শুক্রবার ২৩ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

বাংলাদেশের নদী

আখতার হামিদ খান : আড়াইশ নদ-নদী পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের প্রধানত একটি নিম্ন সমতল ভূমি বিশিষ্ট অঞ্চল। জালের মত এই নদীগুলো এবং প্রায় ৫০০টি খাল ঘিরে রেখেছে এদেশকে। যুগে যুগে এই নদ-নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে জনপদ, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্য কেন্দ্র, সেই সঙ্গে স্থায়ী হয়েছে বাঙালি সমাজের অগ্রগতি ও সাচ্ছল্য। বাংলাদেশ চারটি দেশ যথা-চীন, ভুটান, নেপাল ও ভারতের ১.৫৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার অববাহিকার পানি নিষ্কাশনের আধার। বিপুল জলরাশি। প্রায় ৬ মিলিয়ন কিউসেফ পানি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা নদী ও তাদের শাখা-প্রশাখা দ্বারা প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। যার ফলে বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে ১৪৪০০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ। প্রতিবছর প্রায় আড়াই বিলিয়ন টন পলি বহন করছে এই নদীগুলো, কিন্তু উজানে বেশ কয়েকটি প্রধান প্রধান নদীর পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশ এখন পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিকভাবে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তাই আমাদের নদীর জীবন প্রবাহ নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ নদী কেবল প্রকৃতির নয়, মানুষেরও। আর মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত।
 ভৌগোলিক কারণেই আমাদের ভূ-খণ্ডের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর ৮৫% ভারত থেকে প্রবাহিত হয়ে এসেছে। আবার ভারতীয় ভূ-খণ্ড থেকে আসা নদীগুলোর এক তৃতীয়াংশ নেপাল এবং এক দশমাংশ ভুটান থেকে প্রবাহিত। আমাদের সীমানার চারপাশের ভূ-খণ্ডগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক নদী এসে মিশেছে আমাদের ভূ-খণ্ডে। কেবল ভারতীয় ভূ-খণ্ডের ৫৪টি নদী এবং সে সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি লাভ করা সবগুলো ছোট বড় নদী মিলিয়ে প্রকৃত অর্থেই নদ-নদীর এক জল ছড়িয়ে রয়েছে পুরো ভূ-খণ্ডে।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক নদীসমূহ : ভারত, মিয়ানমার (বার্মা) ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবাহিত নিম্নলিখিত ৫৯টি নদী বাংলাদেশের যেসব জেলার মধ্যদিয়ে প্রবেশ করেছে তা নিম্নরূপ
১। পার্বত্য চট্টগ্রাম: কর্ণফুলী, মাতামুহুরী, কাসালংখাল, মায়ামি খাল, থেগা ও কাওরপিন (বার্মা থেকে) এবং রাং খাইয়াংগ খাল (বার্মা থেকে)।
২। চট্টগ্রাম: হলদা, ফেনী।
৩। নোয়াখালী: মুহরী, সেলোনিয়া।
৪। কুমিল্লা: ছোট ফেনী-ডাকাতিয়া, গোমতী, হাওড়া, আন্দারসন খাল, কেরানাই, বিজনি, সালদা।
৫। সিলেট: বগুড়া (ইউনিয়াম), ধলা, গোপলা-লংগলা, নওয়া গাং, খোয়াই, কারংগি, লাংগলী, ধলাই, মনু, জুরি, সোনাই বড়দাল, কুশিয়ারা, সুরমা-মেঘনা, সারি-গোয়হিন, পিয়াল, ধামালিয়া, যদুকাটা।
৬। ময়মনসিংহ: সোমেশ্বরী, নিতাই, ভোগাই, কাংসা, চিলাখালী, ব্রহ্মপুত্র, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র।
৭। রংপুর: ব্রহ্মপুত্র (ময়মনসিংহ), দুধকুমার, ধরলা, তিস্তা, খারখারিয়া।
৮। দিনাজপুর: তালমা, করতোয়া, আত্রাই, ট্যাংগন, ডাহুক, নাগর, কুলিক (বাংলাদেশ থেকে ভারত)
৯। রাজশাহী: মহানন্দা, গঙ্গা, পুনর্ভবা, পাগলা।
১০। কুষ্টিয়া: মাথা ভাঙ্গা।
১১। যশোর: কপোতাক্ষ।
১২। খুলনা: কালিন্দী (ভারতের ইছামতীর উপরিভাগ), রায়মঙ্গল।
বাংলাদেশের নদী-নদী: ভবিষ্যৎ : আন্তর্জাতিক নদীসমূহের কোন কোনটির উজানের পানি প্রত্যাহারের ফলে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে বাংলাদেশে। ফারাক্কা বাঁধ ছাড়াও ভারতের উজানে নির্মিত তিস্তা মহানন্দা ব্যারেজের কারণে উত্তরাঞ্চলের নদীসমূহ শুষ্ক বালুচরে পরিণত হয়েছে। পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত সকল নদীর উজানে ভারত একতরফাভাবে বাঁধ নির্মাণ করায় সকল নদী নৌবাহন যোগ্যতা হারাচ্ছে। জেলার সীমান্তবর্তী তেঁতুলিয়া থানার শেষসীমান্ত বাংলাবান্ধা ইউনিয়নের বিপরীতে ভারতের ফুলবাড়ি এলাকায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তিস্তা মহানন্দা এবং করতোয়া নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করায় বিস্তীর্ণ এলাকা মরুভূমি হতে চলছে। আর সে কারণেই করতোয়াসহ চাওয়াই, কুরুম, হাতুড়ি, নাগর, টাঙ্গন, চিলকা প্রভৃতি নদীতে বর্ষা মৌসুমেও কোন পানি থাকে না। ভারত তাদের ব্যারেজে আটকানো পানি ফিডার ক্যানেলের সাহায্যে উত্তরবঙ্গের হলদিবাড়ি, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও বিহারে সেচ কার্য চালাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের অংশে নদীগুলো মুমূর্ষু অবস্থায় পৌঁছে গেছে। নদীগুলোকে আর নদীই মনে হয় না। এগুলোর স্থানে স্থানে গেলে মনে হবে যেন পগার বা ডোবা। আর বেশির ভাগই শুকনো।
এককালের প্রমত্তা ও খর¯্রােতা হামকুড়া নদী আজ মৃত। নদীটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় খুলনার ডুমুরিয়ার বিভিন্ন বিলের পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। ৬/২/৯৯ ভোরের কাগজে প্রকাশিত রিপোর্টে আরও প্রকাশ উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে, গজলডোবা ব্যারেজ দিয়ে প্রত্যাহারের ফলে তিস্তা আজ মৃতপ্রায়। ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলোর মৃত্যুর জন্য দায়ী। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির পর পদ্মায় পানি হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু অনেক কম। আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী চাহিদা মিটছে না বা মৃত নদীগুলো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে না। সংবাদপত্র আরও লিখেছে, পুনঃখননের উদ্যোগ নেই। ভরে গেছে সুনামগঞ্জের ১০ নদ-বৌলাই, সুরমা, রকতি, পাতইল, নলপুর, পুরান যাদুকাটা, ডাউক, ইটখোরা, সৌদায় ও পুরনো সুরমা। ১১/৪/৯৯ জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশ কুশিয়ারার উৎস মুখে ভারতের বরাক বাঁধ নির্মাণের প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সিলেট। এর প্রভাবে সিলেট অঞ্চল শুকনা মৌসুমে মরুভূমি এবং বর্ষাকালে বন্যায় ভেসে যাবে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের চাকমাঘাট এলাকায় খোয়াই নদীর ওপর ও ত্রিপুরার বিরাশি নামক স্থানে মনু নদীর ওপর দুটি বাঁধ ভারত তেরি করেছে। কুশিয়ারা নদীর তলদেশে পাথর ফেলে সম্প্রতি ভারত গ্রোয়েন নির্মাণ করেছে। যার ফলে নদীর পানি প্রবাহ পরিবর্তিত হয়ে বাংলাদেশ এলাকায় ব্যাপকহারে নদী ভাঙনের সৃষ্টি করছে। ব্রহ্মপুত্রকে নিয়ে চীনের ‘বিস্ফোরক’ পরিকল্পনা রয়েছে। চীন চাইছে, পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এই নদী প্রবাহ বদলে দিতে। গোবি মরুভূমিসহ চীনের উত্তর পশ্চিম এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের পানি সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা চীনের রয়েছে।
শেষ কথা
প্রকৃতিবাদীরা নদীকে তার আপন গতিতে ছেড়ে দিতে পক্ষপাতী। ইতোমধ্যে পশ্চিমা বিশ্বে নদীকে অতীতে ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা করছে। যেখানে নদী তার আপন গতিতে চলবে। মূল কথা হচ্ছে, প্রকৃতির কাছে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। রাইন নদীর বেশ কিছু এলাকা প্রকৃতির কাছে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কথা ভিন্ন। নদী শাসনের ফলে এবং উজানের পানি প্রত্যাহারের কারণে এখানকার অধিকাংশ নদী আজ মৃত অথবা মৃত প্রায়। অথচ এই নদীকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ মানুষের জীবিকা। এই নদীর তীরেই বসবাস করছে দেশের অধিকাংশ মানুষ। তাই আমাদের নদী নিয়ে ভাবতে হবে। নদীকে প্রকৃতির কাছে ছেড়ে দিতে হবে। কারণ আমাদের অর্থনীতি প্রচ-ভাবে নদী নির্ভর। নদী আমাদের কেবল বিপুল পরিমাণে গাঙ্গেয় সম্পদ জলজ পুষ্টি, বালি এবং পাথর দিয়েছে- তাই নয়, সে কর্মসংস্থান, যানবাহন, বাণিজ্যিক পরিবহন, পররাষ্ট্র বিষয়ক নীতিকে ভীষণবাবে প্রভাবাহিতও করেছে। তাই ভৌগোলিকভাবে নদীর কাছেই আমাদের সবচেয়ে বড় ঋণ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ