সোমবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

রজার ফেদেরারের অনন্য সাধারণ অর্জন

নাজমুল ইসলাম জুয়েল  : নিজেকে আরো অনেক বেশি উঁচুতে নিয়ে গেলেন সুইজারল্যান্ডের রজার ফেদেরার। বছরের প্রথম গ্র্যান্ডমস্লাম অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপা জিতে নিজেকে নিয়ে গেলেন অনন্য সাধারন উচ্চতায়। টেনিসের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দ্বৈরথ, রজার ফেদেরারের মুখোমুখি রাফায়েল নাদাল। সেটাও আবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে! উত্তেজনার অতলে ডুবে যেতে চেয়েছিলেন সবাই। শেষ পর্যন্ত ঘটেছেও তাই। ৩ ঘণ্টা ৩৮ মিনিটব্যাপী পাঁচ সেটের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে নাদালকে চৌদ্দ’র চৌহদ্দিতে রেখে ফেদেরার পা রাখলেন আঠারোয়। প্রায় অস্তমিত ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে ৩৫ বছর বয়সী ফেদেরারের যেন ‘পুনর্জন্ম’ ঘটল! রড লেভার অ্যারেনায় তার হাতে শোভাবর্ধন করা ১৮তম গ্র্যান্ডস্লাম শিরোপাটা তো সেই রাজসিক প্রত্যাবর্তনেরই অকাট্য প্রমাণ। মেলবোর্ন থেকে অ্যান্ডি মারে ও নোভাক জোকোভিচের বিদায়ের পর ফাইনালে সবাই মনে মনে এ দুজনকেই প্রত্যাশা করেছে। কিন্তু সেমির যুযুধান শেষের আগ পর্যন্তও তা মুখ ফুটে বলার সাহস পায়নি কেউ-ই। দুই ‘নেমেসিস’-এর ক্রমাগত চোট-ই সমর্থকদের ভীরু আশার নেপথ্য নিয়ামক। তবে সাধারণের সমীকরণকে ভুল প্রমাণ করাতেই কিংবদন্তিদের যত মুনশিয়ানা। নাদাল-ফেদেরার সেই মুনশিয়ানা দেখিয়েই উঠে এসেছিলেন ফাইনালে। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শেষ পাতে পঁয়ত্রিশের ফেদেরারের বিপক্ষে ত্রিশের নাদালকেই এগিয়ে রেখেছিলেন সবাই। কিন্তু এখানেও সবার সমীকরণ ভুল। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্প্যানিশ ‘ম্যাটাডোর’ নাদালের বিপক্ষে ফাইনালে ৬-৪, ৩-৬, ৬-১, ৩-৬, ৬-৩ গেমের জয় তুলে নেন ফেদেরার। তার বহু সাধনার ‘আঠারো’ ছোঁয়ার প্রেক্ষাপটও ভীষণ শিহরণজাগানিয়া অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে এটা ছিল ফেদেরারের শততম ম্যাচ! ফাইনালে প্রথম সেট ফেদেরারের তো পরের সেট নাদালের। তৃতীয় সেট জিতে ঘুরে দাঁড়ান ফেদেরার। নাদাল বসে থাকবেন কেন! চার নম্বর সেট জিতে তিনিও ঘুরে দাঁড়ান। আর তাই পাঁচ নম্বর সেটে গড়ায় দু’জনের ‘ক্ল্যাসিক’ রোমাঞ্চের শেষ অঙ্ক। সেখানেও বেশকিছুটা পথ এগিয়ে যান ফেদেরার। কিন্তু সার্ভিসে টানা তিনবার এল ফল্টের ডাক! তিনবারই চ্যালেঞ্জ করেন ফেদেরার। হক-আইতে প্রথম দুবার দেখা গেল আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত সঠিক। বল পড়েছে দাগের বাইরে। ফেদেরারের শেষ চ্যালেঞ্জে ভাগ্য সহায় হয়নি নাদালের। হক আইয়ের রায়, সিঙ্গেলস সাইডলাইনের নির্ধারিত সীমানা ছুঁয়েছে সার্ভিস, অর্থাৎ ফেদেরার চ্যাম্পিয়ন। এরপর সুইস কিংবদন্তির শিশুসুলভ উদযাপনের বিপরীতে স্প্যানিশ ‘ম্যাটাডোর’-এর অসহায় চাহনিটা নিঃসন্দেহে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের সেরা ছবি। ফাইনালে ফেদেরার শুধু নাদালকে হারাননি, হার মেনেছে অবাধ্য বয়সও। গত ৪৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ড¯াম শিরোপা জিতলেন তিনি। সেটাও আবার ছয় মাসব্যাপী হাঁটুর ইনজুরি কাটিয়ে, যখন ফেদেরার নিজেই নিজেকে বলতেন ‘এক পায়ের মানুষ’। ফাইনালের আগের দিন জার্মান কিংবদন্তি বরিস বেকার বলেছিলেন, ‘ফেদেরারকে হারাতে হলে ওর ভেতরকার টেনিস-আত্মাটুকু শুষে নিতে হবে নাদালকে।’ বলা ভালো, নাদাল চেষ্টায় কোনো ত্রুটি রাখেননি কিন্তু তিনি তো আর প্রতিনিয়ত কেন রসওয়েলের প্রেরণাদায়ক চিঠি পান না! মেলবোর্নের গ্র্যান্ডস্ল্যামে ফেদেরার যতবার অংশ নিয়েছেন, প্রতিবারই চিঠি পেয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তির কাছ থেকে। এবারো ফাইনালের আগে তার সাফল্য কামনা করে চিঠি পাঠান রসওয়েল। সেই চিঠির জবাবে ফেদেরার গড়লেন দারুণ এক কীর্তি টেনিসে ‘ওপেন যুগ’ শুরুর পর ১৯৭২ ইউএস ওপেনে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে গ্র্যান্ডস্লাম জয়ের রেকর্ড গড়েছিলেন সাঁইত্রিশে পা রাখা রসওয়েল। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে নিজের পাঁচ নম্বর শিরোপাটা জিতে তালিকাটির দুইয়ে উঠে এলেন ফেদেরার। ২০১২ উইম্বলডন জয়ের পাঁচ বছর পর এটাই তার প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম শিরোপা, সেটাও আবার ১৭তম বাছাই হিসেবে, যা আক্ষরিক অর্থেই ফেদেরারের পুর্নজন্মের প্রমাণ। মেলবোর্নে সাত বছরের শিরোপাখরা কাটানো ফেদেরার ছেলেদের টেনিস ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে চারটি গ্র্যান্ডস্লামের তিনটিতে পাঁচবার করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কীর্তিও গড়লেন। ১৮তম শিরোপাটা দিয়ে সর্বোচ্চসংখ্যক গ্র্যান্ডস্লাম ট্রফি জয়ের রেকর্ডেও নিজেকে আরো একধাপ এগিয়ে নিলেন ‘ফেড-এক্সপ্রেস’। পিট সাম্প্রাসের সঙ্গে এ তালিকায় সম্মিলিতভাবে দ্বিতীয় ১৪ গ্র্যান্ডস্লামজয়ী নাদাল। শিরোপা হাতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে ভোলেননি ফেদেরার, ‘সবাইকে ধন্যবাদ। আশা করি আগামী বছরও দেখা হবে। তা না হলে, যে পর্যন্ত এসেছি তা নিয়েই আমি সুখী। শিরোপা জয়ের চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! এজন্য নাদালকে ধন্যবাদ। তার সঙ্গে লড়াইয়ের বাসনাই আমাকে ফিরিয়েছে কোর্টে। রাফা, দয়া করে খেলাটা চালিয়ে যাও। তোমাকে প্রয়োজন টেনিসের।’
অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের শিরোপা জয়েল পথে পাঁচ সেটের ফাইনালে তিনি পরাজিত করেন রাফায়েল নাদালকে। এই আসরে এটি তার পঞ্চম সাফল্য। সব মিলিয়ে সুইস কিংবদন্তির গ্র্যান্ডস্লাম এখন ১৮টি। রজার ফেদেরারের ফোরহ্যান্ড উইনারটা একেবারে লাইনের কাছে গিয়ে পড়ল। বল কোর্টের বাইরে চলে গেল কিনা সেটার জন্য আপিল করলেন রাফায়েল নাদাল। ক্যামেরা জুম করা হলো। না বাইরে নয়, বলটা ভেতরেই! রড লেভার এরেনায় দর্শকদের একাংশের উলাস। ১০৫তম অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের চ্যাম্পিয়ন যে ফেদেরার! উইম্বলডন ছাড়া সব মেজর আসরেই নাদালের কাছে শিরোপা ছেড়ে দিতে হয়েছে ফেদেরারকে। এবার পাঁচ সেটের থ্রিলার ৬-৪, ৩-৬, ৬-১, ৩-৬, ৬-৩ গেমে জিতে ইতিহাসটা বদলালেন ৩৫ বছরের এই বুড়ো। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে এটি তার পঞ্চম শিরোপা। সব মিলিয়ে ফেদেরারের গ্র্যান্ড সস্নাম দাঁড়ালো ১৮টিতে। উন্মুক্ত যুগে সবচেয়ে বেশি গ্র্যান্ডস্লামের রেকর্ডটা তো সেই কবেই নিজের করে নিয়েছেন। এবার নিজেকে আরও উচ্চতায় নিয়ে গেলেন সুইস কিংবদন্তি। অথচ টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তাকে ফেভারিটদের কাতারে রাখেনি কেউই। গত বছরের প্রায় অর্ধেকটাই কাটিয়েছেন কোর্টের বাইরে। হাঁটুর ইনজুরি ছিল। সেই ফেদেরারই চ্যাম্পিয়ন। মাইক্রোফোন হাতে পাওয়ার পর ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি, ‘আমি আমার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। রাফাকে অবশ্যই অভিনন্দন জানাব তার অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের জন্য। আমাদের কেউ ফাইনালে থাকবে সেটা কল্পনাও করতে পারিনি। আমি আমার দলকে ধন্যবাদ জানাব। তারা সবসময় আমার পাশে থেকে। ২০১৪ সালের ফ্রেঞ্চ ওপেন জেতার পর আর কোনো গ্র্যান্ডস্লাম জিততে পারেননি নাদাল। এবার সুযোগ ছিল। কিন্তু ফেদেরার কীর্তির কাছে হার মানতে হলো তাকে। তবে সুইস কিংবদন্তিকে কৃতিত্ব দিতে একটুও দ্বিধাবোধ করেননি তিনি, ‘ফেদেরারকে অভিনন্দন। সে দারুণ খেলেছে। আমি নিজেও খুশি। এখানে একমাস খুব দারুণ কেটেছে আমার। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।’ ফেদেরারের শুরুটা হয়েছিল ভুলে, প্রথম সেটের প্রথম গেমটা জিতলেন নাদাল। এরপর দারুণ দু’টি সার্ভে সুইস তারকা ঘুরে দাঁড়ালেন। সমান তালে চলতে থাকল ম্যাচ। ৩-৩ হওয়ার পর চোখ ধাঁধানো নিচু এক ব্যাকহ্যান্ডে দু’টি সেট পয়েন্ট পেলেন ফেদেরার। এরপর নাদালকে আর কোনো সুযোগ না দিয়ে প্রথম সেটটা তিনি জিতলেন ৬-৪ গেমে। প্রথম সেটে ফেদেরারের সার্ভগুলো ছিল অসাধারণ, দ্বিতীয় সেটে তার উল্টো চিত্র। নাদালের গোলার মত সার্ভগুলো ফেরাতে কষ্টই হচ্ছিল তার। দারুণ এক এইসে প্রথম গেম জিতে নিলেন স্প্যানিয়ার্ড। ফেদেরারের ডাবল ফল্ট দ্বিতীয় গেমেও এগিয়ে দিল নাদালকে। এরপর এক ব্রেক পয়েন্টে ২-০ বানিয়ে ফেললেন তিনি। তৃতীয় ও চতুর্থ গেমটাও দারুণ খেলে জিতে নিলেন নাদাল। ৪-০ হওয়ার পর দু’টি গেম জিতেছিলেন ফেদেরার। কিন্তু ঘুঁরে দাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। দ্বিতীয় সেটে তাকে ৬-৩ গেমে পরাজিত করে ম্যাচে সমতা আনলেন নাদাল। তৃতীয় সেটে আবারও নিজের সেরাটা খেলতে শুরু করলেন ফেদেরার। তিনি ৩-০ গেমে এগিয়ে যাওয়ার পর একটি গেম জিতলেন নাদাল।
এরপর আবারও শুরু সুইস আধিপত্য। তিনটি সরাসরি পয়েন্টে ৪০-০ করার পর মিসাইল ফোরহ্যান্ডে ফেদেরার জিতলেন চতুর্থ গেম। পঞ্চম গেমে ৩০-০ পয়েন্টে পিছিয়ে ছিলেন তিনি। সেখান থেকে দারুণ এক ব্রেক পয়েন্টে ঘুরে দাঁড়ান ফেদেরার। এরপর দু’টি ডাবল ব্রেকে তৃতীয় সেটটা ৬-১ গেমে জিতে নিলেন তিনি। ক্যারিয়ারের ১৮তম গ্র্যান্ড সস্নাম থেকে তখন মাত্র এক সেট দূরে ফেদেরার। কিন্তু এত সহজে হার মানার পাত্র তো নন নাদাল। চতুর্থ সেটে ১-১ সমতা থাকার পর ৪-১ গেমে এগিয়ে গেলেন এই স্প্যানিয়ার্ড। ফেদেরারকে তখন বেশ ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। এই জন্যই হয়ত কতগুলো লুস ফোরহ্যান্ড বেরিয়েছে তার র‌্যাকেট থেকে। পরে ঘুরে দাঁড়ালেও চতুর্থ সেটে তিনটির বেশি গেম জিততে পারেননি। এই সেটে ৬-৩ গেমে হেরেছেন নাদালই। ম্যাচ গড়াল পঞ্চম সেটে। এখানেই বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখালেন ফেদেরার। নিজের চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট নাদালকে বুঝিয়ে দিলেন বয়স আসলে তার কাছে কিছুই না। একটা সময় ৩-১ গেমে পিছিয়ে ছিলেন ফেদেরার। সেখান থেকে ৫-৩ গেমে এগিয়ে গেলেন
রজার ফেদেরারের ১৮ গ্র্যান্ডস্লাম
অস্ট্রেলিয়ান ওপেন
২০০৪, ২০০৬, ২০০৭, ২০১০, ২০১৭
ফরাসি ওপেন
২০০৯
উইম্বলডন
২০০৩, ২০০৪, ২০০৫, ২০০৬, ২০০৭, ২০০৯, ২০১২
ইউএস ওপেন
২০০৪, ২০০৫, ২০০৬, ২০০৭, ২০০৮

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ