শুক্রবার ২০ মে ২০২২
Online Edition

সাজা দিয়ে নেতাদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : মামলা আতংকে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বিএনপি। সিনিয়র নেতাদের প্রায় সবার বিরুদ্ধেই একাধিক মামলা রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এসব মামলায় সাজা দিয়ে সরকার সিনিয়র নেতাদের প্রার্থী হতে অযোগ্য ঘোষণা করার ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে বিএনপির পক্ষ থেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিম্ন আদালতের সাজা আপিলে বহাল হলে সংশ্লিষ্টদের কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। সিনিয়র আইনজীবীদের মতে, এসব মামলা দ্রুত বিচারের জন্য যদি কোনো পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ করা না হয়, তবে ৫ থেকে ৭ বছরের আগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে না। সে ক্ষেত্রে দলের নেতারা সহজেই আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন। কিন্তু সরকার যেভাবে রাজনৈতিক মামলাগুলোকে প্রাধাণ্য দিচ্ছে তাতে বিএনপির অনেক নেতাকেই নির্বাচনের বাইরে থাকতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, দলের চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দুটি মামলার বিচার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার মামলার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার সাজা হওয়ায় আগামী নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় কমিটি এবং স্থায়ী কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় দ্রুত চার্জশিট দেয়া হচ্ছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালেও অনেক মামলার বিচার চলছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর দায়ের করা মামলা নিয়েও নেতারা উদ্বিগ্ন। উচ্চ আদালতে স্থগিত ওই মামলাগুলো ফের চালু হচ্ছে। এ ছাড়া আরও কিছু মামলা চালুর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করে বলেন, সরকার বিএনপির নেতাদের বিভিন্ন মামলায় দ্রুত সাজা দেয়ার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সাত বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। চেয়ারপার্সনের মামলাগুলোর কার্যক্রমও দ্রুত শেষ করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দলের সিনিয়র নেতাদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে যাতে বিএনপি অংশ নিতে না পারে সে জন্যই সরকার তাড়াহুড়ো করে মিথ্যা মামলায় সাজা দিতে চাচ্ছে। তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় যে নীলনকশা হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতা চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সফল হতে পারবে বলে মনে হয় না।
বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র নেতাদের নামে দায়ের করা মামলার কার্যক্রম সরকার দ্রুতগতিতে শেষ করতে চাচ্ছে। সিনিয়র অনেক নেতার নামে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো মামলার সাক্ষ্য গ্রহণও শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসব মামলার দ্রুত বিচার নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে শংকা তৈরি হয়েছে। সরকার বিএনপিকে মামলার ফাঁদে ফেলতে চাচ্ছে। মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে নেতাদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে।
বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পাদক মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, শুধু খালেদা জিয়া নয়, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র অনেক নেতার মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকার যেভাবে আদালতকে ব্যবহার করছে তাতে আগামী নির্বাচনের আগে অনেকের মামলার রায় দেয়া হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সে ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। আপিল দ্রুত শেষ করে সাজা বহাল থাকলে যে কেউ নির্বাচনে অযোগ্য হতে পারেন। তাই মামলা নিয়ে যথেষ্ট শংকা রয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে আপিল চলাকালে নি¤œ আদালতের সাজা স্থগিত থাকে। আপিলের রায়ের আগেই যদি নির্বাচন হয় তবে এতে অংশ নিতে কারও কোনো বাধা থাকবে না।
সূত্র জানায়, অর্থ পাচার মামলায় সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাত বছর সাজা হওয়ায় আগামী নির্বাচনে অংশ নেয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দেশে এসে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার পর রায় স্থগিত হলেই শুধু নির্বাচন করার যোগ্য হবেন তিনি। অন্যথায় তিনি নির্বাচনে অযোগ্য বিবেচিত হবেন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলা বিচারাধীন। জিয়া চ্যারিটেবল ও ট্রাস্ট ছাড়াও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায়ও তিনি আসামি। সেই মামলাটিও দ্রুতগতিতে চলছে। সব মিলিয়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে।
একাধিক পরোয়ানা নিয়ে আত্মগোপনে আছেন দলের একাধিক নেতা। কিন্তু আগামী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে অনেকেই ওইসব মামলায় জামিন নিতে শুরু করেছেন। আত্মসমর্পণের জন্য উপস্থিত হলে অনেককে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠান আদালত। সর্বশেষ ৪০ মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে দলের যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি শরিফুল আলমকেও জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠান আদালত।
খালেদা জিয়ার মামলা : তারেক রহমানের সাজার পর খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে নেতাকর্মীরা চিন্তিত। ওয়ান-ইলেভেনের সময় জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট, গ্যাটকো দুর্নীতি, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি ও নাইকো দুর্নীতিসহ সাতটি মামলা দেয়া হয় দলের চেয়ারপারসনের নামে। বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় নাশকতার নির্দেশদাতা হিসেবেও তার নামে মামলা দেয়া হয়। সব মিলিয়ে ২৩টি মামলার আসামি খালেদা জিয়া। এর মধ্যে ১৫টি মামলার কার্যক্রম চলছে বিভিন্ন আদালতে। তার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার কার্যক্রমও শেষ পর্যায়ে। ইতিমধ্যে বাদীপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। চলছে খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি। জিয়া অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়ার ‘সাজার’ আশংকা করছেন দলের আইনজীবীসহ নেতাকর্মীরা। সাজা হলে খালেদা জিয়াও কি নির্বাচনে ‘অযোগ্য’ হবেন এমন প্রশ্ন তাদের মাঝে। তবে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী নি¤œ আদালতে সাজা হলেও তার আগামী নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, জিয়া অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় চেয়ারপার্সনের সাজা হলেও নির্বাচনে অযোগ্য হবেন না। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির কমপক্ষে দু’বছর সাজা হলে এবং উচ্চ আদালতও ওই সাজা বহাল রাখলেই কেবল তিনি নির্বাচনের অযোগ্য হবেন। কিন্তু উচ্চ আদালতে আপিল চলাকালে নিন্ম আদালতের সাজার কার্যকারিতা স্থগিত থাকে। তাই আপিল চলাকালে নির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকে না। ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক এ সভাপতি আরও বলেন, খালেদা জিয়াসহ সিনিয়র নেতাদের নামে মামলা দিয়ে সরকার বিএনপিকে চাপে রাখতে চাচ্ছেন। বিরোধীদের দমন করতে তারা আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪ হাজার ৫৫১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অন্তত ২ লাখ ২৩ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৫ সালে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে চলা আন্দোলনেও নেতাদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দেয়া হয়। সব মিলিয়ে সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার মামলা দেয়া হয়েছে। এসব মামলায় নামে ও বেনামে প্রায় আট লাখের মতো আসামি রয়েছে।
ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসির) সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা এক ডজনের ওপরে। কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে। খোকা বর্তমানে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্র আছেন। দুর্নীতির একটি মামলায় তাকে ১৩ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। দেশে না থাকায় তিনি উচ্চ আদালতে আপিলও করতে পারেননি। উচ্চ আদালত থেকে সাজা স্থগিত না হলে বা নিজে এসে আপিল করতে না পারলে আগামী নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।
ফখরুলসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যের মামলা : বিএনপি, আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে ৮৫টি মামলা আছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে কয়েকটি মামলার বিচারকার্যও শুরু হয়েছে। সব মামলাতেই তিনি জামিনে আছেন। এসব মামলায় সপ্তাহে দু’দিন তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে বর্তমানে ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সময়ে ৮টি এবং বর্তমান সরকারের আমলে ৩টি মামলা করা হয়েছে। মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে দুদকের করা মামলায় তিনি গ্রেফতার হয়ে জেলও খাটেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় করা মামলাগুলো বিচারাধীন। বর্তমান সরকারের আমলে দেয়া প্রায় সব মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে। বিচার কাজও শুরু হয়েছে কয়েকটির। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৯৬টি মামলা রয়েছে। অবৈধ প্লট বরাদ্দ দিয়ে সরকারের সাড়ে ১৫ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি সাধনের অভিযোগে তার নাম চার্জশিটে যুক্ত করেছে দুদক। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ৪০টি মামলার কয়েকটিতে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। দ্রুতই ওইসব মামলার বিচার শুরু হবে। এ ছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের নামে ২২, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার নামে ১৯, এম কে আনোয়ারের নামে ৪০ ও সালাহ উদ্দিন আহমেদের নামে ৪৭টি মামলা রয়েছে।
দলের সিনিয়র নেতাদের মামলা : ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে ৭টি, ইকবাল হাসান মাহমুদের ৩৭, এজেডএম জাহিদ হোসেনের ১৫, বরকতউল্লা বুলুর ৮৮টি, আবদুল আউয়াল মিন্টুর ১২, শামসুজ্জামান খান দুদুর ২২, শওকত মাহমুদের ৪৫, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের ৮, আবদুল্লাহ আল নোমানের ১৩, সেলিমা রহমানের ১১, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের ১৮ ও মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদের নামে ৬টি মামলা রয়েছে। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান ১২৬, জয়নুল আবদীন ফারুক ৩১, মিজানুর রহমান মিনু ১৩, দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নামে ৪৭টি, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নামে ১৩০টি, হাবিব-উন নবী খান সোহেল ১০১, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুদুর বিরুদ্ধে ৪৫টি, ফজলুল হক মিলন ১২ ও নাদিম মোস্তফার নামে ২৭টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার বেশিরভাগেরই চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নীরবের নামে ২১৫ ও সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর বিরুদ্ধে ২১২টি মামলা রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সফিউল বারী বাবুর নামে ৩১টি মামলা রয়েছে। এসব নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা অনেক মামলায় ইতিমধ্যে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। বিচার কাজও চলছে ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ