শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

ভূমিকম্প : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

আখতার হামিদ খান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
ভূমিকম্পের ফলে কেবল ভবন, সেতু, বিদ্যুতের খুঁটিই ভেঙে পড়ে না, গ্যাস পাইলাইন ফেটে যায়, পানিপ্রবাহ অচল হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, আগুন লাগে এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু করবার সুযোগ ও সীমিত সামর্থ্যগুলোকেও সংকুচিত করে। তাছাড়া প্রশিক্ষণ ও সমন্বিত উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি ব্যবস্থাপনার ভৌতিক কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় ভূমিকম্প মারাত্মক মানসিক আঘাত (শক্) সৃষ্টি করে। মানুষ প্রচণ্ডভাবে হতবিহবল হয়ে পড়ায় মানুষের যে সীমিত সামর্থ্য আছে তারও সুষম ও যৌক্তিক ব্যবহার অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ কারণে মানুষের সচেতনতা সৃষ্টি ও পরস্পরের জন্য বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবার সংস্কৃতিকে বিকশিত ও কার্যকর করা খুবই প্রয়োজন।
ইতোমধ্যে আমাদের দেশে সাইক্লোন ও বন্যার মতো দুর্যোগ মোকাবেলার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অভিজ্ঞতা ও ব্যবস্থাপনা সামর্থ্যরে অগ্রগতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি সম্পৃক্ততা বেশ কার্যকর ও সময়োপযোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাছাড়া ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে সচেতনতা সৃষ্টি, নির্মাণ কর্মকাণ্ডে সুনির্দিষ্ট নির্মাণ কোড মেনে চলার বাধ্যবাধকতা ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষজ্ঞগণ দাবি করেন যে, ইতোমধ্যে প্রণীত ‘জাতীয় বিল্ডিং কোড’ মেনে ভৌতিক নির্মাণকাজ করা গেলে ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, প্রকৌশলী, স্থপতি, মিস্ত্রিসহ বিশাল প্রশিক্ষিত ও সচেতন কর্মীবাহিনীকে সমম্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
ইতিমধ্যে যে স্থাপনা, ভবন নির্মিত হয়েছে সেগুলোর দৃঢ়তা, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায় তা নিয়েও বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীগণ বিভিন্ন পরামর্শ দিকনির্দেশনা তৈরি করেছেন। এগুলো পর্যায়ক্রমে হলেও বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে।
জাতীয় ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন ও অনতিবিলম্বে কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে হবে। এতে অন্তত আবাসিক এলাকায় শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ ও পরিচালনার যথেচ্ছাচার অনেকটুকু রোধ বা সীমিত করা যাবে। তাছাড়া গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামোর যৌক্তিক সামর্থ্য গড়া ও তার সর্বোত্তম নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। দুর্যোগকালে এ সকল সার্ভিস সুবিধা বঞ্চিত হওয়ার ভয়াবহ পরিণাম অবশ্যই ভালো নয়। অন্তত দুর্ঘটনায় প্রধান গ্যাসলাইন দ্রুত স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা তো করা যায়। ভূমিকম্প আমরা হয়তো প্রতিরোধ করতে পারি না, কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতিকে সীমিত করবার চেষ্টা তো করতেই পারি।
আমাদের জল নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথগুলোতে যদি ঘরবাড়ি বানানো হয়; ভবন স্থাপনা নির্মাণের সময় ভূতাত্ত্বিকদের পরামর্শ না নিয়ে প্রাকৃতিক ফাটলের ওপর স্থাপনা গড়া হয়, তাতে কেবল জলাবদ্ধতার আশু বিপদ নয়, ভূমিকম্পের মারাত্মক টার্গেট হওয়াটাও অবধারিত হয়।
এখানেই সমন্বিত পদক্ষেপ ও বিদ্যমান জ্ঞান-ভান্ডারকে কাজে লাগানোর কৌশল ও সংস্কৃতির বিষয়টি সামনে চলে আসে। আমরা যদি আমাদের দখলী সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার সাহস অর্জন করতে পারি তাহলে ভূমিকম্পের মত দুর্যোগও আমাদের অনেকটুকুই ছাড় দিতে বাধ্য হবে।
পরিবেশসম্মত বসবাসের শিক্ষা তাই কেবল বিশুদ্ধ বাতাস, প্রাকৃতিক উম্মুক্ত স্থান, পরিচ্ছন্ন জলের আধার, দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়ার তাগিদে নয়, বরং পরিবেশসম্মত বসবাসের বিষয়টির সাথে ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে দ্রুত বেরুবার পথ নির্মাণও সম্পর্কিত।
ভূমিকম্প পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয় : ২০০৮ সালের ২৬ জুলাই মধ্যরাতের ভূমিকম্পের ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহীসহ দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চল কেঁপে উঠেছিল। রিখটার স্কেলে ৪.৯ মাত্রার এ ভূমিকম্পই সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় অনুভূত হওয়া শক্তিশালী ভূমিকম্প, যদিও পরিমাপের দিক থেকে এটি ছিল মাঝারি মানের চেয়ে নিম্ন মাত্রার। তবে এ ভূমিকম্প উক্ত এলাকাসমূহে যতটা ঝাঁকুনি দিয়েছে তার চেয়ে বরং কিছুটা বেশিই ঝাঁকুনি দিতে পেরেছে মানুষের মনে। ভূমিকম্পের পর ঢাকাবাসী কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে যে, আমরা বড় একটা ঝুঁকির মধ্যে আছি। মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে আমরা যতটা আতঙ্কিত হয়েছি, তাতে বড় ধরনের ভূমিকম্প সৃষ্টি হলে ঢাকার বিপর্যয়ের পরিমাণ কতটা হবে তা নিয়ে অনেকেই আতঙ্কিত হয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি নগন্য, জনসচেতনতারও প্রায় নেই। কিন্তু একথা সত্য, বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় রয়েছে এবং যে কোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পে বাংলাদেশের কোনো অঞ্চল বিধ্বস্ত হতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, সাধারণত রিখটার স্কেলে ৫ থেকে ৫.৯৯ মাত্রার ভূমিকম্পকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প বলা হয়। ৬ থেকে ৬.৯৯ মাত্রাকে তীব্র, ৭ থেকে ৭.৯৯ মাত্রাকে ভয়াবহ এবং এর ওপরের মাত্রাকে অতি ভয়াবহ ভূমিকম্প বলা হয়। সে হিসেবে ঢাকা মহানগরীতে একটি বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটানোর জন্য মাঝারি ধরনের ভূমিকম্পই যথেষ্ট। কারণ এযাবৎ রাজউক থেকে যে সব বাড়ির নকশা অনুমোদন নেয়া হয়েছে তার প্রায় সবই রিখটার স্কেলে ৫ মাত্রার কিছু বেশি ভূকম্পন সহ্য করতে পারে। উপরক্ত কোনো কোনো বাড়ির মালিক নির্ধারিত মাত্রার ভূকম্পন প্রতিরোধক বাড়ির নকশা পাশ করিয়ে বাড়ি নির্মাণের সময় তা আর মানেননি। ৭ মাত্রার রিখটার স্কেল বজায় রাখা হয়েছে এমন নমুনা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের দেশও ভূকম্পন পরিমাপক যন্ত্রপাতিতে কিছুটা সমৃদ্ধ হয়েছে। ফলশ্রুতিতে দেশেল কোথাও কোনো ছোটখাট ভূকম্পন হলেও আমরা সেটা জানতে পারছি। তারপরও বিভিন্ন সংস্থার পরিমাপলব্ধ তথ্যের মধ্যে এখনও কিছুটা গরমিল বা বিভেদ রয়েই যাচ্ছে। গত ২৬ জুলাই মধ্যরাতের ভূমিকম্প সম্পর্কে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সোসাইটি এর পর্যবেক্ষণ মতে, ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৪.৯। আবার ইন্ডিয়ান মেট্রোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট এর মতে ৪.৮ মাত্রার। দুটো সংস্থাই উৎপত্তিস্থল হিসেবে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এলাকাকে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫.৬ এবং এর কেন্দ্র ছিল সিলেট। এ ধরনের তথ্যগত বিভেদ পূর্বপ্রস্তুতি নেয়ার জন্য কিছুটা অসুবিধাজনক তো বটেই।
এ অঞ্চলে ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য ভূমিকাসমূহ :
১৫৪৮    সর্বপ্রথম রেকর্ড হওয়া ভূমিকম্পটি বেশ জোরালো ছিল। সিলেট এবং চট্টগ্রামে এটা প্রচণ্ড ঝঁকুনি দেয়। অনেক স্থানে মাটি ফেটে পানি বের হয়ে আসে।
১৬৪২ সিলেট জেলায় আরো বেশি ক্ষতি হয়। বিভিন্ন বিল্ডিং এ ফাটল দেখা দেয়, কিন্তু কোনো প্রাণহানি হয়নি।
১৭৬২  ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিলে সংঘটিত এ ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের নিকটবর্তী ১৫৫.৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা স্থায়ীভাবে পানিতে ডুবে যায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে। ঢাকায় প্রচণ্ড কম্পন হয়। ৫০০ মানুষ মারা যায়। নদীনালা, ঝিলের পানি আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং শান্ত হওয়ার পর নদীর ওপরে অনেক মৃত মাছ দেখা যায়। চট্টগ্রাম ও সীতাকু-তে ভূমিকম্পের প্রচণ্ড তীব্রতা অনুভূত হয়।
১৭৭৫    ১০ এপ্রিল এর এ ভূমিকম্পটিও বিপজ্জনক ছিল। তবে কোনো প্রাণহাণি হয়নি।
১৮১২    ১১ মে আঘাত হানা বড় ধরনের এ ভূমিকম্প বাংলাদেশের অনেক স্থানে অনুভূত হয়। সিলেটে এর উদ্দামতা ছিল অনেক বেশি।
১৮৬৫    ১৮৬৫ সালের শীতকালে সংঘটিত এ ভূমিকম্পে ভয়ংকর ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। তবে তেমন বেশি ক্ষতি সংঘটিত হয়নি।
১৮৬৯ কাছার ভূমিকম্প নামে পরিচিত। সিলেটে সাংঘাতিকভাবে অনুভূত হয়। তবে কোনো প্রাণহানি হয়নি। চার্চের চূড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কোর্ট বিল্ডিং এবং সার্কিট হাউসের দেয়ালে ফাটল দেখা যায়।
১৮৮৫    বেঙ্গল ভূমিকম্প নামে পরিচিত। ১৮ জুলাই সংঘটিত এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.০।
১৮৮৯    ৭.৫ মাত্রার এ ভূমিকম্পনটি হয়েছিল ১০ জানুয়ারি। সিলেট শহর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকাতে আঘাত হানে।
১৮৯৭    ১২ জুন বিকাল ৫:১৫ মিনিটে সংঘটিত হওয়া গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্প নামের এ ভূমিকম্পনটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প। সিলেট শহরের অনেক বিল্ডিং ধসে পড়ে এবং ৫৪৫ জনের মৃত্যু হয়। ময়মনসিংহের অনেক সরকারি ভবন ভেঙে পড়ে। জমিদারদের দোতলা ভবনের প্রায় সবই ভেঙে পড়ে। ঢাকা মানিকগঞ্জ রেলওয়ের অনেক ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পক্ষকালের জন্য চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। ভূমিকম্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জীবনের ক্ষতি তেমন বেশি না হলেও সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৫ মিলিয়ন রুপির। রাজশাহীতে বিশেষ করে পূর্ব অংশে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভূত হয় এবং ১৫ জন মারা যায়। ঢাকাতে সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল অনেক বেশি। ইটের তৈরি ভবন প্রায় সবগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
১৯১৮    শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প নামে পরিচিত। ১৮ জুলাই সংঘটিত এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.৬। শ্রীমঙ্গল প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তবে ঢাকায় স্বল্প ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছিল।
১৯৩০    ডুবরি ভূমিকম্প হিসেবে পরিচিত। ৩ জুলাই সংঘটিত এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.১। এ ভূমিকম্পে রংপুর জেলার পূর্বাংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
১৯৩৪    বিহার-নেপাল ভূমিকম্প নামে পরিচিত। ১৫ জানুয়ারি সংঘটিত ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্পে বিহার, নেপাল এবং উত্তর প্রদেশে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে, কিন্তু বাংলাদেশের কোনো অংশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেনি। একই বছরের ৩ জুলাই ৭.১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয় যা রংপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধন করে।
১৯৫০ আসাম ভূমিকম্প নামে পরিচিত। ১৫ আগস্ট সংঘটিত এ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮.৪। বাংলাদেশের সর্বত্র এ কম্পন অনুভূত হয়। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
১৯৯৭ আসাম ভূমিকম্প নামে পরিচিত। ১৫ আগস্ট সংঘটিত এ ভূমিকম্পের মাত্রা  ছিল ৮.৪। বাংলাদেশের সর্বত্র এ কম্পন অনুভূত হয়। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
১৯৯৯, ২২ জুলাই মহেশখালী দ্বীপে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। এর মাত্রা ছিল ৫.২। মহেশখালী দ্বীপ এবং এর সংলগ্ন সাগরে তীব্রভাবে অনুভূত হয়। অনেক বাড়িঘরে ফাটল দেখা দেয় এবং ভেঙে পড়ে।
২০০৩ রাঙমাটি জেলার বরকল উপজেলার কলাবুনিয়া ইউনিয়নে এ ভূমিকম্পনটি হয়। ২৭ জুলাই ভোর ৫:১৭ মিনিটে সংঘটিত এ ভূকম্পনের মাত্রা ছিল ৫.১।
বাংলাদেশে ভূমিকম্প : আশংকা ও প্রস্তাত
ভূমিকম্প : ঝুঁকি ও মাটির বাড়ি
বাংলাদেশের মতো নিম্ন আয়ের দেশে গৃহনির্মাণের উপকরণ হিসেবে মাটি অনেক প্রাচীনকাল হতেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মাটির এই বহুল ব্যবহারের মূল কারণ এর সহজলভ্যতা, কম খরচ, সহজ নির্মাণকৌশল, কম শক্তি খরচ এবং পরিবেশ বান্ধবতা। কিন্তু বৃষ্টিপাত, বন্যা কিংবা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাটির প্রতিরোধক্ষমতা অত্যন্ত কম হওয়ায় নির্মাণ উপকরণ হিসেবে মাটির ব্যবহার অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। কেননা অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী যেমন ইট, বালু, সিমেন্টের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় সেগুলো মাটির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ-ধরনের নির্মাণ উপকরণের উচ্চমূল্য এবং উৎপাদন ধাপ থেকে শুরু করে সর্বশেষ ধাপ পর্যন্ত পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ইত্যাদি কারণে মাটির বাড়ির গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেখা গেছে যে মাটির বাড়ি যদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তাহলে তা ৪০-৫০ বছর পর্যন্ত সহজেই টিকে থাকতে পারে। তাই মাটির ঘরকে ভূমিকম্প-প্রতিরোধী এবং পানিরোধী করার জন্য বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজ হয়েছে ও চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৩ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায় মোট জনসংখ্যার ৭৩% লোক বাস করে কাঁচা বাড়িতে যার মাঝে অধিকাংশ হল মাটির বাড়ি। তাই আবাসন সমস্যার সমাধানের জন্য মাটির বাড়ির গঠনগত মান উন্নয়ন জরুরি প্রয়োজন।
যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মাটির ঘর নির্মাণে মাটির সাথে বিভিন্ন natural fibre ব্যবহার চলে আসছে। এই fibre reinforcement মাটির বাড়িকে ভূমিকম্প এবং পানিরোধী করতে ভূমিকা রাখে। তাই এই নিবন্ধে স্থানীয়, সস্তা, সহজলভ্য এবং সহজে নির্মাণ করা যায় এমন উকরণ ব্যবহার করে মাটির ঘরের ভূমিকম্প এবং পানিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে মাটির বাড়িগুলো  মূলত সমতল জায়গায় অবস্থিত। বাড়িগুলো প্রধানত একতলা; কখনো কখনো দুইতলা বাড়িও গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়। বাড়িগুলোর ছাদ খড়, সি.জি.আই.শিট, গোলপাতার তৈরি হয়। বাড়ির মেঝে ভূমি থেকে ১.০-১.৫ ফুট উঁচু হয়। ঘরের দেওয়ালগুলো gravity load বহন করে এবং তা মাটিত transfer করে। তবে partical load transfer করার জন্য কোন structural system বস ঘরগুলোতে নেই। দেওয়ালগুলো মাটির ভেতরে ১.০-১.৫ ফুট পর্যন্ত ঢুকানো থাকে।
বাংলাদেশে মাটির বাড়ির মূল সমস্যাগুলো হল :
বৃষ্টিপাত এবং বন্যাজনিত সমস্যা : ভেজা দেয়াল যার দরুন মাটির ক্ষয় হয় এবং এর গায়ে ফাংগাসের আক্রমণ হয়।
ফাটল : যে মাটি দিয়ে ঘর তৈরি করা হয় তাতে অধিক পরিমাণে কাদামাটির উপস্থিতির কারণে দেয়ালে ফাটল সৃষ্টি হয় যাতে ঘরের সৌন্দর্যহানি ঘটে।
ভূমিকম্পজনিত সমস্যা : বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্প্রবণ এলাকা। ভূমিকম্পে মাটির বাড়ির অনেক ক্ষতি হয়। বিভিন্ন ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে মাটির বাড়ির ভাঙনের ৩টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা যায়:
ক.ঘরের কোণে এবং দুইটি দেয়ালের সংযোগে ফাটল। মাটির duty অনেক কম। তাই yielding একবার শুরু হলে যে ফাটল সৃষ্টি হয় তা কেবল বাড়তেই থাকে।
খ.মাটির রকগুলোর মধ্যে যে mortal ব্যবহার করা হয় তা অত্যন্ত নিম্নমানের। তাই মাঝারি আকারের ভূমিকম্পের ফলেই ব্লকগুলোর জোড়া আংশিক বা পুরোপুরি খুলে যায়। মাঝেমাঝে দেয়ালগুলোর মাঝের জোড়াও খুলে যায় এবং দেয়ালগুলো out-of-plane- এ ভেঙেপড়ে।
গ.ভূমিকম্পে মাটির বাড়ির দুর্বলতার আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে এর ভর অত্যধিক বেশি। কেননা ভয় যত বেশি হয় ভূমিকম্প দ্বারা প্রযুক্ত বলও তত বেশি হয়।
এখানে বর্ণিত সমস্যাগুলোর সমাধানের লক্ষ্যে নানান ধরনের পদ্ধতি আলোচনা করা হল :
বৃষ্টিপাত এবং বন্যাজনিত সমস্যার সমাধান : এক্ষেত্রে বাড়ির গঠনগত উন্নয়ন ও পরিবর্তন, যেমন ভালো foundation দিয়ে উঁচু জায়গায় বাড়ি করা, ঘরের ছাদের প্রান্ত দেয়াল থেকে বেশ খানিকটা দূরে রাখা, দেয়ালে protective coating ব্যবহার করা, এর সাথে সাথে মাটির গঠনগত উন্নয়নও প্রয়োজন। ঘর বানানোর জন্য মাটি তৈরি করা, এর স্থায়িত্ব এবং কর্মক্ষমতা বাড়ানোর জন্য alker technology ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে কাদামাটির সাথে (৮% ক্লে) জিপসাম মিশিয়ে মাটির ভারগ্রহণ ক্ষমতা বাড়ানো হয় এবং মাটি খুব জলদি শক্ত হতে শুরু করে।
ফাটলজনিত সমস্যা সমাধান : ব্যবহৃত মাটিতে যদি কাদামাটির পরিমাণ বেশি থাকে তাহলে মাটি শুকানোর সময় কিংবা তাপমাত্রা পরিবর্তনের সাথে সাথে ফাটল দেখা দেয়। এক্ষেত্রে মাটির সাথে যদি প্রাকৃতিক আঁশ যেমন ধানের খড় ব্যবহার করা হয় তাহলে মাটির সবজায়গায় তা সমানভাবে শুকাতে সাহায্য করে, shrinkage কমায় এবং মোটের ওপর ফাটল রোধ করে। ধানের খড় মাটির সাথে মেশানোর সময় তা ছোট ছোট টুকরো করে কাটা হয়; খড়ের টুকরো বড় হলে bond strees develop করে, এত shrinkiage আরেকটু কমে।
ভূমিকম্পজনিত সমস্যার সমাধান : মাটির বাড়ির কোণে ভাঙন, দেয়াল বেঁকে যাওয়া, দেয়ালের জোড়া খুলে যাওয়া কিংবা out-of-plane এ ভেঙে যাওয়া রোধ করার কংক্রিট বীম, স্টিল রড-এ-জাতীয় ব্যয়বহুল সমাধান রয়েছে। কিন্তু এগুলো ব্যবহার করার সামর্থ্য বাংলাদেশের কম আয়ের মানুষের নেই। ধানের খড় কিংবা পাটের আঁশ এক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী সমাধান। মাটির সাথে খড় মেশালে তা মাটির ductility বাড়ায়; যদিও মাটির compressive strength কমে যায়। তা রোধ করার জন্য carbide line মেশানো যায়।
গবেষণা থেকে বলা যায় ২% খড়ের সাথে ৫% carbide line মেশালে তা সবধরনের মাটির জন্যই কার্যকরী। মাটিতে মিশ্রিত খড়ের পরিমাণ বেশি হলে তাতে গভীর ফাটল দেখা যায় এবং strength ও কমে যায়। এতে প্রমাণিত হয়েছে যে, ভঙ্গুর মাটির strength বাড়ানোর জন্য এটি সবচেয়ে ভালো সমাধান। এটি মাটির ductility এবং toughness বাড়ায়। এক্ষেত্রে আঁশের দৈর্ঘ্য ২-৩ সে.মি.-এর মধ্যে থাকা বাঞ্চনীয়। আঁশগুলোর উচ্চ ঘর্ষণক্ষমতা এবং এদের মাঝে ফাঁক না থাকাই এদের অধিক কার্যকারিতার কারণ বলে মনে করা হয়। আবার মাটির ব্লক এবং মর্টারের মধ্যে bonding বাড়ানোর জন্যও পাটের আঁশ খুব উপকারী। তাই বর্তমানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং পরিবেশের কথা চিন্তা করে বলা যায় যে স্থানীয় উপকরণ যথা- পাটের আঁশ, ধানের খড় ইত্যাদির তৈরি মাটির বাড়ি হতে পারে ভূমিকম্প ঝুঁকিতে গৃহসংকট সমস্যার অত্যন্ত যুগোপযোগী সমাধান। (সমাপ্ত)
রেফারেন্স :
আনসারি, এম. এ. ও শরফুদ্দীন, এম. (২০০২) “প্রপোজাল ফর অ্যা নিউ সিজমিক জোনিং ম্যাপ ফর বাংলাদেশ,” জার্নাল অফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, আইইবি, খ ৩০(২), পৃষ্ঠা
বিলহাম, আর, ভি. কে, গৌর ও পি. মোলনার (২০০১), “হিমালয়ান সিজমিক হ্যাযার্ড”, সায়েন্স, ২৯৩।
কারদোনা, সি., আর. ডেভিডসন ও সি. ভিলাসিস (১৯৯৯), “অ্যান্ডারস্ট্যাডিং আরবান সিজমিক রিস্ক অ্যারাউন্ড দ্য ওঅর্ল্ড,” সামারি রিপোর্ট অন দ্য কম্প্যারাটিভ স্টাডি অফ দ্য ইউনাইটেড নেশনস ইন্টারন্যাশনাল ডেকেড ফর ন্যাচারাল ডিজাস্টার রিডাকশন, রেডিয়াস উদ্যোগ।
দুগ্গাল, আর. (১৯৮৯), “এস্টিমেশন অভ সিজমিক রিক্স অ্যান্ড ড্যামেজ, অ্যান্ড দেয়ার ইউটিলাইযেশন অ্যাজ ডিজাইন ক্রাইটেরিয়া,” এম. ইঞ্জিনিয়ারিং থিসিস, ইউনিভার্সিটি অফ টোকিও, জাপান।
নূর, এম. এ., ইয়সিন, এম. ও আনসারি, এম. এ (২০০৫), সিজমিক হ্যাযার্ড অ্যানালিসিস অফ বাংলাদেশ,” বিবরণী, প্রথম বাংলাদেশ ভূমিকম্প সিম্পোজিয়াম, ঢাকা, ডিসেম্বর ১৪-১৫
রহমান, এম. এস. ও আনসারি, এম. এ. (২০০৭), “স্ট্রং মোশন সিজমিক মনিটরিং সিস্টেম ইন বাংলাদেশ,” আইইএসইবি-২ এর বিবরণী, ঢাকা, বাংলাদেশ (অনুষ্ঠান)।
সাবরি, এস. এ, (২০০২), “আর্থকোয়াক ইন্টেন্সিটি-অ্যাটেনিউশন রিলেশনশিপ ফর বাংলাদেশ অ্যান্ড ইটস সারাউন্ডিং রিজিয়ন,” এম. ইঞ্জিনিয়ারিং থিসিস, বুয়েট, ঢাকা, বাংলাদেশ।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, সাভার কলেজ, সাভার, ঢাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ