বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ভালই আছে রূপসার পাঁচানি গুচ্ছগ্রামের পরিবারগুলো

খুলনা অফিস : পাঁচানি গুচ্ছগ্রামের তিন পাড়ায় ত্রিশ পরিবারের বসবাস। প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় লাল শাক, মাচায় লাউ, গোয়ালঘরে গাভী আর খুপড়িতে ছাগল আর মুরগি পালন। বিল কিনারায় বসবাসরত এ গ্রামে বর্ষার চার মাস পানিতে ডুবে থাকে। সন্ধ্যার পর ভুতুড়ে অন্ধকার। তবুও খুশি এসব ছিন্নমূল পরিবার যাদের মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে।
খুলনার রূপসা উপজেলা সদরের টিএস বাহিরদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ পাশে পাঁচানি গ্রাম। পূর্ব পাড়ায় বারো ঘর, মধ্যপাড়ায় আট ঘর আর পশ্চিম পাড়ায় দশঘর ছিন্নমূলের নিবাস। ২০০৮ সালে উপজেলা প্রশাসন পাঁচানি মৌজায় প্রত্যেক পরিবারকে তিন শতক করে খাস জমি দান করে। ঘর তুলে নিতে হয় নিজ খরচায়। সাথে সাথে মাটি ভরাটও করতে হয় নিজেদের। এসব পরিবারের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নবলোক। পানীয় জলের সংকট নিরসনে সরকারি উদ্যোগে পূর্ব পাড়ার বারো পরিবারের জন্য একটি টিউবওয়েল বসালেও সে পানি খাবার অনুপোযোগী। স্বল্প পরিসরে কেউ তুলেছে পাকা দেওয়াল দিয়ে টিনসেডের ঘর, আবার কেউ তুলেছে ছাচের বেড়া দিয়ে টিনের ঘর।
ছিন্নমূল পরিবারের অধিবাসী বাদশা হাওলাদারের স্ত্রী সকিনা বেগম জানান, খাস জমি পেলেও এখনও দলিল পাইনি। নিজেদের খরচে ছাচের বেড়া দিয়ে টিনের ঘর তৈরি করে মাথা গোজার ঠাঁই করে নিতে হয়েছে। বসতি স্থাপনের আট বছর পর মিটার বসানো হয়েছে ঘরের খুঁটির সাথে। এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়নি। বাড়ির আঙ্গিনায় তিনি লাল শাক আর মাচায় লাউয়ের চাষ করেছেন। সাথে আছে গোটা দশেক মুরগিও।
মনিরুল ইসলামের স্ত্রী শাহানারা বেগম জানান, জ্যৈষ্ঠ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত বর্ষা মওসুমে পানিতে ডুবে যায় বসত বাড়ি। বর্ষা মওসুমে অমাবস্যা পূর্ণিমার সময় ঘর পানিতে ডুবে যায়। শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেস ব্যাগে করে নিয়ে যেতে হয়।
তিনি বলেন, তার স্বামী এখনও পর্যন্ত জমির দলিল পায়নি। সরকারি তত্ত্বাবধানে স্থাপিত টিউবওয়েলের পানি তারা পান করতে পারছে না।
কুরবান শেখের স্ত্রী নিলুফা বেগম জানান, বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য মিটার ও তার বাবদ তিন হাজার টাকা করে জমা দিয়েছি। কবে নাগাদ সংযোগ পাবো তা নিশ্চিত নয়। বিদ্যুৎ সংযোগ পেলে টেলিভিশন কেনার আশা প্রকাশ করেন এই গৃহবধূ।
কবির ফরাজীর স্ত্রী তহমিনা বেগম জানান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নবলোকের পক্ষ থেকে এখানকার চার পরিবারের প্রত্যেককে ছয় হাজার টাকা মূল্যের দু’টি করে ছাগল পালনের জন্য কিনে দিয়েছে। চার পরিবার ছাগল লালন পালন করছে।
এখানকার নিরাপত্তা ও সার্বিক সুখের কথা বর্ণনা করলেন গৃহবধূ নিলুফার বেগম, সাফিয়া খাতুন, শাহিনুর, আনোয়ারা বেগম, বাদশা হাওলাদার ও আকলিমা বেগম। বর্ষা মৌসুমে অসায়ত্বের কথা তুলে ধরলেন গৃহবধূরা। বর্ষায় অমাবস্যা ও পূর্ণিমায় পানি উঠে ঘর ডুবে যায়। খাটের ওপরে বসে পরিবার পরিজন নিয়ে রাত কাটাতে হয়।
গুচ্ছগ্রামের মধ্যপাড়ার আবেদ আলী হাওলাদারের ছেলে আবদুর রহিম জানান, তিনি তিন শতক জমি পেয়েছেন। দলিল পাননি। তবুও শান্তি নিজের মাথাগোজার স্থায়ী ঠিকানা হলো। ছয় বছর হলো মধ্য পাড়ার আট পরিবার খাস জমিতে নিজেদের অর্থায়নে ঘর তুলে বসবাস করছেন।
কষ্টের কথা বর্ণনা করতে যেয়ে তারা বলেন, এখানে আট পরিবারের জন্য একটি টিউবওয়েল আর দেড় হাত প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে হয় ছিন্নমূল পরিবারের এসব মানুষদের। মধ্যপাড়ায় স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে কুলসুম বেগম, হায়দার আলী, লাইলী বেগম, দেলোয়ার হোসেন, রাবেয়া খাতুন, মাসুমা বেগম ও রাহিমা বেগমের। পশ্চিমপাড়ায় ঠিকানা হয়েছে দশ পরিবারের। তাদেরও একই ধরনের পরিবেশ। সুখে-দুঃখে আছেই এ পাড়ার বসতিরা। মনের মাঝে বড় কষ্ট জমির দলিল এখনও হাতে পায়নি। এরমধ্যে কেটে গেছে এ পাড়ায় আট বছর।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার শহীদুজ্জামান জানান, রূপসা উপজেলার সকল গ্রামে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে। ইন্টারনেট সুবিধা পেয়েছে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সরকারি চাকুরিজীবীরা।
 খুলনা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, ছিন্নমূল পরিবারের মাথা পোঁজার স্থায়ী ঠাইয়ের জন্য খুব শিগগিরই তাদের হাতে দলিল পৌঁছে যাবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে। বর্ষা মওসুমের আগেই পানি নিষ্কাশনের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
টিএস বাহিরদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর শেখ বলেন, ভূমিহীনদের তিন শতক জমির মালিকানার দলিল দেয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। খুব বেশি বিড়ম্বনা পেতে হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ