মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সুন্দরবনে বন্দুকযুদ্ধে শামসু বাহিনীর প্রধান নিহত

খুলনা অফিস : সুন্দরবনে র‌্যাবের সঙ্গে গুলী বিনিময়কালে বনদস্যু শামসু বাহিনীর প্রধান শামসু শেখ ওরফে কোপা শামসু (৪৫) নিহত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বাগেরহাট মংলার সুন্দরবনের শ্যালা নদীর মৃগমারী সংযোগ খালে এ গুলাগুলীর ঘটনাটি ঘটে। র‌্যাব ঘটনাস্থল থেকে একটি বিদেশি সিঙ্গেল ব্যারেল বন্দুক, দু’টি দেশি সিঙ্গেল ব্যারেল বন্দুক, ৩৬ রাউন্ড গুলী ও দু’টি রাম দা উদ্ধার করেছে।
খুলনা র‌্যাব-৬ এর অপারেশন অফিসার জাহিদ হোসেন জানান, মৃগমারী সংযোগ খালে বনদস্যু শামসু বাহিনীর সঙ্গে র‌্যাবের গুলাগুলী শুরু হয়। ১৫ মিনিটব্যাপী বন্দুকযুদ্ধের পর বনদস্যুরা পিছু হটে। পরে ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে বাহিনী প্রধান শামসুকে গুলীবিদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয়। পরে তাকে আশংকাজনক অবস্থায় মংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
খুলনা র‌্যাব-৬ পরিচালক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, আশংকাজনক অবস্থায় আটক করে মংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে সেখানে শামসুর মৃত্যু হয়। ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে তিনটি অস্ত্র, ৩৬ রাউন্ড গুলী ও দু’টি রাম দা উদ্ধার করা হয়েছে।
এ নিয়ে গত আট বছরে ৮৮ জন বনদস্যু নিহত হয়েছে। এ সময় উদ্ধার করা হয় ৫১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে কয়েকশ’ বনদস্যুকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। তবে বনদস্যুদের বাহিনী প্রধানরা নিহত হলে দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড বা প্রভাবশালী সদস্যরা নতুন নামে একাধিক দস্যু বাহিনী গঠন করে ডাকাতি অব্যাহত রাখে।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক বছরে সুন্দরবনে বনদস্যুরা মারাত্মক বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা জেলেদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায় শুরু করে। চাঁদা না পেলে ট্রলারে হামলা চালিয়ে জাল ও মাছ লুট এবং জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করতে থাকে। বনদস্যুদের বেপরোয়া তাণ্ডবের কারণে সাগর ও বনের ওপর নির্ভরশীল জেলেরা অতিষ্ঠ হওয়ার অভিযোগ ওঠায় সুন্দরবনে বেড়ে যায় র‌্যাবের অভিযান। বন্দুকযুদ্ধে একের পর এক নিহত হতে থাকে কয়েকটি বনদস্যু বাহিনীর প্রধানসহ তাদের সহযোগীরা। এতে সুন্দরবনের বনদস্যুদের মধ্যে র‌্যাব আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দিশেহারা এসব বনদস্যুদের কাছ থেকে আসতে থাকে আত্মসর্মপণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব। এরই সূত্র ধরে গত ৩১ মে মাস্টার বাহিনীর ১০ সদস্য ৫১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে। আর এই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সুন্দরবনের দস্যুতার এক নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়।
র‌্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবিরের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০০৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন দুর্ধর্ষ জলদস্যু মোতালেব বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড মীর মোশাররফ মল্লিক ওরফে কচি ভাই (৪৫)। এ সময় উদ্ধার করা হয় তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র।
২০১০ সালে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন সাত বনদস্যু। উদ্ধার করা হয় ২৯টি আগ্নেয়াস্ত্র।
২০১১ সালে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১৮ বনদস্যু। উদ্ধার করা হয় ৭০টি আগ্নেয়াস্ত্র।
২০১২ সালে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১৭ বনদস্যু। উদ্ধার করা হয় ৭৪টি আগ্নেয়াস্ত্র।
২০১৩ সালে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১৩ বনদস্যু। উদ্ধার করা হয় ৬২টি আগ্নেয়াস্ত্র।
২০১৪ সালে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১০ বনদস্যু। উদ্ধার করা হয় ৫১টি আগ্নেয়াস্ত্র।
২০১৫ সালে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১৬ বনদস্যু। উদ্ধার করা হয় ১৩৯টি আগ্নেয়াস্ত্র।
২০১৬ সালের মে পর্যন্ত র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ৬ বনদস্যু। উদ্ধার করা হয় ৪১টি আগ্নেয়াস্ত্র। এ বছরের ৩১ জানুয়ারি বন্দুকযুদ্ধে মজনু বাহিনীর উপ-প্রধান জলদস্যু মশিউর রহমান (২৯) নিহত হন। উদ্ধার করা হয় ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র। ১০ মার্চ  নিহত হন নয়ন বাহিনীর প্রধান মনির হোসেন (২৫), তার সহযোগী এনাম (৩৫), গিয়াস উদ্দিন (২৫) ও হাসান (২০) নামে চার বনদস্যু। উদ্ধার করা হয় ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র। ৬ মে নিহত হন আলম বাহিনীর প্রধান আলম খান। উদ্ধার করা হয় ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র।
গত এক বছরে কয়েকটি বনদস্যু বাহিনীর প্রধানরা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হতে থাকলে ৩১ মে মাস্টার বাহিনীর ১০ সদস্য ৫১ টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেন।
র‌্যাব-৮ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফরিদুল আলম বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে র‌্যাব-৮ সুন্দরবনে দস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যহত রেখেছে। এ পর্যন্ত ৪০ জনেরও বেশি বনদস্যু বাহিনী প্রধানসহ অনেক বনদস্যু বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৫ শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র। এছাড়া গত ৩১ মে সুন্দরবনের কুখ্যাত বনদস্যু মাস্টার বাহিনীর ১০ সদস্য আত্মসমর্পণ করেছে।
তিনি বলেন, জেলেদের খবর অনুযায়ী পূর্ব সুন্দরবন এখন দস্যুমুক্ত। তবে পশ্চিম সুন্দরবনে এখনও কিছু বনদস্যু বাহিনী রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সুন্দরবনে বনদস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য মোটিভেশন দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু বাহিনী প্রধান আত্মসর্মপণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য যোগাযোগ করেছে। তাদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে সহযোগিতা করা হবে। আর যারা ফিরে আসবে না, তাদের বিরুদ্ধে র‌্যাব কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
এ ব্যাপারে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) সাইদুর রহমান বলেন, বিশাল আয়তনের এ সুন্দরবনের সুরক্ষার জন্য সীমিত সংখ্যক বনরক্ষী রয়েছে। তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে র‌্যাবের অভিযানের ফলে সুন্দরবনে বনদস্যুদের তৎপরতা অনেকাংশে কমে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ