বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বাংলা খ্যয়ালের স্রষ্টা নজরুল

শফি চাকলাদার : ইদানীং ঢাকার চ্যানেল আই থেকে প্রচারিত হল ‘বাংলা খেয়াল’ এর তৃতীয় অনুষ্ঠান। এটি একটি শুভ সূচনা। কিন্তু আপত্তি আছে আমার এই খানে যে ‘বাংলা খেয়ালের স্রষ্টা আজাদ রহমান’ বলাতে। এই ‘স্রষ্টা’ শব্দটির মধ্যে মনে হয় যেন কোন ইঙ্গিত বহন করছে। সামান্য প্রসঙ্গ কথা না বললেই নয়, বাংলা খেয়াল উৎসব চ্যানেল আই ২০১৭-এর এমন আয়োজন প্রশংসনীয়। এই উমে ভাটা না পড়ে চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষকে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে অনুরোধ করছি। সব ভালো কাজই বলা দরকার সুন্দর। অবশ্য বিভ্রান্তমূলক কিছু যদি না থাকে সেই ভালোর মধ্যে। আমার এ লেখার মধ্যে আমি তথ্যাদি নিয়েই কথা বলার চেষ্টা করছি। আমার আপত্তি এবং প্রতিবাদ ‘বাংলা খ্যয়ালের স্রষ্টা’ আজাদ রহমান? তবে আজ থেকে প্রায় একশ’ বছর পূর্বে নজরুল যে খ্যয়াল, ঠুংরি প্রবর্তন করলেন সেগুলো কোন ভাষায় লেখা হয়েছিল। বাংলা খ্যয়াল নয়কি সেগুলো? আমার তো মনে হয় আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতিতে কোথাও কোন অশিক্ষা, অ-সংস্কৃতি ঘুরে বেড়াচ্ছে। নয়তো আমরা তথ্য ইতিহাস না জেনেই নিজ স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে থাকি এবং সে অনুপাতে কাজ করি। কোন কাজে হাত দেয়ার আগে সে কাজটি নিয়ে তথ্যাদি সংগ্রহ করা দরকার। এই ‘দরকার’টাই সব সময় করা হয় না। নজরুলের নামে দু’দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। “খ্যয়াল” অনুষ্ঠান করা হচ্ছে তাই সেখান থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ করে এ ধরনের কাজে হাত দেয়া উচিত ছিল। আমি ক’জন নজরুল সঙ্গীত শিল্পীর সঙ্গে আলাপ করে এটাই বুঝতে পেরেছি যে তারা তথ্য বা সত্যে নীরব। তারা এটাই বুঝতে পারছে না যে নজরুল আজ থেকে প্রায় একশত বছর পূর্বে যে খ্যয়াল গান প্রবর্তন করে গেলেন সেগুলো তাহলে কোন ভাষায় রচেছিলেন? নজরুল রচিত খ্যয়ালগুলো কি বাংলা ভাষায় ছিল না? তা হলে বাংলা খ্যয়ালের স্রষ্টা কি করে আজাদ রহমান হলেন?
নজরুলের ‘শিউলি মালা’ গল্পটি প্রকাশ পায় ১৩৩৭-শ্রাবণে। সেখানের একটি সংলাপ লক্ষ্য করুন যেখানে নজরুল খ্যয়াল গান নিয়ে বলেন- ‘প্রফেসর চৌধরী খুশি হয়ে বলে উঠলেন, ‘আহা হা হা! বলতে হয় আগে থেকে। তাহলে যে গানটাই আগে শুনতাম তোমার। আর গান হিন্দি ভাষায় না হলে জমেই না ছাই। ও ভাষাটাই যেন গানের ভাষা। দেখ, ক্লাসিকাল মিউজিকের ভাষা বাংলা হতেই পারে না। কীর্তন, বাউল আর রামপ্রসাদী ছাড়া এ ভাষায় অন্য ঢং-এর গান চলে না।’ আমি বললাম, ‘আমি যদিও বাংলা গান জানিনে, তবু বাংরা ভাষা সম্বন্ধে এতটা নিরাশও পোষণ করি না।”
‘নজরুল গীতিকা’ প্রকাশ পায় ১৩৩৭ ভাদ্রে। এ গ্রন্থের গানগুলো নজরুলের অন্য গ্রন্থে থেকে নেয়া হয়েছে। এখানে খ্যয়াল গান রয়েছে ২৯টা, ধ্রুপদ রয়েছে ৬টা, ঠুংরি রয়েছে ১৫টা, গজল রয়েছে ২৬টা। গ্রন্থটিতে অন্যান্য গান রয়েছে তবে সেগুলোর এখানে কোন প্রয়োজন নেই তাই উল্লেখ করলাম না। ‘শিউলি মালা’ গল্পটির সংলাপ যখন তৈরি করেন তখন তিনি ক্লাসিকাল গান যে বাংলায় হয় না সেকথা মিথ্যা প্রমাণ করে বাংলা খ্যয়াল, বাংলা গজল, বাংলা ধ্রুপদ বাংলা ঠুংরিও রচে চলেছেন এবং প্রমাণ করে দিয়েছেন বাংলায় এসব ক্লাসিকাল হয় এবং হিন্দির থেকে উৎকৃষ্ট তো বটেই। অনেকেই বলে থাকেন খ্যয়াল, গজল নজরুলের আগেও অতুলপ্রসাদ করেছেন। করেছেন তো ভাল কিন্তু তারা তা চেষ্টা করেছেন বলা যায় সফল হননি। কারণ তারা ছিলেন ‘নায়কী’ নির্ভর সুরকার। বর্তমানের সঙ্গীত আলোচক কিম্বা আলোচকরা অনুষ্ঠান উপস্থাপকরা মোটেও ওয়াকিফহাল নন যে ‘নায়কী’ এবং ‘গায়কী’ দুটো প্রকার রয়েছে সঙ্গীতে। নজরুল পূর্বে অতুল, দ্বীজেন, রজনী, রবীন্দ্র সকলেই ‘নায়কী’তে সুর বেঁধেছেন। তাদের গানে যেভাবে যে পর্দা ব্যবহার করা হয়েছে এর বাইরে কিছুই করা যাবে না। যার ফলে তাদের গান বিভিন্ন ক্ষেত্রে চেষ্টা হয়তো হয়েছে সফল হতে পারেনি। নজরুলের গানে নজরুল প্রচলিত ‘নায়কী’কে সম্পূর্ন রূপে পরিহার করে ‘গায়কী’র প্রবর্তন করলেন। সুরকে বিস্তারের সুযোগ দিলেন। হ্যা, তবে ‘অশিক্ষিত’ পথে নয়। গণতন্ত্র যেমন অশিক্ষিতের হাতে মার খায় সুরও তেমনি ‘অশিক্ষিত’ শিল্পীর হাতে পথ হারায়। শিল্পী স্বাধীনতা-বৈঠকী সবকিছুর সুযোগ রাখলেন নজরুল তাঁর সঙ্গীতে। উদারতা দিয়ে নজরুল তার সঙ্গীতকে সাহিত্যকে সর্বোচ্চে নিয়ে গেলেন। এ সব রপ্ত করতে হলে ‘নজরুল’কে পড়তে হবে জানতে হবে। নজরুলের গল্প রিক্তের বেদন, মেহর-নেগার, সাঁঝের তারা, সালেক, শিউলি-মালা, ব্যথার দান, বাদল-বরিষণে, ঘুমের ঘোরে, অতৃপ্ত কামনা পড়তে হবে, তাহলে নজরুলকে আবিস্কার করতে পারবেন। মনে রাখবেন নজরুলের গান কাব্য সুর ইংরেজি Discovery নয় INVENT. নিত্য নতুন সমাহার। মাথা দোলালেই সুর বোঝা গেল-এমনটা নয় বরং সুর বুঝে মাথা দোলালে সেটা হবে সমঝদার। মানবেন্দ্র-রাধাকান্ত’র গানগুলো শোনা দরকার। নজরুলের গান অনেক বেশি আলাদা অন্য গান থেকে। আজ খ্যয়াল গান মূর্ত হয়ে উঠেছে এটা বলা ঠিক নয়, বলা দরকার মূর্ত-বিমূর্ত করে রেখেছে নজরুল বিগত শত শত বছর ধরে। আর সূক্ষ্ম বুদ্ধির কবলে বলা হচ্ছে ‘বাংলা খ্যয়াল-এ স্রষ্টা’-? উত্তর প্রদেশের কাজরী গানকে বাংলাতে নিয়ে এসে বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করল?- নজরুল। কে ‘সাঁওতালী’ সঙ্গীতকে বাংলাতে নিয়ে এসে বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করল?- নজরুল। বীরভূমে সাঁওতাল অঞ্চল রাবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বভারতী’ থেকে দূরে নয়। অথচ ‘সাঁওতাল’ সুর নজরুলের হাত ধরে বাংলা সঙ্গীতে যুক্ত হলো। উদার মানসিকতার প্রয়োজন। প্রয়োজন গ্রহণীয় মনোভাব। এখানে নজরুলের কটি সঙ্গীত নিয়ে সংলাপ তুলে ধরছি (নজরুল না পড়েই এরা নজরুল নিয়ে মন্তব্য করেন- এটাই হচ্ছে সবচেয়ে হাস্যকর, দুর্ভাগ্য)-
১। ‘নিশি-ভোরটা নাকি বিশ্ববাসী সবার কাছেই মধুর, তাই এ সময়কার টৌড়ি রাগিনীর কল-উচ্ছ্বাসে জাগ্রত নিখিল অখিলের পবিত্র আনন্দ-সরসী-সলিলে ক্রীড়ারত মরাল যূথের মতো যেন সন্তরণ করে বেড়ায়, কিন্তু আমার নিশি ভোর না হলেই ছিল ভাল।’- (‘ঘুমের ঘোরে’- প্রকাশকাল ১৩২৬)।
২। ‘-তার বাঁশি আমি শুনেছি, তাই আমার এ অভিসারের যাত্রা; আমার বাঁশি সে শুনেছে, তাই তারও ঐ একই দিক হারা-হারা পথে অভিসার যাত্রা! আমি ভাবছি আমার এ যাত্রার শেষ ঐ পথহীন পথের অ-দেখা পথিকের কুটির দ্বারে, -পথের যে মোহনায় গিয়ে পথ-হারা পথিক ঐ চেনা বাঁশির পরিচিত বেহাগ-সুর স্পষ্ট শুনতে পায়। সে বেহাগ রাগে মিলনের হাসি আর বিদায়ের কান্না আলো-ছায়ার মতো লুটিয়ে পড়ে চারিপাশের পথে। কারণ ক্লান্ত পথিক ঐ চৌমাথায় এসে মনে করে, বুঝি তার চলার শেষ হলো; কিন্তু সেই পথেরই বাঁক বেয়ে বেহাগের আবাহন তাকে অন্য আর এক পথে ডেকে নেয়। তারপর সকালের পথ তাকে বিভাসের সুরে, দুপুরের পথ সারেঙ রাগে আর সাঁঝের পথ পূরবীর মায়াতানে পথের পর পথ ঘুরিয়ে নিয়ে যায়। হায়, একি গোলকধাঁধা?’
-(বাঁধন হারা (চ)-প্রকাশকাল-১৩৩৪ শ্রাবণ)
০৩। ‘দেখলাম, বেলাশেষের পূরবী রাগিনীর মতো তার চোখে-মুখে কান্না আর ক্লান্তি। বাতায়ন পথে সন্ধ্যাতারার দিকে সে একদৃষ্টে চেয়ে আছে।’ -(মৃত্যুক্ষুধা-আটাশ, প্রকাশকাল ১৩৩৭ বৈশাখ)।
কলেবর বৃদ্ধি করার প্রয়োজন নেই। সঙ্গীতের উপর নজরুলের যে কতটা দখল ছিল এসব লেখা থেকে তা উপলব্ধি করা যায়। পরবর্তীকালে নজরুল যে একজন অতুলনীয় সঙ্গীত রূপকার, সঙ্গীত সুরকার, সঙ্গীত বাণীকার হয়ে উঠলেন এসব থেকে তা অনুমান করা যায়। তবে দুঃখ লাগে এখানেই যে বাংলাদেশে নজরুল নিয়ে যারা উপস্থাপনা করে, আলোচনা করে, চ্যানেলগুলোয় ‘নজরুল’কে যে সামান্য সময় দেয়া হয় কিম্বা মূল্যায়ন করা হয়, গড়বড়টা হয় সেখানেই। সঙ্গীত নিয়ে যারা ব্যস্ত তারা তো সকলেই জানেন, নজরুল-অবদানগুলোর প্রায় সবই প্রবর্তিত। নজরুলই প্রথম এসব কাজ করে গেছেন। ১৯৩০-এর আগে ‘বাংলা’ শব্দ যুক্ত করলে স্রষ্টা হওয়া যায়, এটা অবাক করে। প্রশ্ন তবে নজরুলের খ্যয়াল গানের ভাষা কি ছিল? বাংলা নয় কি? তাহলে ‘স্রষ্টা’ শব্দটি তো নজরুল শতবর্ষ পূর্বেই দখল করে নয়, জয় করে নিয়েছেন। এর ক্রেডিট তো শতভাগ নজরুলের। বরং বলা দরকার, ঘোষণা করার জন্য এমন যে ‘নজরুল প্রবর্তিত বাংলা খ্যয়াল-এর অগ্রগতিতে আজাদ রহমানের নিরলস একক প্রচেষ্টা’। যে বাংলা খ্যয়াল নজরুল সৃষ্টি করে গেছেন, যে বাংলা খ্যয়াল নজরুল প্রবর্তন করে গেছেন, সেখানে বিভ্রান্তিকর নাম দ্বারা ‘নজরুল’কে নিয়ে নতুন বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করা থেকে এমনটাই চাই। আশা করব, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শুভ বুদ্ধির বিকাশ হবে। তাই পুনরায় বলছি, বাংলা খ্যয়ালের জন্ম তো নজরুল দিয়ে গেছেন নব্বই বছর পূর্বে। বাংলা খ্যয়ালের পিতা নজরুল বাংলা খ্যয়ালের জনক নজরুল বাংলা খ্যয়ালের স্রষ্টা নজরুল। এখন যিনি করছেন তিনি উত্তরসুরী। বাংলা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জন্ম, প্রসার এবং সকল ধরনের ক্ষেত্র তৈরি এবং ক্রমবর্ধমান উন্নতির জন্য একমাত্র ‘নজরুল’-এর নামই উচ্চারিত হবে- অন্য কোন নাম নয়। আরো বলা দরকার, বাংলা সঙ্গীতের শুধু উচ্চাঙ্গ নয়, সকল ধরনের সঙ্গীতের নজরুল শুদ্ধ উন্নয়নই করেননি অসংখ্য অসংখ্য ধারার সঙ্গীতের প্রবর্তক আমাদের প্রিয় কবি জাতীয় কবি নজরুল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ