শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

জনবল সংকটে থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রম চালু হচ্ছে আরও পাঁচ জেলায়

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ’ বাংলাদেশ পুলিশের পৃথক ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা হলেও এর বিশেষত্ব এখনও পূর্ণতা পায়নি। বিশেষ ইউনিটের নামধাম থাকলেও এর কোন পাকাপোক্ত সাংগাঠনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারসহ ৭ শতাধিক পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে বাংলাদেশে। পর্যটন কর্পোরেশনের হিসেবে, প্রতি বছর এসব পর্যটন এলাকায় ৬০ লাখ দেশী-বিদেশী পর্যটক ভ্রমণ করেন। এসব ভ্রমণকারীদের নিরাপদ রাখতেই গড়ে তোলা হয়েছিল পুলিশের এই বিশেষ ইউনিটকে। কিন্তু এতো সংখ্যক পর্যটক ও পর্যটন কেন্দ্রে নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ সদস্য রয়েছেন মাত্র ৫৮১ জন। অন্যদিকে আরও ৬৮৯ জন নতুন জনবল নিয়োগের অনুমোদন মিললেও তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ফলে নামধামের বাহারের ওপর ভর করেই চলছে ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রম ।

এদিকে ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা গড়ে ওঠার আগেই দেশের পর্যটন কেন্দ্র ও পর্যটকদের নিরাপত্তায় শিগগিরই চালু হতে যাচ্ছে আরও পাঁচটি অফিস। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর সূত্রে জানা গেছে, দেশের সম্ভাবনাময় খাতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন শিল্প। এ খাতকে এগিয়ে নিতে ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর চালু করা হয় ট্যুরিস্ট পুলিশ ইউনিট। প্রতিষ্ঠালগ্নে ৬৯৯ পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তা নিয়ে যাত্রা শুরু করে এ ইউনিটটি। এরপর ২০১৫ সাল থেকে শুরু হয় অপারেশনাল কাজ।

সূত্রে প্রকাশ, জনবল নিয়োগে পুলিশ সদর দফতরের অনুমোদনের পর অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও অনুমোদন পাওয়া গেছে। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আটকে রয়েছে চাহিদাপত্রটি। এ জন্য এখনো নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। প্রতিষ্ঠার ২ বছর পরেও ৬৯৯ জন জনবল নিয়েই চলতে হচ্ছে ট্যুরিস্ট পুলিশকে।

বিগত বছরকে (২০১৬) পূর্বেই পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন, ধর্মীয় স্থান, সমুদ্র সৈকত, পাহাড়-দ্বীপ, ঐতিহাসিক স্থান, বন-জলাবন এর মতো ৭ শতাধিক পর্যটন কেন্দ্র পর্যটনকদের জন্য আকর্ষণীয় ও নিরাপদ করার বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পায়। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে ২০টি পর্যটন স্পট। এর মধ্যে শুধু কক্সবাজারেই প্রতি বছর যাতায়াত করেন প্রায় ১৫ লাখ পর্যটক। এতো সংখ্যক পর্যটকের জন্য সেখানে ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল রয়েছে মাত্র ৪০ জন। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলী, সুগন্ধা, সি-বিচ, লাবণী, ইনানী বিচসহ সকল পয়েন্টে পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও জনবল সংকটে নিরাপত্তার বিষয়টি রয়ে গেছে উদ্বেগের পর্যায়েই। একই দশা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় সকল ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতেও।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন। এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিদেশী পর্যটকদের ভ্রমণে আসার পেছনে প্রধান দাবিই থাকে নিরাপত্তার বিষয়। বিশেষ করে যেসব ট্যুরিস্ট স্পটে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের যাতায়াত বেশি সেখানে নিরাপত্তার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করা জরুরি।

ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. নজমুল হোসেন বলেন, দুই বছর আগে ট্যুরিস্ট পুলিশ পথচলা শুরু করলেও এর অপারেশনাল কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে পর্যটন স্পট ও পর্যটকদের নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। কিন্তু মানুষের আগ্রহ ও চাহিদা অনুযায়ী সকল টুরিস্ট স্পটের নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ ইউনিটের প্রধান ডিআইজি সোহরাব হোসেন জানান, পর্যটন শিল্পে ট্যুরিস্ট পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পর্যটন সম্পদ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা, প্রত্ন সম্পদ চুরি রোধ, পর্যটন আকর্ষণ এলাকায় যৌন হয়রানি বন্ধ, বখাটে ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রতিহত, দেশী-বিদেশী পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পর্যটকদের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা, পর্যটন অঞ্চলের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ নানা কাজে জড়িত ট্যুরিস্ট পুলিশ। তিনি বলেন, এসব এলাকায় যানবাহনের পাশাপাশি জনবলের অভাব প্রকট। জনবল পেলে যানবাহনও মিলবে। তখন আরও ট্যুরিস্ট পুলিশের এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।

কার্যক্রম চালু হচ্ছে আরও পাঁচ জেলায় : পর্যটন কেন্দ্র ও পর্যটকদের নিরাপত্তায় শিগগিরই চালু হচ্ছে ট্যুরিস্ট পুলিশের আরও পাঁচটি অফিস। নতুন করে ৬৯৪ জন পুলিশ সদস্য নিয়োগ পাওয়ার পরপরই পর্যটন সংশ্লিষ্ট পাঁচটি জেলায় এ নতুন অফিস চালু করা হবে। ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দফতর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া ও সুন্দরবন এলাকায় এ নতুন অফিস চালু হবে। ফলে পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও পর্যটকদের সহযোগিতায় আরও শক্তিশালী হবে ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রম। তবে জনবল নিয়োগ পাওয়ার ওপর নতুন অফিসগুলো চালুর বিষয়টি নির্ভর করছে বলে জানান ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. নজমুল হোসেন। তিনি বলেন, দেশের ৭ শতাধিক পর্যটন কেন্দ্রে প্রতি বছর দেশী-বিদেশী প্রায় ৬০ লাখ পর্যটক ঘুরতে আসেন। তাদের নিরাপত্তায় রয়েছে মাত্র ৬৯৯ ট্যুরিস্ট পুলিশ। এদের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন মাত্র সাড়ে ৫০০ জন। নতুন জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পুরনো অফিসসহ নতুন পাঁচটি অফিস চাঙ্গা হবে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ট্যুরিস্ট পুলিশের যাত্রা শুরু হয়। একজন ডিআইজি ও এডিশনাল ডিআইজি, চারজন এসপি, আটজন এডিশনাল এসপি ও ১১ জন সহকারী পুলিশ সুপার, ২১ জন ইন্সপেক্টরসহ ৬৯৯ জন পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে এর কার্যক্রম শুরু হয়। রামপুরায় ভাড়া বাসায় গড়ে তোলা হয় ট্যুরিস্ট পুলিশের সদর দফতর। সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয় ঢাকা ডিভিশনের কার্যালয়, ঢাকা জোনের কার্যালয় ও ফোর্স ব্যারাক।

প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মধ্যেই কক্সবাজার, টেকনাফ, কুয়াকাটা, সিলেটের জাফলং, বিছানাকান্দি, মাধবকুন্ড, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সোনারগাঁ জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ও জাতীয় চিড়িয়াখানায় ট্যুরিস্ট পুলিশ তাদের কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়। এখন নতুন করে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া ও সুন্দরবন এলাকায় চালু হচ্ছে ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রম।

নওগাঁ এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটের মধ্যে রয়েছে- কুসুম্বা মসজিদ, মান্দা, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার। এছাড়া বলিহার রাজবাড়ী, পতিসর কাচারিবাড়ী, জবাইবিল, ধামইরহাটের জগদ্দল বিহার, আলতাদীঘি, মাহি সন্তোষ, ভীমের পান্টি, ধামইরহা, দিব্যক জয়স্তম্ভ, ঠাকুর মান্দা মন্দির, হাঁপানিয়া খেয়াঘাটেও আকর্ষণের কমতি নেই।

নাটোরের দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে- উত্তরা গণভবন, দয়ারামপুর রাজবাড়ী, রাণী ভবানী রাজবাড়ী, চলনবিল, শহীদ সাগর, ফকিরচাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইজির আশ্রম, বনপাড়া লুর্দের রাণী মা মারিয়া ধর্মপল্লী।

বগুড়ার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে- মহাস্থানগড়, বেহুলা লখিন্দর (গোকুল মেধ), দেওতা খানকাহ্ মাজার শরিফ, বাবা আদমের মাজার ও আদমদীঘির প্রখ্যাত দীঘি, সান্তাহার সাইলো, জয়পীরের মাজার, দুঁপচাচিয়া, বাবুর পুকুরের গণকবর, সারিয়াকান্দির পানিবন্দর, পাঁচপীর মাজার কাহালু, ঐতিহাসিক যোগীর ভবনের মন্দির ও সাউদিয়া সিটি পার্ক।

গোপালগঞ্জে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধ কমপ্লেক্স, ওড়াকান্দি ঠাকুর বাড়ি, জমিদার গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়ি, অন্যন্যা চন্দ্র ঘাট, উলপুর জমিদার বাড়ি, বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধসহ সুন্দরবনের সৌন্দর্য বিশ্বজোড়া সুনাম রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ