সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

যানজট নিরসণের সহজ উপায়-‘নৌপথ’

মো: হাসিবুর রহমান : ঢাকা শহরের রাস্তার অসহ্য যানজট, ধোঁয়া-ধূলিময় পরিবেশে রাস্তায় বসে থাকা হচ্ছে শহরবাসীর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।’ জনদুর্ভোগের শহর ঢাকা, এ কথা নতুন নয় কেননা ঢাকা শহরের নেই কোন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। বর্তমানে এ শহর মানুষের সুস্থভাবে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে আর ভবিষতের কথা তো দূরেই থাক। যানজটে বসে না থেকে দু-চার মাইল হেঁটে যাওয়ারও উপায় নেই, শহরের সকল ফুটপাত অবৈধভাবে দখল করে প্রশাসনের নাকের ডগায় হকাররা চুটিয়ে ব্যবসা করছে। ফুটপাতে অবৈধ দখল করে ফল-মূলের ব্যবসা, বই, মনোহারী ও পেশাক ইত্যাদি নানান ব্যবসার কারণে সব সময় ফুটপাত দখলের পাশাপাশি ফল-মূল, শাক-সব্জি, ঠোঙ্গা-পলিথিন যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি করে এবং রাস্তায় জানযটের সৃষ্টি করে। অপরদিকে, সিটি কর্পোরেশনের ও প্রশাসনের উদাসীনতায় বর্তমানে বৈধ রিকশার চেয়ে অবৈধ রিকশার সংখ্যায় বেশী যা কিনা ঢাকা শহরের যানজটের প্রধান এবং অন্যতম কারণ। বর্তমান সরকার ফুটপাত জনসাধারনের জন্য মুক্ত করার জন্য লক্ষ্যে যথেষ্ট চেষ্টা করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে, যানজট নিরসণের খুব দ্রুত ও সহজ উপায় হচ্ছে-নৌপথ। অসহনীয় যানজট নিরসনের জন্য ঢাকার চারপাশে নিয়মিতভাবে নৌপথ চালু করতে হবে। নৌপথে চলাচলের জন্য সদরঘাট থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত নৌপথে সচল করতে হবে। অন্যদিকে আশুলিয়া বাজার থেকে টঙ্গী হয়ে রামপুরা ও বেগুনবাড়ী, হাতিরঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে বাংলামোটর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এবং কল্যাণপুর থেকে সদরঘাট পযর্ন্ত নৌপথ চালু করলে ঢাকা শহরের দ্রুত যানজট কমে আসবে। এ জন্য নৌপথকে নিয়মিত ও জনপ্রিয় করতে প্রয়োজন হবে পর্যাপ্ত জননিরাপত্তা, সেজন্য নৌ-পুলিশের ব্যবস্থা করতে হবে।
তাছাড়া, ঢাকা শহরে মিনিবাস, টেম্পু ও একতলা বাস সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে শুধুমাত্র দ্বিতলবাস এর ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা, দ্বিতলবাস হচ্ছে দ্বিতল রাস্তার বিকল্প সমাধান। এতে করে রাতারাতি ৫০ ভাগ যানজট কমিয়ে আনা সম্ভব। একটি দ্বিতলবাস ২টি একতলা বাসের যাত্রী ধারণ করতে পারে এবং ১টি দ্বিতলবাস ৪টি মিনিবাস এর যাত্রী ধারন করতে পারে। তাছাড়া দুই টি মিনি বাসের আয়তনের রাস্তার জায়গা সাশ্রয় হবে ১টি দ্বিতল বাসের মাধ্যমে। এতে করে যানজট অর্ধেকে নেমে আসবে। সেই অনুযায়ী দুটি বাসের জ্বালানী একটি দ্বিতল বাসে সাশ্রয় হবে ফলে জ্বালানী তেল বা গ্যসের অহেতুক অতিক্তি খরচ সাশ্রয় হবে। এই প্রকল্প গ্রহণ করলে তিগ্রস্ত মিনিবাস ও একতলা বাসসমূহের মালিকগণকে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণের উপর নির্ভর করে দ্বিতলবাস এর শেয়ার দিতে হবে। ঢাকা শহরের দ্বিতল বাস এর মালিকানা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রথায় সরকারী ও বেসরকারী বিনিয়োগ সমন্বয় করলে দিবতলবাস এর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব  হবে এবং যানজট দ্রুত কমিয়ে আনা সম্ভব।
যানজট নিরসনের জন্য ঢাকা শহরকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে ব্যাংক এর নতুন শাখা, বীমা ও শিল্প-কারখানা অন্যান্য বিভাগে স্থানান্তরের অনুমতি দিতে হবে এবং সমানহারে নতুন শাখা, বীমা ও শিল্প-কারখানা অনান্য শহরে উন্নয়ন করতে হবে। শহরের আবাসিক এলাকা থেকে শিল্প-কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলেজ ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় শহরের বাইরে পাঠানোর কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঢাকা শহর থেকে মৎস্য ভবন, খামারবাড়ী, বিএআরসি, বনভবন, বিএডিসি, কোস্টগার্ড ভবন, পাট গবেষণা ইত্যাদি অফিস সমূহ উপযুক্ত কার্যকরী স্থানে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে কেননা এগুলোর ঢাকা শহরে কোন প্রয়োজন নেই। রাস্তার দু’পাশে অবৈধ গাড়ী পার্কিং কঠোর আইনের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে এবং জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে, শহরের সকল বাণিজ্যিক ভবনে গাড়ী পার্কিং এর স্থানের জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্বের প্রতিটি দেশে শহরগুলি সাজানো হয় সুদূরপ্রসারি পরিকল্পণার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নাগরিক সুবিধার দেয়ার সুস্পষ্ট রূপরেখার মাধ্যমে। শহরগুলোতে থাকে বিভিন্ন জোনিং ব্যবস্থা অর্থাৎ এলাকা ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা, শিল্প-কারখানা, পার্ক-বিনোদন, খেলার মাঠ, বিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত ইত্যাদির জন্য নির্দিষ্ট আলাদা আলাদা স্থান নির্ধারণ করা হয়। রাস্তার পরিমাণ কমপে ২৫ শতাংশ রাখা হয় যাতে করে শহরের নাগরিক তাদের জীবন ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে করতে পারে। এ লক্ষ্যে উন্নত বিশ্বের শহর পরিকল্পনাবিদগণ সুদূর পঞ্চাশ অথবা একশত বছরের শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা মাথায় রেখে শহরকে সাজিয়ে থাকে। ফলে আমাদের মতো বছর বছর রাস্তা  খোঁড়াখুঁড়ির প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যায় এক বছরেরও পরিকল্পনা নেই।
একই বছরে ওয়াসা রাস্তা খুঁড়ে তাদের কাজ করে গেলে কয়েক মাস পরে আবার একই রাস্তা খুড়তে আসে গ্যাসের লাইন প্রতিস্থাপন করতে আবার কয়েক মাস পরে আসে পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য এভাবে চলতে থাকে রাস্তা খুঁড়াখুঁড়ি আর মেরামতের খেলা। রাস্তা খুঁড়াখুঁড়িতে বেড়ে যায় জনদুর্ভোগ ও তীব্র যানজট মনে হয় সেদিকে দেখার কেউ নেই। তাছাড়া দেখা যায় পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য খুঁড়াখুঁড়ি চলে রাস্তার মাঝখান কেটে। কেন এভাবে রাস্তার মাঝখান দিয়ে কাটা হয় সে উত্তর কর্তৃপই জানে।
রাস্তার মাঝখানে খুঁড়ে পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করলে পরবর্তীতে দেখা যায় ম্যানহোলের ঢাকনা বাস-ট্রাক ও গাড়ীর চাকার বাড়ি খেয়ে খেয়ে ভেঙে যায় তৈরি হয় যানজট ও দুর্ঘটনার নতুন পন্থা। ওয়াসা, গ্যাস ও পয়ঃনিষ্কাশনের সহ অনান্য নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থাসমূহের জন্য রাস্তা না খুড়ে ফুটপাতের নীচে দশ ফুট প্রস্থ ও দশ ফুট গভীরতার টানেল বানিয়ে এ ব্যবস্থা সমূহের কাজ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে আনলে জনর্দুভোগ কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে আশা করি।
যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করতে হবে তেমনিভাবে রাস্তার উল্টোদিক দিয়ে রিক্সা, হোন্ডা বা গাড়ি চালানো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। সরকারীভাবে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে স্পিডলিমিট ও অবৈধ পাকিং নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বিশেষ করে জনসাধারনরে দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে ট্রাফিক পুলিশকে সচেতন হতে হবে। যানজট নিরসনে এবং দেশের উন্নয়নে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে এবং ঢাকা শহরকে বসবাসের উপযোগী করে তোলার প্রচেষ্টা করতে হবে।
লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও পিএইচডি গবেষক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ