মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মেয়াদ উত্তীর্ণ ১৮ হাজার মেট্রিক টন সার নিচ্ছেন না ডিলাররা ভিয়েতনাম থেকে ফেরতকৃত সার এখন লালমনিরহাটে

লালমনিরহাট সংবাদদাতা: মেয়াদ উত্তীর্ণ ১৮ হাজার মেট্রিক টন সার নিচ্ছেন না ডিলাররা। ভিয়েতনাম থেকে ফেরতকৃত সার এখন লালমনিরহাটে। এ কারণে লালমনিরহাট জেলার কৃষকরা সার সংকটে পড়েছেন। এতে করে চলতি মওসুমের চাষাবাদ নিয়ে বিপাকেও পড়েছে তারা।
জানা গেছে, চীনে উৎপাদিত ভিয়েতনাম থেকে ফেরত পাঠানো ১৮ হাজার মেট্রিক টন মেয়াদ উত্তীর্ণ ইঊরিয়া সার লালমনিরহাট বাফা’র সার গোডাউনে পাঠানো হয়েছে। প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের এই মেয়াদ উত্তীর্ণ ইঊরিয়া সার গোডাউনসহ যত্রতত্র পড়ে রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ওই বাফার সার গোডাউনের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ মোঃ হানিফ মিয়া দীর্ঘ ৭দিন ধরে কর্মস্থল ত্যাগ করে আত্মগোপনে রয়েছে। এ মেয়াদ উত্তীর্ণ ইউরিয়া সার না নিয়ে ফিরিয়ে যাচ্ছেন বিসিআইসি’র ডিলাররা।
অভিযোগ রয়েছে, লালমনিরহাটের মহেন্দ্রনগর বাফার সার গোডাউনে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী চীনের উৎপাদিত ভিয়েতনাম থেকে ফেরত পাঠানো ১৮ হাজার মেট্রিকটন মেয়াদ উত্তীর্ণ ইউরিয়া সার দীর্ঘ ২ বছর যাবত গোডাউনের ভিতরে ও বাইরে ত্রিপাল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল। এ সব সার বিসিআইসি’র ডিলারদের মাঝে সরবরাহ করতে গিয়ে ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়ে। সার সরবরাহ নেয়া না নেয়াকে কেন্দ্র করে গত ৭দিন যাবৎ গোডাউন এলাকায় সংশ্লিষ্ট গোডাউন কর্তৃপক্ষ ও বিসিআইসি’র ডিলারদের মাঝে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। গোডাউন ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ ঘটনা ধামাচাপা দিতে কর্মস্থল ত্যাগ করে গা ঢাকা দিয়েছে। আমদানিকার, ক্যারিং ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো গোডাউনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে অর্থের বিনিময়ে রাতের আঁধারে মেয়াদ উত্তীর্ণ ইউরিয়া সার গোডাউনে ঢুকার কারণে সৃষ্টি হয়েছে এ সমস্যার।
সরেজমিনে বিসিআইসি সরকারি সার গোডাউনে গিয়ে দেখা গেছে মেয়াদ উত্তীর্ণ সারের চিত্র। গোডাউনের চতুর্দিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে সরকারের ভর্তুকি দিয়ে আমদানিকৃত সারের বস্তার স্তূপ। চলছে গোডাউনের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জের সাথে কিছু বিসিআইসির ডিলারের সিন্ডিকেট ব্যবসা। বোরো মওসুমে কৃষকের বাম্পার ফলনে সরকার প্রতি বছর ভর্তুকি দিয়ে চীন, মিসর থেকে আমদানি করা ইউরিয়া সার। ভর্তুকি দিয়ে চীন থেকে সার আমদানি করলেও সারগুলো ছিলো মেয়াদ উত্তীর্ণ। চাষাবাদে ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় এ সার পড়ে রয়েছে গোডাউনে। নতুন করে সার আসলেই পড়ে সিন্ডিকেটের হাতে। কিছু কিছু বিসিআইসি’র ডিলার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গোডাউন-এর ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ হানিফ মিয়ার সাথে ঘুষ বাণিজ্যর মাধ্যমে নতুন করে আসা ইউরিয়া সার দ্রুত ভাগবাটোয়ারা হয়ে যাচ্ছে। ফলে পূর্বের আমদানিকৃত পুরাতন সার পড়ে থাকছে গোডাউনে। ফলে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিসিআইসির সুবিধা বঞ্চিত কয়েকজন ডিলার জানান, এসব মেয়াদ উত্তীর্ণ ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে চাষাবাদের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এ কারণে আমরা সার উত্তোলনে অপারগতা জানিয়েছি কর্তৃপক্ষকে। এসব ইউরিয়া সার উত্তোলন করলেও এ শুস্ক মওসুমে ইরি-বোরো চাষে ব্যবহারের জন্য কৃষকরা নিচ্ছে না ওইসব সার। কৃষকরা সার না নেয়ায় পচা-জমাট বাঁধা সার নিয়ে বিপাকে পড়েছে ডিলাররা। বাফার’ সার গোডাউনে পড়ে রয়েছে চীন থেকে আমদানি করা হাজার হাজার বস্তা নষ্ট সারের স্তূপ।
লালমনিরহাট বিসিআইসি’র সার ডিলার সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, মেসার্স তাহের ট্রেডার্স-এর মালিক শেখ আবু তাহের জানান, গোডাউন ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জকে ম্যানেজ করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নতুন সারগুলো বিতরণ করায় পুরাতন সার ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ কারণে চীন থেকে আনা ইঊরিয়া সার জমাট বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিসিআইসির সার ডিলার কাজী শাহাজাহান জানান, জমাট বাঁধা সার পরিবর্তন করে ভালো সার সরবরাহ না করলে এ অঞ্চলের কৃষকরা সার সংকটে পড়বে। জেলায় বোরো মওসুমে  ৬ হাজার ৩১ মেট্রিক টন ইঊরিয়া সারের চাহিদা থাকলেও রয়েছে মেয়াদ উত্তীর্ণ সারসহ ২৬ হাজার মেট্রিক টন সার ওই গোডাউনে। তার মধ্যে ১৮ হাজার মেট্রিক টন শক্ত ও জমাট বাঁধা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, সরকারিভাবে বিসিআইসির মাধ্যমে ভর্তুকি দিয়ে বিদেশ থেকে এ ইউরিয়া সার আমদানি করে। বিসিআইসির সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে আমদানিকারকরা চীন থেকে নিম্নমানের সার আমদানি করে চাপিয়ে দিচ্ছে লালমনিরহাট বাফা’র গোডাউনে। গোডাউনের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জকে মোটা অংকের বখরার বিনিময়ে গোডাউনে মেয়াদ উত্তীর্ণ সারগুলো সরবরাহ নেয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে নানাবিধ সমস্যা। গোডাউনে অনেক সারের বস্তা ফেটে গেছে এবং অনেক সারের বস্তা শক্ত হয়ে পাথরের মতো হওয়ায় সার নিয়ে বিপাকে পড়েছে বাফা-এর আওতাধীন ৫১জন বিসিআইসির ডিলার। এতে করে সরকারের প্রায় ২৫ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছে। সারপুকুর এলাকার কৃষক মোঃ নছিমুদ্দিন জানান, ওই ইউরিয়া সার দলা, জমাট বাঁধা শক্ত ও লালচে হওয়ার কারণে ফসলের ক্ষতি হবে। এ ছাড়াও জমাট বাঁধা সার যে স্থানে পড়ে সেই স্থানের ফসল নষ্ট হওয়ার আশংকা রয়েছে। বোরো চাষী মোঃ রহমত আলী জানান, জমাট বাঁধা ও পচন ধরায় এ নিম্নমানের ইউরিয়া সার ক্ষেতে দিলে লোকসান হয় এ জন্য নষ্ট সার জমিতে দেই না। মহেন্দ্রনগর বাফার গোডাউনের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ মোঃ হানিফ মিয়া জানান, এ সার উপর মহলের নির্দেশে গোডাউনে নেয়া হয়েছিল। সার মেয়াদ উত্তীর্ণ কি জমাটবাঁধা এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিধু ভূষণ রায় জানান, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ