বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কেউ ভোলে না কেউ ভোলে

মনসুর আহমদ : এখন থেকে প্রায় পঞ্চাশ ষাট বছর আগের কথা। সে সময় গ্রামে যারা একটু মোটামুটি সচ্ছল অবস্থায় ছিল তখন তাদের প্রত্যেকের ঘরেই একজন করে জায়গীর রাখা হতো।  বাড়িতে জায়গীর রাখা সে সময় সমাজের একটা কালচার  হিসাবে বিবেচিত ছিল।  বিশেষ করে মাদরাসার ছাত্রদের জায়গীর রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ মনে করা হতো।  জায়গীর মাস্টার  বাড়িওয়ালার ছেলে মেয়ে পড়াতো, মসজিদে আজান দিতো। অনেক বাড়িতে মাস্টার  প্রয়োজনে পরিবারের অন্যতম সদস্যের মতো সংসারের টুকিটাকি কাজে বাড়িওয়ালাকে সাহায্য করতো।  সেকালে সবাই লজিং মাস্টারকে স্নেহের নজরে দেখতো। ছোবহে সাদেকের সময় গ্রামের প্রায় বাড়ি থেকে সুললিত কণ্ঠের আজানের ধ্বনি শোনা যেতো। সন্ধ্যায় কাছারি ঘরে বা বারান্দায় ছেলে মেয়েদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠতো। সকাল বেলায় যখন তারা দল বেঁধে হৈ হৈ করে মাদরাসা  স্কুুলের দিকে ছুটতো তখন বেশ ভালই লাগতো।
আমার স্কুলটি  ছিল বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। সে সময় স্কুলে যাওয়ার রাস্তা ঘাট মোটেই ভাল ছিল না। সকালে পান্তা খেয়ে স্কুলে যেতাম, স্কুল থেকে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যেত। আমার যাতায়াতের কষ্ট দেখে মা আমাকে স্কুল বোর্ডিংয়ে পাঠালেন । মাকে ছেড়ে  বোর্ডিংয়ে থাকা আমার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠল। খাওয়া দাওয়া যেমনই হোক বোর্ডিং এর পরিবেশে আমার মন বিষিয়ে উঠল। একদিন আমি বোর্ডিং ছেড়ে বিছানাপত্র নিয়ে আবার বাড়িতে ফিরে এলাম।
শুরু হল পূর্ববৎ স্কুলে যাতায়াত।  এ ভাবে ছয়টি মাস কেটে গেল। আমার কষ্ট দেখে আমার ক্লাশের এক বন্ধু (ওয়াদুদ ফরাজী) একদিন আমাকে লজিং থাকব কিনা জিজ্ঞাসা করল। সে আমাকে লজিং বাড়ি সম্বন্ধে যে মজার বর্ণনা দিল তাতে অমি সে বয়সে বুঝতে পারলাম যে লজিং থাকা খুব কষ্টের হবে না। 
এক দিন শীত বিকেলে বন্ধুটি আমাকে নিয়ে হাজির হল বাদুর তলার কাজী বাড়িতে। বিরাট বাড়ি, চার দিকে টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা । বাড়ির সামনে পুকুর, পুকুর ধারে মসজিদ। মসজিদের পাশে বিস্তীর্ণ উঠান পেরিয়ে কাছারি ঘর। মসজিদের পাশ ঘেঁষে  একটু পায়ে হাঁটা চওড়া রাস্তা চলে গেছে বাদুর তলা ছাড়িয়ে  ভাই জোড়া,চৌদ্দ ঘর সহ বিভিন্ন গ্রামে।
মসজিদের পাশের উঠানে বসে আছেন কয়েক জন মুরুব্বী ধরনের লোক। বন্ধুটি তাদেরকে সালাম জানিয়ে একজন মুরুব্বীকে বললাম, “চাচাজান, হাবিবদের জন্য মাস্টার চেয়ে ছিলেন, তাই আমার বন্ধুকে নিয়ে এলাম।”
আমার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে মুরুব্বী কাজী সাব (আফসার কাজী) আমাকে বলেন, “আপনি কোন ক্লাশে পড়েন?” আমাকে আপনি বলে সম্বোধন করায় খুবই লজ্জা পেলাম। তবে তিনি যে একজন অতি মার্জিত রুচির লোক ছিলেন তা পরের বুঝতে পেরেছিলাম।  দুই বছরের অধিক কাল তার বাড়িতে ছিলাম। তিনি আমাকে সব সময় আপিনি বলেই সম্বোধন করে ছিলেন। অমি অত্যন্ত লাজুকভাবে জওয়াব দিলাম, “ক্লাশ সেভেনে  পড়ি।”
আমার জওয়াব শুনে কাজী সাব একটু হেসে বলেন, “হাবিব তো সিক্সে পড়ে, আর মাস্টার সেভেনে, তা  কিছুটা বেমানান মনে হয় না?” আমি জওয়াব দেবার মতো কোন কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।  আমার বন্ধু  বলে উঠল, “ চাচা  জান, ও আমাদের ক্লাশের ফার্র্ষ্ট বয়। হাবিবদেরকে পড়াতে ও  খুব পারবে। আপনি মোটেই ভাববেন না।” পাশে মাদরাসার ছাত্র আশরাফ, আমাকে আগেই চিনত। সে একটু বাড়িয়ে বলল, “চাচাজী, এক সপ্তাহের জন্য ওকে রেখে দিন। না পারলে  তখন দেখা যাবে।” বন্ধুদের কথা শুনে কাজী সাব কিছুটা আস্বস্ত হলেন, বললেন, “বেশ ভাল। তাহলে মাস্টার আজ থেকেই আমার বাসার মেহমান।” রাতের বেলা এই স্বল্প শিক্ষিত লোকটি আমার বিদ্যার বহরের ইন্টারভিউ নিলেন। মোটমুটি খুশি হলেন বলে মনে হয়েছিল।  এভাবেই আমার লজিং জীবন শুরু হলো।
বিরাট কাছারি ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা হল। এ বাড়িতে আরও দুজন মাস্টার ছিল তারা যার যার লজিং ওয়ালার ঘরের বারান্দায় স্থান করে নিয়েছিল।  লজিং মাস্টার হিসাবে আমার কাজ ছিল মাগরিব এশা ও ফজরে মসজিদে আজান দিয়ে তিন ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি করা। সন্ধ্যা হলে হাবিব সহ  ওদের দুই ভাইকে নিয়ে পড়তে বসা। তখনও গ্রামে গঞ্জে হ্যারিকেনে পড়ার সুযোগ চালু হয়নি। ওরা তিন জন আর আমি একটি পিতলের প্রদীপ ঘিরে পড়তে বসতাম। প্রদীপের কালিতে গলা নাক ভরে যেত। পড়া শেষ হলে আজান দিয়ে আমার ইমামতিতে নামাজ শেষ হতো। নামাজ শেষে বাড়ির ভেতরে ডাক পড়তো খাওয়ার জন্য।
বারান্দায় কাজী সাব বাড়ির কাজের মানুষটিসহ আমাদের সবাইকে নিয়ে একত্রে খেতে বসতেন। নিজ হাতে তরকারি বণ্টন করতেন। নিজ ছেলেদের চাইতে আমাকে একটু বেশি খাতির করতেন বলে আজ মনে হয়। এমন উদার মনের মানুষ খুব বেশি একটা আজ আছে কিনা জানি না।  খাওয়া শেষ হলে কাছারিতে  এসে মশারিটা টানায়ে ভয়ে ভয়ে শুয়ে পড়তাম। একটা অজানা ভয় লেগেই ছিল। কারণ কাছারি ঘরের অদূরেই ছিল এ বাড়ির কবরস্থান। বাঁশ ঝাড় ও আকন্দ গাছে ঘেরা কবরস্থানের দিকে তাকালে মনে বড্ড ভয় জাগতো। যা কিছু দোয়া দুরুদ জানা ছিল তাই পড়ে শুতাম। এক ঘুমে রাতটা শেষ করে ফজরের  সময় জেগে উঠে ফজরের আজান দিতাম। আমার আজান শুনে অন্য সব বাড়ির মাস্টাররা আজান দিত। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ