শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

খালেদা জিয়ার অনাস্থার আবেদন নাকচ

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিচারকের প্রতি অনাস্থা দিয়েছেন আইনজীবীরা। তবে আবেদনটি নামঞ্জুর করা হয়েছে। একইসাথে মামলা মুলতবি করার আবেদনও নাকচ করেছেন আদালত। গতকাল  বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার বকশীবাজার আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত তৃতীয় বিশেষ জজ আবু আহমেদ জমাদারের আদালতে বেলা ১১টা ২৫ মিনিটে খালেদা জিয়া উপস্থিত হন। এ দিন আইনজীবীরা এই আদালতে ন্যায়বিচার পাবেন না বলে বিচারকের প্রতি অনাস্থা দেন।
এদিন বিচারক আবু আহমেদ জমাদার বেগম খালেদা জিয়ার  বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও ৩২ জন সাক্ষীর জবানবন্দী পড়ে শুনান। এ সময় বিচারক খালেদা জিয়াকে প্রশ্ন করেন আপনি দোষী না নির্দোষ। তখন খালেদা জিয়া বলেন, আমার আইনজীবীরা আপনার প্রতি অনাস্থা দিয়েছেন। আমিও আনুষ্ঠানিকভাবে আপনার প্রতি অনাস্থা দিলাম। আপনি জোর করে আত্মপক্ষ সমর্থন করছেন। তা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। তিনি বলেন, আমি এখন কোনো বক্তব্য দেবো না, যা বক্তব্য আছে তা কাগজ (নকল) তুলে দেবো।
এ ব্যাপারে আদালত আদেশে বলেন, এ মামলার অভিযোগ গঠন হয়েছে প্রায় তিন বছর হতে চলল। দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক আইন অনুযায়ী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে হয়। মামলার শেষ পর্যায়ে এসে এ ধরনের আবেদনের সুযোগ নেই। তাই আবেদন নামঞ্জুর করা হলো এবং মুলতবি করার আবেদন নাকচ করা হলো। এদিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি ওই দুই মামলার পুনঃতদন্তেরও দাবি জানিয়ে খালেদা জিয়ার করা আবেদনের শুনানির দিনও ছিল গতকাল বৃহস্পতিবার।
গতকাল সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে নিজ বাসভবন থেকে রওনা দেন খালেদা জিয়া। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আদালতে পৌঁছান বলে জানান বিএনপির চেয়ারপার্সনের প্রেস উইং কর্মকর্তা শামসুদ্দিন দিদার।  খালেদা জিয়া আসার আগেই বিএনপির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা ও তার আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত হন।
বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার আবেদনের বিষয়ে তার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন ও সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, পূর্বনির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের ওপর শুনানি শুরু হয়। শুনানির আগেই আমরা আদালতকে জানিয়েছি, পুনঃতদন্তের বিষয়টি আগে নিষ্পত্তি করা হোক। আদালত আবেদনটি গ্রহণ না করে আত্মপক্ষ সমর্থনের ওপরেই শুনানি করতে চাইছেন। যদি আত্মপক্ষ শুনানি শুরু হয়ে যায়, তাহলে মামলা পুনঃতদন্তের বিষয়টির গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। তাহলে তো মামলা শেষই হয়ে যাবে। আর এ কারণেই ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা করছি। খালেদা জিয়ার পক্ষে আবদুর রেজাক খান, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নাল আবেদীন, জাকির হোসেন শুনানিতে অংশ নেন।
রাষ্ট্রপক্ষে অংশ নেন দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। এ সময় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবির রিজভীসহ একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন।
খালেদার আগমনকে কেন্দ্র করে গতকাল সকাল থেকেই আদালত পাড়া এলাকায় নেয়া হয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যারা ভেতরে ঢুকছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের তল্লাশি করেন।
এর আগে গত সোমবার মামলাটি পুনরায় তদন্ত করতে আবেদন করেন বেগম জিয়ার আইনজীবীরা। সময়ের আবেদন দাখিল করেন খালেদা জিয়া। আদালত সময়ের আবেদনটি শুনানির জন্য গতকাল (বৃহস্পতিবার ) দিন ধার্য করেছিলেন।
তারেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা : দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল মামলার আসামী খালেদা ও তারেকের জামিন বাতিলের আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এদিন মামলার আসামী মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
 আইনজীবীদের বাধা দেয়ার অভিযোগ : পুরান ঢাকার বকশিবাজারে আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার হাজিরা দেয়ার সময় তার আইনজীবীদের প্রবেশ করতে বাধা দেয়ার অভিযোগ ওঠে।  বিচারক আদালতে আসলে বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বিচারকের কাছে এই অভিযোগ দেন।
এজলাসে বসার পর খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বিচারককে বলেন, আদালতে প্রবেশের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের বাধা দিয়েছে। এমনকী মামলার কাগজপত্রসহ গাড়ি প্রবেশ করতে দেয়নি। তখন বিচারক বলেন, আদালতের ভেতরে কিছু হলে সেটা আমার দেখার বিষয়। বাইরে কোনো কিছু হলে সেটা আমার দেখার বিষয় না। কারণ নিরাপত্তার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কাজ করেন।
এ সময় আইনজীবী রেজাক আলী আদালতের উদ্দেশে বলেন, অতীতে বিভিন্ন সময় আইনজীবীদের বাধা দেয়া হলে আদালত তাতে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল এবং আদালতের পক্ষে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে।
পরে বিচারক বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনে আমার গাড়িও তল্লাশি করতে পারবে। কিন্তু বিজ্ঞ আইনজীবীদের যাতে সম্মানহানি না হয় সে ব্যাপারে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সচেষ্ট থাকার নির্দেশ দেন। বলেন, এখানে অনেক সম্মানিত ব্যক্তি আসেন। আমাদের যতটুকু ধারণ ক্ষমতা আছে ততক্ষণ তারা আসবেন। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক।
২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক হারুন অর রশিদ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।
মামলার অপর আসামীরা হলেন- খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।
জিয়া আরফানেজ ট্রাস্ট মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক।
২০১০ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপ-পরিচালক হারুন আর রশীদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়। মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামীরা হলেন মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ