বৃহস্পতিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

ফিরেই রাজসিক সেঞ্চুরিতে নিজের জাত চেনালেন যুবরাজ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : মহেন্দ্র সিং ধোনি দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পর ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির নেতৃত্বও পেয়েছেন টেস্ট অধিনায়ক বিরাট কোহলি। ভারতের ক্রিকেটে কোহলি এক এনবদ্য নাম। যাকে দেশটির পরবর্তী টন্ডেুলকার বলে সম্বোধন করা হয়। তার এ দায়িত্ব নিয়ে মাতামাতি না থাকলেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে ভারত দলে ফিরে আসা অলরাউন্ডার যুবরাজ সিংকে নিয়েই যেন সবার আগ্রহ। আগ্রহ থাকবেই বা না কেন, যার থলিতে আছে এক ওভারে ৬টি ছক্কার মারসহ একাধিক রেকর্ড়। ক্রিকেটে ফিরেই যেন রুদ্র মূর্তি ধারণ করলেন যুবরাজ। ৩৫ বছর বয়সী যুবরাজ গত মার্চে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে শেষ খেলেছিলেন। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের পর আর ওয়ানডে খেলেননি এই অলরাউন্ডার। ২০১২ সালের শুরু থেকে ১৯ ম্যাচে তার গড় মোটে ১৮.৫৫। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটের ভালো পারফরম্যান্সে আবার দলে ফিরেছেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর পর তিন অঙ্কের দেখা পেলেন যুবরাজ সিং। সঙ্গে নেতৃত্ব ছাড়ার পর মহেন্দ্র সিং ধোনির প্রথম শতকে রানের পাহাড় গড়লো ভারত। ওয়েন মর্গানের অধিনায়কোচিত ইনিংসে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেলেও সেই পাহাড় টপকাতে পারেনি ইংল্যান্ড। কটকের বারবাতি স্টেডিয়ামে বুধবার রান বন্যার ম্যাচে শেষ দিকের দারুণ নাটকীয়তায় ১৫ রানে জিতেছে ভারত। তিন ম্যাচের সিরিজও ২-০ ব্যবধানে জিতে নিল বিরাট কোহলির দল। টস হেরে ব্যাট করতে নেমে যুবরাজ ও ধোনির গড়ে দেওয়া ভিতের উপর দাঁড়িয়ে ৬ উইকেটে ৩৮১ রান করে ভারত। জবাবে মর্গানের শতকে সম্ভাবনা জাগালেও আট উইকেটে ৩৬৬ রান পর্যন্ত যায় অতিথিদের ইনিংস। শুরুতেই ভারতকে পিছনে ঠেলে দিয়েছিলেন ক্রিস ওকস। ইনিংসের তৃতীয় ওভারে এই পেসারের প্রথম বলে স্লিপে ধরা পড়েন লোকেশ রাহুল আর শেষ বলে বেন স্টোকসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন আগের ম্যাচেই ম্যাচে শতক করা কোহলি। নিজের পরের ওভারের প্রথম বলেই শিখর ধাওয়ানের ফিরতি ক্যাচ ফেলেন ওকস। তবে সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেননি বাঁ-হাতি ওপেনার। ওভারের চতুর্থ বল ব্যাটের ভিতরের কানায় লেগে অফস্টাম্পে লাগে। ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ২৫/৩। অধিনায়কসহ প্রথম তিন ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়া স্বাগতিকরা যুবরাজ-ধোনির ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ায়। বলের সঙ্গে রান তোলায় পাল্লা দিয়ে ২৫৬ রানের জুটি গড়েন তারা। ওয়ানডে ক্রিকেটে চতুর্থ উইকেটে এটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি। ১৯৯৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই মাঠেই মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন ও অজয় জাদেজার অবিচ্ছিন্ন ২৭৫ রানের জুটিটি সর্বোচ্চ। ৪৩তম ওভারের শেষ বলে যুবরাজকে উইকেটের পিছনে ক্যাচ বানিয়ে ৩৮.২ ওভার স্থায়ী জুটি ভাঙেন ওকস। ফেরার আগে ক্যারিয়ার সেরা ১৫০ রানের ইনিংস খেলেন এই বাঁ-হাতি অলরাউন্ডার। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটা তার চতুর্থ ও মোট চতুর্দশ ওয়ানডে শতক। শেষ শতক করেছিলেন ২০১১ সালের মার্চে চেন্নাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ১২৭ বলের ইনিংসে ২১টি চার ও ৩টি ছক্কা মারেন যুবরাজ। পুরস্কার হিসেবে পান ম্যাচ সেরার ট্রফি।
দীর্ঘ ষোল বছরের ক্যারিয়ারে ব্যাটে-বলে দারুণ সব মুহূর্ত রয়েছে, ২০০৭ টি-২০ বিশ্বকাপে এক ওভারে ছয়-ছক্কা, ২০১১-এ টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কারসহ আরও অনেক। তবু এই সেঞ্চুরির মাহাত্ম্য অন্যরকম, যুবি নিজেও সেটি স্বীকার করেছেন, ‘হয়তো এটাই আমার সেরা ইনিংস। শেষ সেঞ্চুরি করেছি সেই ২০১১ বিশ্বকাপে। দ্রুত তিন উইকেট পড়ে যাওয়ার পর আমরা একটা পার্টনারশিপ করতে চেয়েছিলাম। চেষ্টা করেছিলাম নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে। অন্যপ্রান্তে মাহী (ধোনি) ছিল, যার সঙ্গে আমার অনেক জুটির ইতিহাস রয়েছে। সে যখন ক্যাপ্টেন ছিল না, তখন এভাবে মন খুলে ব্যাট করত। এটা দারুণ অনুভূতি। বিশ্বাস ছিল আমরা দলকে বড় সংগ্রহ এনে দিতে পারব।’ ৩৫-এর শরীরটাকে ২৫ বছরের টগবগে যুবকের মতো ঝড়ঝড়ে করে তুলতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে বলেও জানিয়েছেন যুবরাজ। নিজেকে ফিরে পেয়ে ধন্যবাদ দিয়েছেন বাবা-মা, সদ্য বিবাহিত স্ত্রী-পরিবার, ভারতীয় কোচ-নির্বাচক, ভক্ত-অনুরাগী সবাইকে। যুবরাজের জীবনী নিয়ে দারুণ একটা সিনেমা হতে পারে, যার প্রতিটি দৃশ্যে থাকবে টান-টান উত্তেজনা; উত্থান-পতন, সাফল্য-ব্যর্থতা, মৃত্যুকে জয় করে ফেরা...। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে যা দেখেছেন, যা করেছেন, সেটি কম মানুষের জীবনেই হয়ে থাকে। তিন বছর পর এবার যখন ইংল্যান্ড সিরিজের ওয়ানডে দলে ডাক পেলেন, অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, নিন্দুকেরা সমালোচনায় মুখর হয়েছেন, ভুলে গেছেন এই মানুষটাই দীর্ঘ আটাশ বছর পর তাদের বিশ্বাকাপ (২০১১) উপহার দিয়েছিলেন! কটকের দ্বিতীয় ম্যাচে ১৫০ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস উপহার দেয়ার পর অনেক প্রশ্নের ভিড়ে দু’টি প্রশ্ন আলাদা করে রাখতে হয়। এটাই কি আপনার সেরা ইনিংস, অথবা, এই সেঞ্চুরিতে কি প্রমাণ করতে চাইছেন? ‘হয়তো এটাই জীবনের সেরা ইনিংস। সত্যি বলতে, অন্যের কাছে নয়, নিজের কাছেই নিজেকে প্রমাণ করার সময় এসেছিল। কঠোর সাধাণার মধ্য দিয়ে যখন নিজে বলতাম, যুবি তুমি ফুরিয়ে যাওনি।’ উত্তর যুবরাজের। বারবাতি স্টেডিয়ামে ভারত তো বটেই, গোটা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনকেই নষ্টালজিয়ায় ভুগিয়েছেন যুবরাজ ও মহেন্দ্র সিং ধোনি। ২৫ রানে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর চতুর্থ উইকেটে দু’জনের ২৫৬ রানের জুটি। যুবরাজ ১২৭ বলে ১৫০ (২১ চার, ৩ ছক্কা), ধোনি ১২২ বলে ১৩৪ (১০ চার, ৬ ছক্কা)। ভারত ৬ উইকেটে ৩৮১। প্রত্যাবর্তনে ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস যুবরাজের (১৪তম সেঞ্চুরি)। নেতৃত্ব ছাড়ার পর ম্যারাথন ধোনি, তিন ভার্সনে অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার প্রথম মিশনেই এক ম্যাচ হাতে রেখে কোহলির সিরিজ জয়। অনেক অনেক রেকর্ড। আলোচনার শেষ নেই। তবে সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে যুবরাজের ইনিংস। ক্যান্সার জয় করে বেঁচে থাকাই যেখানে বড় কথা, সেখানে ৩৫ বছর বয়সে বাইশ গজে পুনর্জন্ম! স্রেফ অবিশ্বাস্য। ক্যান্সার থেকে সের ওঠার পর ডাক্তার সংশয় প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘জানি না সে আর কখনো প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরতে পারবে কিনা।’ যুবরাজ ফিরেছেন, সকল প্রতিবন্ধকতা জয় করে, একেবারে রাজার বেশে। টানা তিনটা বছর ছিলেন ওয়ানডে দলের বাইরে। যদিও ক্ষুদ্রতম ফরমেট টি-২০ ম্যাচে যাওয়া আসার মধ্যেই ছিলেন জাতীয় দলে। তবে এবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডে ও টি-২০ উভয় সিরিজের দলেই আছেন অলরাউন্ডার যুবরাজ সিং। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের ম্যাচটা ভাল হয়নি- প্রথম ওয়ানডেতে মাত্র ১৫ রানেই বিদায় নিয়েছিলেন। ৩৫ বছর বয়সী এ বাঁহাতি ফুরিয়ে গেছেন এমন গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। কিন্তু নিজেকে আবার নতুন করে চেনালেন বৃহস্পতিবার। কটকে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস উপহার দিলেন যুবরাজ। পুরনো সেই বিধ্বংসী মেজাজেই তিনি মাত্র ১২৭ বলে ২১ চার ও ৩ ছক্কায় ১৫০ রান করে ফিরে যান। ইংল্যান্ড বরাবরই যুবরাজের প্রিয় প্রতিপক্ষ। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ব্যাটিং গড় ৪০ এর নিচে। কিন্তু ইংলিশদের বিরুদ্ধে দুরন্ত যুবরাজের ব্যাটিং গড় ৪৭.৪২! আর কোন টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিরুদ্ধে ওয়ানডেতে এত ব্যাটিং গড় নেই তার। আর সেটাই যেন জ্বলে ওঠার কারণ হয়ে গেল।
২০০৩ সালে ক্যারিয়ারের সেরা ১৩৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন যুবরাজ সিডনিতে। এবার সেটাকে ছাড়িয়ে যান তিনি। ১৫০ রান করে থামেন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা ওকসের চতুর্থ শিকারে পরিণত হয়ে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোন ভারতীয় ব্যাটসম্যানের এটিই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যে কোন ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ওয়ানডে ইনিংসের তালিকায় অবশ্য এর স্থান যৌথভাবে পাঁচে। ২০১১ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত খেলেছিলেন যুবরাজ। সেবার দ্বিতীবারের মতো ওয়ানডের বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তোলে ভারতীয় দল। কিন্তু বিশ্বকাপের পরই পারফর্মেন্সে অবনতি ঘটতে থাকে এ অলরাউন্ডারের। মাঝে দীর্ঘদিন ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগেছেন। ক্যান্সারকে হারিয়ে আবার খেলায় ফিরেছিলেন টি-২০ ফরমেটে। কিন্তু নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি বলে অনিয়মিত হয়ে যান। সে কারণে ওয়ানডে দলেও আর ঠাঁই হয়নি নিয়মিত। ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর সেঞ্চুরিয়নে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সর্বশেষ ওয়ানডে খেলেছিলেন। সর্বশেষ সেঞ্চুরিটা ছিল ২০১১ সালেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে সেই শতক হাঁকান। তারপর থেকে আরও ১৬ ইনিংস ব্যাট করেছেন। কিন্তু ভাল কিছু করতে পারেননি। বিশ্বকাপের ওই সেঞ্চুরির আগেও ১৭ ইনিংসে মাত্র ২ ফিফটিসহ ১৮.৩২ গড় ছিল তার ব্যাটিংয়ের। সেখান থেকে ভালভাবেই নিজেকে ফিরে পেলেন। রাজসিক এক সেঞ্চুরিতে জানিয়ে দিলেন এখনও ফুরিয়ে যাননি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ