মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

রোহিঙ্গা নারীদের ওপর নিপীড়ন

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর সেদেশের সরকারি বাহিনী ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে। গতকাল দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, মিয়ানমারের সেনা ও পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রাখাইন রাজ্যের গ্রামে গ্রামে ঢুকে অস্ত্রের মুখে ভয়-ভীতি দেখিয়ে নারীদের শুধু ধর্ষণ করেনি, একইসঙ্গে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতনও চালিয়েছে। ধর্ষণ ও নির্যাতনের এই অভিযান চলেছে মাসের পর মাস ধরে, যার শুরু হয়েছিল গত বছর ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, অক্টোবর মাসের ৯ তারিখে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার দায় চাপানো হয় রোহিঙ্গাদের ওপর। একযোগে দেশটির সেনাবাহিনী শুরু করে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’।
সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম বলে দাবি করা হলেও বাস্তবে এই অপারেশন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার ভয়ংকর অভিযানের রূপ নিয়েছে। উদাহরণ উল্লেখ করতে গিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টে বলা হয়েছে, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে রাখাইন রাজ্যের মংড়ু জেলার অন্তত নয়টি জেলার গ্রামাঞ্চলে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে সেনা, পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, আক্রমণাত্মক দেহতল্লাশি এবং যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে। সরকারি বাহিনীগুলোর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী কর্মকা- চালানোর অভিযোগও তোলা হয়েছে রিপোর্টটিতে।
 উল্লেখ্য, নিজেরা ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে এমন নারীদের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শী অনেকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রিপোর্ট তৈরি করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এর গবেষকরা বলেছেন, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন চালানোর ব্যাপারে মিয়ানমারের সেনা, পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাহিনীর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তাদের সাম্প্রতিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সে ইতিহাসে নতুন একটি কালো অধ্যায় যুক্ত করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে ব্যর্থ হলে কিংবা ইচ্ছাকৃত অবহেলা দেখালে সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর কমান্ডারদের পাশাপাশি মিয়ানমার সরকারকেও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে। গবেষকরা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা রোহিঙ্গাদের ওপর বিরামহীন নির্যাতনের অভিযানকে ইতোমধ্যেই মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সুপারিশ অনুযায়ী কাজ করতে মিয়ানমার সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। সে কারণেই দেশটির রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নসহ সর্বাত্মক নির্যাতন চালানোর সাহস পেয়েছে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বলেই হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। এমন অবস্থায় নির্যাতন বন্ধ করার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে অনতিবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এ উদ্দেশ্যে ধর্ষণসহ সকল ধরনের নির্যাতন-নিপীড়নের ব্যাপারে স্বতন্ত্র ধারার একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু করার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। প্রকাশিত রিপোর্টে দায়ী সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এই রিপোর্টের কোনো বক্তব্যের সঙ্গেই ভিন্নমত পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। সে সুযোগ আসলে মিয়ানমারই রাখেনি। রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালানোর কারণ বা যুক্তি হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে গত বছরের অক্টোবরে কয়েকজন সেনা ও পুলিশ সদস্যের হত্যাকাণ্ডের কথা বলা হলেও বাস্তবে নিষ্ঠুর এ নির্যাতনের অভিযান চলছে দীর্ঘদিন ধরে। ২০১২ সালেও লাখের বেশি রোহিঙ্গা এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাস্তবে তারও অনেক আগে থেকেই রোহিঙ্গাদের সমূলে নির্মূল তথা উচ্ছেদ করার অভিযান চালানো হচ্ছে। গত বছর ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাতের লক্ষ্যে যে অভিযান শুরু হয়েছে তা সমগ্র বিশ্বকেই ক্ষুব্ধ ও স্তম্ভিত করেছে। দমন-নির্যাতনের সঙ্গে গণহত্যাও শুরু মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। একযোগে অভিযোগ উঠেছে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন চালানোর। শিশুদেরও ছাড় দিচ্ছে না সেনা ও পুলিশ সদস্যরা।
সমগ্র প্রেক্ষাপটেই হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এ রিপোর্টে উপস্থাপিত সুপারিশের সঙ্গে আমরাও একমত পোষণ করি। মিয়ানমার সরকারের উচিত আন্তর্জাতিকমানের ভিন্ন ধারার তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে গণহত্যা ও যৌন নির্যাতনের বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করে দোষী সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। দেশে ফিরিয়ে নেয়ার এবং নাগরিকত্ব দেয়ার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য সাংবিধানিক বিভিন্ন অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা মেনে করি, এটাই রোহিঙ্গাদের জন্মগত অধিকার। কারণ, রোহিঙ্গারা যুগ যুগ ধরে রাখাইন প্রদেশ তথা মিয়ানমারের আদিবাসী। তাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন চালানোর এবং দেশ থেকে বিতাড়িত করার কোনো অধিকার নেই মিয়ানমারের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ