শুক্রবার ২০ মে ২০২২
Online Edition

মুসলিম নিষেধাজ্ঞায় পররাষ্ট্র দফতরে অসন্তোষ ॥ ৯০০ কর্মীর স্মারকলিপি

সংগ্রাম ডেস্ক : সাতটি দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের অভ্যন্তরেও। এরইমধ্যে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে একটি অভ্যন্তরীণ আপত্তি স্মারলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন পররাষ্ট্র দফতরের প্রায় ৯০০ কর্মকর্তা। ওই স্মারকের ব্যাপারে জানাশোনা রয়েছে এমন এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স খবরটি জানিয়েছে।
উল্লেখ্য,গত শুক্রবার এক নির্বাহী আদেশে তিন মাসের জন্য ৭ মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে স্থগিতাদেশ দেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলা হয়, এ সাত দেশের নাগরিকরা তিন মাস যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই আদেশে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের ক্ষেত্রে মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মুসলিমদের বদলে খ্রিস্টান ও সংখ্যালঘুদের প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হয়। রয়টার্স, দ্য হিল, পার্সটুডে।
নির্বাহী আদেশের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হয় মুসলমানরা। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। সংস্কৃতি কর্মীরা এর প্রতিবাদ জানান। নোবেল বিজয়ী শিক্ষা অধিকারকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিষ্ঠাতা, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ট্রাম্পের এ নিষেধাজ্ঞাকে মুসলিমবিরোধী নিষেধাজ্ঞা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, পররাষ্ট্র দফতরের অভ্যন্তরেই ট্রাম্পের এ আদেশের ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে। পররাষ্ট্র দফতরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানায়, ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম শ্যাননের কাছে প্রায় ৯০০ কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি জমা দেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র দফতরের ডিসেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে ওই স্মারকলিপি জমা দেয়া হয়। ‘ডিসেন্ট চ্যানেল’ একটি আনুষ্ঠানিক ফোরাম, যেখানে কর্মচারীরা তাদের ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন এবং কোনও নীতি নিয়ে তাদের অসন্তোষ জানাতে পারেন।
 সোমবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র শন স্পাইসার জানিয়েছিলেন, ওই স্মারকলিপির ব্যাপারে তিনি জানেন। সেসময়, কূটনীতিকদের হুঁশিয়ারও করেন তিনি। বলেছিলেন, ‘হয় এ কর্মসূচির সঙ্গে তাদের থাকতে হবে, নয়তো তারা যেতে পারে’।
ওই আপত্তি স্মারকলিপিটির একটি খসড়া হাতে পাওয়ার দাবি করে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে তিক্ত করবে, আমেরিকান-বিরোধী মনোভাব তৈরি করবে এবং যারা মানবিক কারণে যুক্তরাষ্ট্র সফর করতে চেয়েছিলেন তাদের মনে আঘাত লাগবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অভিবাসন ইস্যুতে নির্বাহী আদেশ ইস্যু করার আগে পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তাদের মাঝে একটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। নাম প্রকাশ না করে পররাষ্ট্র দফতরের এক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে পারেন এমন গুঞ্জনে সে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
পররাষ্ট্র দফতরের শীর্ষস্থানীয় চার কর্মকর্তার পদত্যাগের কারণেও কূটনীতিকদের মধ্যে খানিকটা অসন্তোষ রয়েছে।
ট্রাম্পের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় নিজেকে নিরাপদ ভাবেন মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মার্কিনি
সাত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের ওপর যে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাতে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক নিজেকে আগের চেয়ে নিরাপদ মনে করছেন বলে এক জনমত জরিপে জানা গেছে।
গত শুক্রবার এক নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প ইরান, ইরাক, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
জানুয়ারির ৩০ ও ৩১ তারিখে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স/ইপসোস-এর পক্ষ থেকে চালানো ওই জনমত জরিপটি প্রকাশিত হয় মঙ্গলবার। এতে দেখা যায়, জঙ্গিবাদ থেকে মার্কিন জনগণকে রক্ষার দাবিতে সাত মুসলিম দেশের ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা ১২০ দিনের ওই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাকে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৪৯ শতাংশই সমর্থন করছেন। তবে দলগত বিচারে তাদের মতামতের পার্থক্য স্পষ্ট বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
ওই জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৩১ শতাংশ মনে করেন যে, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় তারা আগের চেয়ে নিরাপদে রয়েছেন। ২৬ শতাংশ মনে করছেন, তারা আগের চেয়েও অনিরাপদ হয়ে পড়েছেন। তবে ৩৩ শতাংশের মতে, ওই নিষেধাজ্ঞায় কোনও পরিবর্তন আসবে না।
জরিপে অংশগ্রহণকারী ডেমোক্র্যাটদের ৫৩ শতাংশ ট্রাম্পের ওই নির্বাহী আদেশের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেন। অপরদিকে, রিপাবলিকানদের ৫১ শতাংশ ট্রাম্পের সঙ্গে  একাত্মতা জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের ওই নিষেধাজ্ঞায় কয়েকজন রিপাবলিকান নেতাও ভিন্নমত জানিয়েছেন। অ্যারিজোনার সিনেটর জন ম্যাককেইন ও সাউথ ক্যারোলিনার লিন্ডসে গ্রাহাম এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ওই নির্বাহী আদেশ এই বার্তাই প্রকাশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশে আসা মুসলিমদের গ্রহণ করতে চায় না।’
ওই জনমত জরিপে দেখা যায়, বেশিরভাগ মার্কিনিই দেশে মুসলিম শরণার্থীদের স্বাগত না জানিয়ে খ্রিস্টানদের স্বাগত জানানোর বিরোধী। ৭২ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ও ৪৫ শতাংশ রিপাবলিকানসহ মোট ৫৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী এই মতামত জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, সাত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি শরণার্থী কর্মসূচি চার মাসের জন্য স্থগিত করেছেন ট্রাম্প। তবে সব শরণার্থীর বেলায়, কর্মসূচি স্থগিতের মেয়াদ নির্দিষ্ট ৪ মাস হলেও সিরিয়ার ক্ষেত্রে এই মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের। ওই আদেশে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়ের ক্ষেত্রে মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মুসলিমদের বদলে সেখানকার খ্রিস্টান ও সংখ্যালঘুদের প্রাধান্য দেয়ার কথা বলা হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবশ্য একে মুসলিম-বিদ্বেষ বলতে নারাজ। এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে এ নিষেধাজ্ঞা মুসলিম নিষেধাজ্ঞা নয়, মিডিয়া মিথ্যাচার করছে। এর সঙ্গে ধর্মের সংযোগ নেই এটি সন্ত্রাস দমন এবং আমাদের দেশকে নিরাপদ রাখার বিষয়।’
ট্রাম্পের বিচারপতি নিয়োগের বিরোধিতায় ডোমোক্রেটিক পার্টি
সাবেক মার্কিন বিচারপতি অ্যান্থনি স্ক্যালিয়ার স্থানে নেইল গোরসাচকে নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গোরসাচকে নিয়োগ দেয়ার পর তার নীতি ও দর্শন নিয়ে চলছে সমালোচনা। যেখানে রিপাবলিকানরা গোরসাচকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সেখানে এই নিয়োগের ঘোর বিরোধিতা করছেন ডেমোক্রেট আইনপ্রণেতাগণ।
গোরসাচকে বিচারপতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার আগে ট্রাম্প বলেন, ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সংবিধানের উপর অনুগত একজনকেই তিনি বিচারপতি পদে নিয়োগ দিবেন।’ অন্যদিকে মার্কিন সিনেটের ডেমোক্রেট দলের নেতা চালর্স স্কেমার বলেন, ‘আইনতভাবে গোরসাচ বিচারপতি নিয়োগ পেতে পারেন কি না এটি নিয়ে যৌক্তিক সন্দেহ রয়েছে।’ উল্লেখ্য এর আগে গোরসাচ দুনীর্তির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। যদিও এরপর তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। সিনেটর শ্যারল্ড ব্রাউন এই নিয়োগের ঘোর বিরোধিতা করছেন।
গোরসাচকে বিচারপতি পদের জন্য মনোনীত করা মার্কিন প্রশাসনে রিপাবলিকানদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অংশ বলে মনে করছেন সমালোচকরা। সিনেটের সংখ্যালঘু দলের সদস্য ন্যান্সি পেলোসি সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীকে ‘শত্রুভাবাপন্ন নিয়োগ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,‘এটি একটি খারাপ সিদ্ধান্ত।’
গোরসাচকে ‘মূলধারার রক্ষণশীল’ বলে অভিযোগ করছেন ডেমোক্রেটরা। তিনি রক্ষণশীল বিচারক বিল পায়রকেও ছাড়িয়ে যাবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পায় সমকামীরা অধিকার, গর্ভপাত আইনের বিপক্ষে রায় দিয়েছিলেন।
ডোমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা এলিজাবেথ ওয়ারেন বলেন, কর্পোরেশন, নারী অধিকার, নাগরিক অধিকার সম্পর্কে গোরসাচের মানসিকতা ইতিবাচক নয়। তিনি শ্রমিকদের বিপরিতে বড় বড় কোম্পানিগুলোকে সুবিধা দিবেন। তিনি শ্রমবৈষম্য সৃষ্টি করবেন এবং সাধারণ স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় নারীদের সুবিধা গ্রহণের বিপক্ষে রায় দিবেন। উল্লেখ্য, গোরসাচ ব্যক্তিগতভাবে ‘লিবারেল’দের ঘোর বিরোধী। তিনি বলেন, এই পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সকল নাগরিকদের অধিকারে সচেতন একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। যিনি নাগরিক অধিকার, নারী অধিকার, সমকামী অধীকার এবং আমাদের আইনের রক্ষক হিসেবে কাজ করবেন। আমাদের এমন কোন বিচারকের দরকার নেই যিনি অর্থ এবং প্রভাব বিস্তারে ঝুঁকবেন। ট্রাম্প ঐক্যমতের ভিত্তিতে বিচারপতি নিয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
সিনেটের সংখ্যালঘু দলের সদস্য চুক স্কেমার এই নিয়োগের বিষয়ে উদ্বিগ্নতা ব্যক্ত করেছেন। মার্কিন সিনেটর জেফ মার্কলি বলেন,‘ ট্রাম্প অনৈতিক এবং সহিংস একজনকে বিচারক নিয়োগ দিয়েছেন। এটি একটি চুরি করা পদ।’ মার্কিন সিনেটে ৫২টি আসন রিপাবলিকানদের, অর্থাৎ ৮ জন ডেমোক্রেট সদস্যের ভোট পেলেই গোরসাচ চূড়ান্ত মনোনায়ন পাবেন।
 যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানিয়েছে হ্যাকার গোষ্ঠী অ্যানোনিমাস
১ ফেব্রুয়ারি, পার্স টুডে : যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানিয়েছে হ্যাকার গোষ্ঠী অ্যানোনিমাস। মার্কিন পণ্য বর্জন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পুঁজি প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপর কথা জানানো হয়েছে তাদের প্রতিবাদে। পাশাপাশি ‘হোয়াইট হাউজ কমেন্ট লাইন’ নামের ওয়েব পেইজে মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় দফতর এবং আবাসিক ভবন হোয়াইট হাউজের সরাসরি অনেক টেলিফোন নম্বর প্রকাশ করেছে তারা।
ইউটিউবে প্রকাশিত ভিডিওতে অ্যানোনিমাস বলেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং সভ্য আচরণের প্রতি সামান্যতম সম্মানও দেখানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। হ্যাকারগোষ্ঠীটি বিশ্বের সব সম্প্রদায়কে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসা বর্জন করার এবং ট্রাম্পের সহযোগীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বানও জানিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ