বুধবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

ধুলার যন্ত্রণায় অসহায় নগরবাসী 

ধুলার যন্ত্রণায় অসহায় নগরবাসী
  • ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি
  • ফ্লাইওভার নির্মাণ, রাস্তাঘাট সংস্কারে নিয়ম-নীতি নেই
  • পানি ছিটানোর সামর্থ্য নেই ডিসিসির 

কামাল উদ্দিন সুমন : দুই শিশু কন্যা তিথি আর তিন্নিকে নিয়ে মালিবাগ রেলগেট থেকে একটু সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে ফৌজিয়া নাজ। যাবেন শান্তিনগর একটি বিপণি কেন্দ্রে। চোখে মুখে তার বিষণœতা আর বিরক্তির চাপ। এক হাতে নাকেমুখে কাপড় গুঁজে আছে আর অন্য হাতে ওড়নার আঁচল দিয়ে শিশুকন্যাদের ঢেকে রাখছেন। চারদিকে সমানে উড়ছে ধুলাবালু। কড়া রোদেও সবকিছু ঝাপসা দেখছেন তিনি। আক্ষেপ করে বলেন, ঢাকার শহরে এভাবে চলা যায়? ধুলার যন্ত্রণায় আমরা অতিষ্ঠ। বাসা থেকে বের হলেই রাস্তায় চলাফেরা দায়। নাকে মুখে ধুলা যাচ্ছে। ধুলার আস্তরণ পড়ে যাচ্ছে শরীরে। ধুলার কারণে রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধুলার রাজত্বে নগরবাসী অসহায়। একদিকে বেড়েছে ভোগান্তি অন্যাদকে বেড়েছে রোগবালাই। নগরীর বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ, রাস্তা সংস্কার এবং তিতাস ও ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়িসহ নানা করণে বেড়েছে ধুলার রাজত্ব। এতে পথচারীসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে জটিল ও কঠিন রোগের আশঙ্কা। 

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধুলাদূষণে মানুষের শরীরে চুলকানি, শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যান্সার, ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি ও যক্ষ্মাসহ নানা জটিল ও কঠিন রোগ দেখা দিচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় ধুলাদূষণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা।

রাজধানীর মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের স্থান ঘুরে দেখা গেছে, ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে রাস্তায় ব্যাপক ধুলাবালি উড়ছে। ধুলা নিয়ন্ত্রণে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ম-কানুন মেনে চলার নির্দেশ থাকলেও তারা এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এছাড়া নগরীর বাবুবাজার, নয়াবাজার, রায়েরবাজার, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, নীলক্ষেত, সায়দাবাদ, গুলিস্তান, মালিবাগ, মৌচাক ও কাকরাইলসহ রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায়ই এখন ধুলার অত্যাচার চলছে। 

গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রচুর ধুলাবালির কারণে যাত্রী, চালক, হেলপাররা মুখে মাস্ক পরে চলাচল করছেন। বাবুবাজার থেকে গাবতলী সড়কটিতে চলাচলের সময় এত পরিমাণ ধুলা পড়ে যে মানুষের শরীর এবং পোশাকের সত্যিকার রংই বোঝা যায় না। 

 খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে,রাজধানীর যেসব এলাকার সড়ক ভাঙাচোরা ওইসব এলাকার সড়কে ধুলাবালির পরিমাণ বেশি। অভিজাত আবাসিক এলাকা গুলশান, বনানী, উত্তরা, ধানমণ্ডির অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। সড়কগুলো ঝাড়ু দেয়া হচ্ছে না, ছিটানো হচ্ছে না পানি। 

সূত্র জানায়, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ভবন নির্মাণ, ভবন ভাঙা, রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারসহ বিভিন্ন কাজ নিয়ম অমান্য করে সম্পন্ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া নির্মাণসামগ্রী, পরিবহন এবং সিটি কর্পোরেশনের আবর্জনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণের সময়ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় ধুলা বাড়ছে। 

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন ধরনের দূষণের মধ্যে ধুলাদূষণের অবস্থান শীর্ষে। এর কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতির প্রভাব বাড়ছে। জীবাণু মিশ্রিত ধুলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি।

গবেষণায় দেখা গেছে, ধুলার কারণে রাজধানী ঢাকাবাসী মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের প্রতি মাসে কমপক্ষে ৪ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এর কারণে পরিধেয় কাপড়-চোপড়সহ ঘরের আসবাবপত্র ধুলায় ভরে যায়। এগুলো পরিষ্কার করতে উল্লেখযোগ্য সময় ও অর্থ নষ্ট হয়। এতে পানি ও বিদ্যুতেরও অপচয় বাড়ে। এজন্য পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় একটি কার্যকর আইন প্রণয়নের দাবিও জানায় প্রতিষ্ঠানটি। 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, রাস্তায় যে পরিমাণ ধুলা হয় তা বন্ধ করা সম্ভব নয়। আগে বন্ধ করতে হবে ধুলা যে কারণে উৎপত্তি হয়। তিনি জানান বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া পানি ছিটানোর সামর্থ্য নেই আমাদের। এটা করা হয়ে থাকে স্থানীয়দের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। তবুও আমরা প্রতিদিন কোথায়ও কোথায়ও পানি ছিটাচ্ছি। তবে সড়ক পরিষ্কার কার্যক্রম যথানিয়মে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড.আতিকুর রহমান জানান, ধুলাদূষণের কারণে দিন দিন স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মূলত শহরাঞ্চলের অধিকাংশ রোগীই ধুলাদূষণের রোগী। চিকিৎসার সাহায্যে এসব রোগ সেরে উঠলেও এ থেকে খুব সহজে মুক্তি পাওয়া কঠিন। আর এসব রোগের ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ে।

বাপার সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন জানান, অস্বাভাবিকভাবে ধুলাদূষণ বেড়েছে। এর ফলে বাড়ছে নানা জটিল ও কঠিন রোগব্যাধি। বাড়ছে দৈনন্দিন ব্যয়। ধুলাদূষণ বন্ধে নাগরিক সচেতনতা তৈরির জন্য সরকার, বেসরকারি সংগঠন ও সচেতন মহলকে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি বলেন, ধুলাদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তার উৎসগুলোকে বন্ধ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে নতুন করে আইন প্রণয়ন করা যেতে পাবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ