর্তীকালে তাকে অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে নিযুক্তি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কাগজে-পত্রে পদোন্নতি হলেও বাস্তবে তিনি সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি। অর্থাৎ সচিব বা অতিরিক্ত সচিবের পদে দায়িত্ব পালনের কোনো অভিজ্ঞতা তার নেই। একই কারণে কে এম নূরুল -দার মতো একজন অনভিজ্ঞ ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন নতুন ইসির পক্ষে কোনো সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়।  চার নির্বাচন কমিশনারকে নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটছে এখনো। সব মিলিয়েই নতুন ইসির ব্যাপারে সংশয় ও সন্দেহই প্রধান হয়ে উঠেছে। বলা হচ্ছে, সদ্য বিদায় নেয়া সিইসি যেমন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘কাজী রকিবউদ্দিন অ্যা- কোং’ তৈরি করে ওই ‘কোং’-এর চেয়ারম্যান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর তথা একচ্ছত্র ক্ষমতার মালিক হয়ে বসেছিলেন, নতুন সিইসিও তেমনি আরো একটি ‘অ্যা- কোং’-এর প্রধান হিসেবেই ভূমিকা পালন করবেন। সরকারের বদৌলতে তার ক্ষমতাও হবে সীমাহীন।
শুনতে ব্যঙ্গাত্মক মনে হবে সন্দেহ নেই কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ এবং সার্চ কমিটি গঠন করাসহ যে নাটকীয় ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ নতুন ইসি গঠন করেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়ার মূল কথাগুলোর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ নেই বললেই চলে। এ প্রসঙ্গেও সদ্য বিদায় নেয়া নির্বাচন কমিশনই বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। কারণ, ‘কাজী রকিবউদ্দিন অ্যান্ড কোং’ নামে কুখ্যাত হয়ে ওঠা এই ইসি দেখিয়ে গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের গঠন করা ইসি কতটা নির্লজ্জভাবে ক্ষমতাসীনদের আদেশ পালন করে থাকে। প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসেবে সকল মহল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের নামে আয়োজিত কর্মকাণ্ডের উল্লেখ করছেন। ওই নির্বাচনে তিনশ’ আসনের মধ্যে ১৫৫টিতেই আওয়ামী লীগ ও তার সমর্থক দলগুলোর প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন। অন্য আসনগুলোতেও বিএনপি ও জামায়াতসহ বিরোধী দলের কোনো প্রার্থী না থাকায় বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হওয়ার ধুম পড়ে গিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে দেশের ভেতরে তো বটেই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিন্দা-সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে। একমাত্র ভারত ছাড়া বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে মেনে নেয়নি। স্বীকৃতি দেয়নি এমনকি ওই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সরকারকেও। কিন্তু ‘মেরুদ-হীন’ হিসেবে বর্ণিত ইসি সংশোধনমূলক এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি।
তৃণমূল পর্যায়ের তথা ইউপি নির্বাচনের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ছয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনের ব্যাপারে প্রথম থেকেই অমার্জনীয় উপেক্ষা দেখিয়েছেন কমিশনাররা। ক্ষমতাসীন দলের বাইরে আর কোনো দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়া হয়নি। অনেকের মনোনয়নপত্র ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। অনেককে ভয়-ভীতি দেখিয়ে এলাকা থেকে তাড়িয়েছে ক্ষমতাসীন দলের গুণ্ডা-সন্ত্রাসীরা। তারা ভোটকেন্দ্র দখল করেছে, ব্যালট পেপারে সিল মেরেছে ইচ্ছামতো। গুণ্ডা-সন্ত্রাসীদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছে দেড়শ’র বেশি নিরীহ মানুষ, আহত হয়েছে কয়েক হাজার। সবকিছুই ঘটেছে নির্বাচন কমিশন তথা কমিশনারদের চোখের সামনে। অভিযোগও এসেছে তাৎক্ষণিকভাবে। কিন্তু কোনো একটি বিষয়েই কমিশন বা কমিশনারদের তৎপর হতে দেখা যায়নি। তারা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালেও বিচারের পদক্ষেপ নেননি। কমিশনাররা বরং আদালতে যাওয়ার উপদেশ দিয়েছেন। তারা লক্ষ্যই করেননি যে, নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্যায়, অনিয়ম ও অপরাধের বিচার এবং অভিযোগের নিষ্পত্তি করার জন্যই নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিধান করা হয়েছে। একই কারণে আদালতে যাওয়ার উপদেশ দেয়ার কোনো অধিকার তাদের থাকতে পারে না। অন্যদিকে আদালতে যাওয়ার উপদেশ দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের কর্তব্যের বিষয়ে অবহেলা তো করেছেনই, কমিশনাররা এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশকেও পাত্তা দেননি। এতটাই ক্ষমতাধর ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন নির্বাচন কমিশনাররা! এর পরিণতি অবশ্য শুভ হয়নি। কারণ, সর্বোচ্চ আদালতে সশরীরে গিয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হয়েছে তাদের। স্বয়ং সিইসিও রেহাই পাননি। হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ তাদের আবেদন মঞ্জুর করে ‘এবারের মতো’ ক্ষমা করে দিয়েছেন। মানতেই হবে, একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বিষয়টি ভারি লজ্জার।
মূলত এ ধরনের বিভিন্ন দুর্বলতা, নির্লজ্জভাবে সরকারের সেবকের ভূমিকা পালন এবং আইনের পরিপন্থী অবস্থানে চলে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতার মাধ্যমে এমন একটি কমিশন গঠন করার দাবি জানিয়েছিল, যার অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য সংসদসহ বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারবে। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার এবং দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সদিচ্ছার পরিচয় দেয়ার জন্যও আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে সামনে রেখে গঠন করা নতুন ইসি ক্ষমতাসীনদের বাইরে কোনো মহলেরই সমর্থন ও আস্থা অর্জন করতে পারেনি। তা সত্ত্বেও আমরা আশা করতে চাই, নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করার যে অঙ্গীকার সিইসি ঘোষণা করেছেন বাস্তবে তার প্রমাণ তিনি দেবেন। তেমন অবস্থায় অন্য কমিশনারদের সহযোগিতায় জনাব কে এম নূরুল -দা জনগণের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থাও অর্জন করতে পারবেন। সেটা না হলে তছনছ হয়ে যাবে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা, যে ভয়ংকর প্রক্রিয়ার সূচনা করে গেছে ‘কাজী রকিবউদ্দিন অ্যান্ড কোং’।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ