সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

ফল চাষে অভূতপূর্ব সাফল্য

প্রকৌশলী এস এম ফজলে আলী : সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আবহমান বাংলাদেশ। এদেশের মাটিতে সোনা ফলে। মাটি-মানুষ-পানি এদেশের বড় সম্পদ। বাংলাদেশ কৃষিভিত্তিক আবহমানকালের সুখের দেশ ছিল। এদেশের সম্পদের লোভে বহু বর্গী এদেশে হামলা চালিয়েছে। বৃটিশরা তো দু’শ বছর এ দেশকে শাসন-শোষণ করে গেছে। এতদসত্ত্বেও আজও বাংলাদেশ তার কৃষ্টি-ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে সমাজে মাথা উঁচু করে আছে। এককালে এদেশের প্রতিটি গ্রাম-গঞ্জ স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। মানুষকে বিদেশের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য হাত বাড়াতে হয়নি। কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় আগে কখনো এদেশকে খাদ্য শস্যের জন্য অন্যের দ্বারস্থ হতে হয়নি। কিন্তু বিদেশি বেনিয়াদের শাসন-শোষণে কিছুদিন এদেশ অভাব অনটনে পড়েছিল। স্বাধীন হওয়ার পর সর্বপ্রথম এদেশের কৃষকরা ঘুরে দাঁড়ায়। কৃষকের হাড়ভাঙ্গা খাঁটুনিতে অল্পদিনেই কৃষিতে বিপ্লব আসে। অন্যান্য উন্নত দেশের কৃষকরা সরকার থেকে যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে থাকে আমাদের কৃষকরা কিন্তু তা পায় নাই। কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তায় আমাদের অশিক্ষিত চাষিরা ঘুরে দাঁড়ায় এবং ফসল উৎপাদনে বিপ্লব আনে। স্বাধীনতার পরে যেখানে বার্ষিক উৎপাদন ছিল মাত্র ৭০ লাখ টন, আজ তা বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টনে। এর মধ্যে শাকসবজি ও ফল-ফলাদি ধরা হয়নি।
আজকে আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো বাংলাদেশে ফল উৎপাদনের কিছু কথা। ফল-ফসলে এদেশের সুনাম বহু পুরাতন। আজকে সে ফল চাষ দিন দিন দ্রুত বাড়ছে। বারো মাসেই এখন বাংলাদেশে ফল চাষ হয়। ফল চাষে কৃষকরা লাভবান হওয়ায় তারা এর চাষ দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতি বছরেই ফলের চাষ বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফল উৎপাদনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে দেশে ফলের জমি ছিল ৪ লাখ ৭৮ হাজার ১৪৫ হেক্টর। এ পরিমাণ জমিতে ফল উৎপাদন হয়েছে ৯৯ দশমিক ৭২ লাখ টন। ২০১৪-১৫ সালে ৬ লাখ ৯৩ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে ফল উৎপাদন হয়েছে ১০৬ দশমিক ৮ লাখ টন। এক বছরের ব্যবধানে ফলের উৎপাদন বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৬ লাখ টন। কৃষি বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন বারো মাসই ফল উৎপাদন আরো কিভাবে বাড়ানো যায়। অনেক ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছেন। যেমন বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের আম এখন ৭ মাস ধরে পাওয়া যায়। ১২ মাস থাই পেয়ারা উৎপাদনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আধুনিক প্রযুক্তি তথা হরমোন ব্যবস্থাপনা করে এখন ১২ মাস আনারস উৎপাদন করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, সারা দেশে ১৭৩টি হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে সেন্টারের কর্মীরা বিভিন্ন ফলের লক্ষ লক্ষ চারা ও কলম উৎপাদন করে তা কৃষকের মাঝে বিতরণ করছে। তাছাড়া বর্তমানে বেসরকারি পর্যায়ে সারাদেশে হাজার হাজার নার্সারী গড়ে উঠছে। কৃষকরা সেখান থেকেও সহজ মূল্যে ফলের চারা সংগ্রহ করে থাকেন। জলবায়ুর পরিবর্তন ও স্থানীয় আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে বিজ্ঞানীরা ফল গাছের শ্রেণীবিন্যাস করেছেন। যেমন উত্তরাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল বা উপকূলীয় অঞ্চলে কোন কোন ফলের উৎপাদন ভাল হবে, সে অনুযায়ী ৫০ থেকে ৬০ ধরনের বিভিন্ন ফলের চারা ও কলম সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে কৃষকরা খুবই লাভবান হচ্ছেন। এসব চারা তাদের কাছে ন্যায্যমূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে করে কৃষকরা ভাল জাতের কলমের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন। ড্রাগন ফল, স্ট্রবেরী, থাই পেয়ারার যারা কখনই নাম শোনেননি; তারাই আজ এ ফসল চাষ করে উচ্চমূল্যে বাজারে বিক্রি করছেন।
কিছুদিন আগেও মাল্টা ফল সম্পূর্ণ বিদেশনির্ভর ছিল। এখন দেশে উৎপাদিত এ ফল দেশের পুরো চাহিদা মিটাচ্ছে। সে সময় বেশি দূরে নয়, যখন এ ফল দেশের পুরো চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব হবে। গবেষণার মাধ্যমে আমাদের উৎপাদিত ফলের আর্লি ও লেট ভ্যারাইটি উদ্ভাবন করেছে কৃষি গবেষণাবিদরা। ফলে প্রথম আম পাকার শুরু থেকে প্রায় ৭ মাস পর্যন্ত আম পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশে। এক যুগ আগেও যা ছিল অকল্পনীয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মোতাবেক গত ৪ বছরে আম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, পেয়ারা ও আনারসের মত দেশী ফল উৎপাদন দ্রুত হারে বাড়ছে। সংস্থাটির ২০১৫ সালের প্রধান ফসলের পরিসংখ্যান বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ১৮ প্রজাতির ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে এবং উৎপাদন নিয়মিত হারে বাড়ছে। সংস্থাটির ২০১৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয় যে, গত ৪ বছরে দেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন বেড়েছে পেয়ারার। এ সময় পেয়ারার চাষ দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। ৯০-এর দশকে কাজী পেয়ারা চাষের মধ্য দিয়ে উন্নতজাতের পেয়ারার চাষ শুরু হয়। পরবর্তী সময় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর (বারি) উদ্ভাবিত ছয়টি ভ্যারাইটি উন্নতজাতের পেয়ারা এবং বেসরকারিভাবে আমদানি হওয়া থাই পেয়ারার চাষে দেশে রীতিমত বিপ্লব ঘটে গেছে।
বিবিএস’র হিসেব মোতাবেক ২০১১-১২ সালে দেশে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে পেয়ারার ফলন হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টন। ২০১৪-১৫ সালে দেশে প্রায় ২ লাখ টন লিচু, ৪ লাখ ৭০ হাজার টন পেঁপে, ৪০ হাজার টন কমলা, ৩ লাখ ৭০ হাজার টন আনারস ও ১ লাখ ৫৫ হাজার টন কুল উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আমের উৎপাদন। আর মোট ফল উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি টন। ২০১৪-১৫ সালে দেশে আম উৎপাদিত হয়েছিল ১২ লাখ ৫০ হাজার টন। আর তা ২০১৫ সালে বেড়ে হয়েছে ১৫ লাখ টন। শুধু উৎপাদনই বাড়েনি, বাংলাদেশ থেকে ফল রফতানি প্রতিবছর বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে দেখা যায়, গত ৫ বছরে ফল রফতানিতে আয় আড়াই গুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০০৯-১০ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩৮৮ কোটি টাকার ফল রফতানি করেছে। ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ এই দুই অর্থবছরে তা বেড়ে ৭৮০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসেবে ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ফলের উৎপাদন ৫ থেকে ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে। আম, পেয়ারা ও কুল বা বরইয়ের কয়েকটি নতুন জাত উদ্ভাবিত করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গত ৫ বছরে ৮৪টি ফলের নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। এ কারণে হেক্টরপ্রতি ফলন আগের তুলনায় অনেকগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের হর্টিকালচার বিভাগ থেকে জানা যায়, ফলের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য তারা বহুমুখী গবেষণা ও নতুন জাতের উৎপাদন করে যাচ্ছেন। নতুন নতুন ভ্যারাইটি ফলের উদ্ভাবন করতে সক্ষম হওয়ায় প্রতি বছর তা চাষে ফলের উ]পাদন আশাতীতভাবে যেড়ে চলছে। এছাড়া ফল উৎপাদনে অন্যান্য ফসলের চেয়ে লাভ বেশি। দেশে কৃষকরাও ফল উৎপাদনে ঝুঁকছে। এ বছর তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপকভাবে আম চাষ হয়েছে। আগে পাহাড়ে কখনই পরিকল্পিতভাবে আম চাষ হতো না। থাই পেয়ারা কৃষকের দুর্দিন ঘুচিয়েছে, কৃষকদের ট্রেনিংসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতার কারণে। পলিব্যাগ পড়িয়ে ফলের উৎপাদন বাড়াচ্ছেন। জানা গেছে, পিরোজপুরে এক ব্যক্তির ৫০ বছরের মাল্টা বাগান আছে। এ এলাকায় ৩২০টি মাল্টা বাগান গড়ে উঠেছে। মাল্টা চাষে সফলতার কারণে এখানে একটি গ্রামের নামকরণ হয়েছে ‘মাল্টা গ্রাম’। নতুন উদ্ভাবিত ছোট জাতের নারিকেল গাছ চাষ করে কৃষকরা ভাল সফলতা পেয়েছেন। এসব গাছ ঝড়-বাদলে নষ্ট হয়না। এ গাছে ফলনও বেশি পাওয়া যায়। তাছাড়া নারিকেল গাছের পরিচর্যা করা, নারিকেল সংগ্রহ খুবই সহজ। নারিকেলের প্রতিটি অংশই ব্যবহার করা যায়।
দেশে ফল উৎপাদনে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাক। এর জন্য কৃষক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে ও থাকবে। একজন সুস্থ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে পরিমাণ ফল খাওয়া প্রয়োজন, সে কাক্সিক্ষত পর্যায়ে দেশ পৌঁছেনি। আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে সবাইকে আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে।
লেখক : পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ