শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খাত উপখাতে ব্যাংকের চার্জ কর্তন গ্রাহকের স্থিতির হিসাবও মিলছে না

স্টাফ রিপোর্টার: গ্রাহকের উপর আরোপিত বিভিন্ন খাত উপখাতের চার্জ নিয়ে উচ্চ মুনাফা গুনছে ব্যাংকগুলো। হিডেন চার্জ নামে এসব খরচের কথা অনেক গ্রাহক জানেনই না। অনেকেই ব্যাংকের নিজ আমানতের স্থিতির হিসাব নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। পাস বই আর চেক বইয়ের হিসেবে ধরা পড়েছে চার্জ নামের এই খরচের প্রার্থক্য ও অনেক গ্রাহক ব্যাংকে গিয়ে তার খরচের ব্যাখ্যাও চাইছেন।       
ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি ও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে গেল ২০১৬ সাল জুড়েই আলোচনার শীর্ষে ছিল দেশের ব্যাংকিং খাত। এর মধ্যেও ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার এ প্রবৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা রেখেছে আমানতের নিম্নসুদ ও গ্রাহকদের ওপর আরোপিত বিভিন্ন চার্জ থেকে পাওয়া সুদবহির্ভূত আয়।
জানা গেছে, ২০১৬ সালে দেশের বেসরকারি খাতের অধিকাংশ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার প্রবৃদ্ধি ৩০-৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এক্ষেত্রে রেকর্ড ২ হাজার ৩ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা নিয়ে সবার শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক ১ হাজার ১২৮ কোটি, ব্র্যাক ৯২২ কোটি, সাউথইস্ট ৮৬৩ কোটি, ইউসিবি ৮৫০ কোটি, সিটি ৭৬০ কোটি, আল-আরাফাহ ৭৫৪ কোটি, এক্সিম ৬৯০ কোটি, প্রাইম ৬২৫ কোটি, ডাচ্-বাংলা ৬৩০ কোটি, এসআইবিএল ৬২০ কোটি, মার্কেন্টাইল ৫০৮ কোটি, ট্রাস্ট ৫০১ কোটি, এবি ৫৮০ কোটি ও ওয়ান ব্যাংক ৫৭০ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা করেছে। উল্লেখিত সব ব্যাংকই পরিচালন মুনাফায় ২০১৫ সালের তুলনায় সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি করেছে। পরিচালন মুনাফার প্রবৃদ্ধিতে চমক দেখিয়েছে অন্য ব্যাংকগুলোও।
সুদবহির্ভূত আয়ই ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার এ প্রবৃদ্ধিতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী। তিনি বলেন, পুরো ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হলেও ব্যাংকগুলোর সুদবহির্ভূত আয় বাড়ছে। এমন অনেক সেবা রয়েছে, যার জন্য ১ টাকা খরচ না হলেও ব্যাংকগুলো ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চার্জ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের গড় সুদহার ছিল ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০১৬ সালের নভেম্বরে তা নেমে আসে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশে। সে হিসাবে এ সময়ে আমানতের গড় সুদহার কমেছে ১ দশমিক ৯৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।
যদিও ব্যাংকিং খাতে স্প্রেডের (ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান) সেভাবে কমেনি। স্প্রেডের হার ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও অনেক ব্যাংকের ক্ষেত্রেই তা নির্দেশিত সীমার বেশি রয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংক আমানতের বিপরীতে ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ হারে সুদ দিলেও ঋণের বিপরীতে সুদ নিচ্ছে ১২ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ হিসাবে ব্যাংকটির স্প্রেড এখনো ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া ৫ শতাংশের বেশি স্প্রেড রয়েছে ডাচ্-বাংলা, প্রিমিয়ার, আইএফআইসি, উত্তরা, ইস্টার্ন, এবি, ইউনিয়ন, ওয়ান, মেঘনা ও এনআরবি ব্যাংকের। বিদেশী ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের স্প্রেডের হার ৮ দশমিক ৭৩, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ৫ দশমিক ৬৮, সিটিব্যাংক এনএর ৫ দশমিক ৭০, উরি ব্যাংকের ৬ দশমিক ৩৮, এইচএসবিসির ৬ দশমিক ২৫ ও ব্যাংক আল-ফালাহর ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, আমানতের সুদ যে হারে কমানো হয়েছে, ঋণের সুদ সে হারে কমানো হয়নি। ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা বৃদ্ধিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গত বছর বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো মানসম্মত ঋণ বিতরণ করেছে। ফলে সুদ থেকে ব্যাংকগুলোর আয় বেড়েছে। এছাড়া ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলো সংযত ছিল বলে আমি মনে করি। বিশেষ করে সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় কমেছে।
আমানতের সুদহার কমানো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নয় জানিয়ে সাবেক এ গভর্নর বলেন, আমানতকারীদের অর্থেই ব্যাংক চলে, এ সত্য ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা যেন না ভোলেন। ব্যয় কমাতে ব্যাংকগুলোকে মন্দঋণ কমিয়ে আনতে হবে। এর মাধ্যমে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের পরিমাণও কমবে। এছাড়া বাহুল্য ব্যয় কমিয়ে পরিচালন ব্যয়ে লাগাম টানলে ব্যাংকের নিট মুনাফা বাড়বে।
তবে আমানতের সুদহার কমানোকে ব্যাংকিং খাতের পরিচালন মুনাফা বৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে মনে করেন না বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা। তিনি বলেন, গত বছর ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার কমানোর পাশাপাশি ঋণের সুদহারও কমিয়েছে। ফলে বছরটিতে স্প্রেডের হার কমেছে। আমাদের অর্থনীতি বড় হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ও শিল্পায়নও বেড়েছে। ব্যাংকগুলোর নতুন বিতরণকৃত ঋণের আদায় ভালো হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ব্যাংকগুলো তাদের প্রডাক্ট বাড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর অ্যাকাউন্টের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। নতুন চালুকৃত অ্যাকাউন্ট থেকে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়। এছাড়া উন্নত প্রযুক্তির কারণে ব্যাংকের পরিধি বাড়লেও লোকবল বাড়াতে হয়নি। এসব কারণেই দেশের ব্যাংকিং খাতে পরিচালন মুনাফা বেড়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ