সোমবার ৩০ নবেম্বর ২০২০
Online Edition

রাষ্ট্র ও সমাজে এলিটতত্ত্ব

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : [দুই]
অভ্যাস ও কৌশল: অভ্যাস ও কৌশলে প্রভাবশালী গোষ্ঠী ক্ষমতা গ্রহণ ও তা সংরক্ষণ করে। তাদের অভ্যাস ও কৌশলের উপর কর্তৃত্ব ও প্রতিপত্তি অনেকাংশে নির্ভরশীল। কলাকৌশল যদি সফল হয়, তাহলে জনসাধারণ আপনা থেকেই অনুকরণ করে। এগুলো যদি সফল না হয়, তাহলে ব্যর্থ হবারও সমূহ সম্ভাবনা আছে। তাই বলা যায়, তাদের ব্যর্থতা ও স্বার্থকতা বহুলাংশে নির্ভরশীল হয় গৃহীত অভ্যাস ও কলাকৌশলের উপর। ‘‘বিস্তারিত আলোচনার জন্য দেখুন, আবুল কাসেম, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩০-১৩৪’’
বর্তমান রাজনৈতিক অনুশীলনে এলিট মতবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ইতালীর অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানী ভেলফ্রিডো প্যারোটো (Valfredo Pareto), রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্যাটেনো মোস্কা (Gaetano Mosca), জার্মান সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মিশেলস (Robert Michels), মার্কিন রাষ্ট্র বিজ্ঞানী হ্যারল্ড ডি, ল্যাসওয়েল (Harold D. Lasswell), এবং অন্যরা এ মতবাদের প্রবক্তা। তবে তাদের মধ্যে মোস্কা ও প্যারেটের লেখনীতে এই মতবাদ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মতবাদের মূল বক্তব্য হল, প্রত্যেক সমাজে কিছু সংখ্যালঘু ক্ষমতাশীল ব্যক্তি থাকে, যারা অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমাজের মূল চালিকা শক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। বিপুল সংখ্যক লোক তাদের অনুকরণ করতে বাধ্য থাকে। প্রত্যেক সমাজে প্রভাবশালী ও অ-প্রভাবশালী ব্যক্তি আছে এবং যারা প্রকৃত প্রভাবশালী তারাই সমাজ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শাসকের ভূমিকায় থাকে। এদের সংখ্যা কম, তবে সম্পদ ও শিক্ষায় শীর্ষে অবস্থিত। নিজেদের স্বার্থে তারা ক্ষমতা ব্যবহার এবং সমাজের অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। অপরদিকে সাধারণ জনগণের সংখ্যা বেশি কিন্তু শিক্ষা ও সম্পদে কম এবং সিদ্ধান্ত প্রদানে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। এরা বিত্তহীন শ্রেণী এজন্য তারা রাষ্ট্রের কম পরিমাণ সুবিধা ভোগ করতে পারে। মোস্ক (Ruling Class) গ্রন্থে সমাজের মানুষের মধ্যে শাসক ও শাসিতের চিরাচরিত ঐতিহাসিক এই শ্রেণী বিভাগ আলোচনা করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুর এই শাসন অবশ্যম্ভাবীই। রাজনৈতিক ধারায় তাদের প্রভাব চিরন্তন। রাজনৈতিক ক্ষেত্র হল প্রভাবশালীদের আলোচনার অঙ্গন মাত্র। তারা যা পাবার তার অধিকাংশই পেয়ে থাকে। অধিকাংশ প্রাপ্ত শ্রেণীই এলিট এবং অবশিষ্ট সাধারণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। সমাজবিজ্ঞানী প্যারেটোর মতে, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ধর্মীয় কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিবর্গ হল এলিট শ্রেণী। এরা সমাজের ও রাষ্ট্রীয় জীবনের নীতিমালা নির্ধারণকারী। প্রজাতন্ত্রই হোক না কেন, সাধারণ জনগোষ্ঠীর প্রকৃত কোনো ক্ষমতা থাকে না। প্রকৃতপক্ষে জনগণ শাসক নির্বাচন করে না বরং শাসকগণ জনগণকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বাধ্য করে তাদের নির্বাচন করার জন্য। এজন্য প্যারেটো বলেছেন, ‘সকল সমাজে সরকার ব্যবস্থা তাদের এলিট দ্বারা শাসিত হয়।’ গণতন্ত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটে না। পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও দেখা যায়, প্রকৃত ক্ষমতা থাকে মূলত কতিপয় ব্যক্তির উপর।
একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা কী তা জানতে হলে প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন উক্ত সমাজের ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা লোভীদের সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান রাখা। গণতন্ত্র জনগণের শাসন অর্থাৎ শাসন প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ জনগণের অংশগ্রহণের সুবিধা থাকে। মূল সিদ্ধান্ত আসে জনসাধারণের পক্ষ থেকে। জনমত না জেনে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যায় না। কিন্তু আসলে গণতান্ত্রিক সমাজেও এলিট শ্রেণীর প্রভাব সর্বক্ষেত্রে সমান অনুভূত হয়। মার্কসের কথায়, মানব জাতির ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস কিন্তু এই মতবাদে বিশ্বাসীদের মতে, সমাজের ইতিহাস হচ্ছে শাসক শ্রেণীর ইতিহাস। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রসহ সকল ব্যবস্থাতেই এটা একটি অমোঘ বিধান। তাই যে কোনো রাজনৈতিক ক্রিয়া পর্যালোচনার জন্য সে সমাজের এলিট শ্রেণী সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
প্যারেটো ইতালীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৮৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। এলিট মতবাদের তিনি একজন উল্লেখযোগ্য প্রবক্তা। তার ধারণা (The Socialist System Ges The Mind and Society) নামক গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ছিলেন অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানী। এলিটের সংজ্ঞা প্রদান করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘প্রত্যেক জনসমষ্টিই এক এলিট গ্রুপের দ্বারা শাসিত হয়, আর এলিট গ্রুপ হচ্ছে জনসংখ্যার উৎকৃষ্ট উপাদান।’’ ‘’V. Pareto, The Mind and Society, opcit, p. 246’’ তার মতে, কিছু ব্যক্তি কার্যক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে এবং তারাই এলিট। সমাজে দু’টি স্তর আছে যথা: উচ্চস্তর এবং নিম্নস্তর। উচ্চস্তরে থাকে এলিট শ্রেণী। তিনি প্রথমে প্রমাণ করেছেন যে, সকল সমাজে ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। যে সকল ব্যক্তি কার্যক্ষেত্রে স্বীয় গুণ বা যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে তারাই এলিট এবং বাকিরা নন-এলিট বা সাধারণ শ্রেণী। যারা নিম্নস্তরে তারা নন-এলিট এবং যারা উচ্চস্তরে বসবাস করে তারা এলিট সম্প্রদায়ভুক্ত। এলিটকে আবার শাসনকারী এলিট (Governing Elite) এবং অ-শাসনকারী এলিট (Non-Governing Elite)-এ ভাগ করেছেন। সরকার পরিচালনায় যারা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে তারা শাসনকারী এলিট এবং যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না, তারা অ-শাসনকারী এলিট সম্প্রদায়। শাসনকারী বা ক্ষমতাসীন এলিটরা শক্তি প্রয়োগে বা কৌশলে হলেও জনসমর্থন আদায়ে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় টিকে থাকে। কিন্তু তারা সব সময়ে ক্ষমতায় অবস্থান করতে পারে না, এক সময়ে শাসনকারী এলিট ক্ষমতাচ্যুত হয়। তাদের স্থানে আবার অন্য এলিট এসে ক্ষমতা দখল করে। এই প্রবণতাকেই এলিটের আবর্তন বা ক্রমঘূর্ণনবাদ (Circulation of Elite) বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি (The Mind and Society) গ্রন্থে এলিটের আবর্তন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কোনো এলিট শ্রেণী সব সময়ে ক্ষমতায় থাকে না, অন্য এলিটগোষ্ঠী সে ক্ষমতা দখল করে। কোনো না কোনো সময়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে তারা দুর্বল এবং পরিশেষে ক্ষমতাচ্যুত হয়। এমনিতে নতুন এলিট ক্ষমতায় আসে। সমাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ক্ষমতাসীন এলিটগণ ক্ষমতালোভী এলিটদের দ্বারা অপসারিত হয়। তারা আবার ক্ষমতায় এলে নতুনভাবে আগত ক্ষমতালিপ্সু এলিটদের দ্বারা পদচ্যুত হয়। এই প্রক্রিয়ায় এলিটের আবর্তন চলতেই থাকে। তিনি বলেন, শাসনকারী এলিটরা চিরদিন ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম হয় না, কারণ শাসনকারী এলিট সব সময়ে ক্ষমতায় থাকার গুণাবলী রক্ষা করে চলতে পারে না। অ-শাসনকারী এলিট ইত্যবসরে এলিটের সম্ভাব্য গুণাবলী অর্জনের মাধ্যমে উক্ত শ্রেণীভুক্ত হয় এবং অবশেষে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে। এলিটগণ ক্ষমতায় থাকার জন্য শঠতা, প্রবঞ্চনা এবং শক্তির আশ্রয়ও নিতে পারে। এই জন্য তাদের ম্যাকিয়াভেলির (The Prince)-এ বর্ণিত শাসকের গুণাবলী অর্থাৎ সিংহ ও শৃগালের চরিত্রের সমন্বয় বলে মনে করা হয়। চাতুরীতে তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন প্রকার প্রচারণা চালায়। এক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন অনুভব করা হয় না। অন্যথায় তারা বল প্রয়োগের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগে অ-শাসনকারী এলিট শাসনকারী শ্রেণীর মধ্যে হয় অনুপ্রবেশ করে, নয়তো বা বিপ্লবের দ্বারা ক্ষমতাশীল এলিটদের উৎখাতে ক্ষমতায় বসে। প্রথমে যখন ক্ষমতায় বসে তখন সিংহের মতো শক্তি প্রয়োগ করে প্রতিবাদীদের দমন করা হয়। পরে সাধারণ মানুষের মন জয়ের জন্য শৃগালের মতো ধূর্ত প্রক্রিয়ায় আশ্রয় নেয়, কারণ কোনো অবস্থাতেই শুধু শক্তি প্রয়োগে চলা সম্ভব নয়। এই প্রবণতার অনুপ্রবেশের ফলে শক্তি প্রয়োগকারী ক্ষমতা লোপ পায়। ইত্যবসরে অ-শাসনকারী এলিট সম্প্রদায় শক্তির সঞ্চয়ে তাদের অপসারণের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। এই প্রক্রিয়া নিরন্তন চলতেই থাকে, তাই সমাজ সব সময়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দ্বারাই শাসিত হয়। রবার্ট মিশেলস যথার্থ বলেছেন, ‘‘তত্ত্বটি প্রমাণ করেছে যে, কোনো সমাজই প্রভাবশালীদের ভিন্ন চলতে পারে না কিন্তু এই প্রভাবশালীদের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পায়।’’ ‘’Robert Michels, First Lectures in Political Sociology, (New Yourk; Harper & Row Publisher, 1949), p.63’’ তার এলিটের ঘূর্ণমান বা চক্রবৎ তত্ত্বের বহু সমালোচনা আছে। যেসব নিম্নরূপ :
১) তার তত্ত্বের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তিনি যে তত্ত্ব প্রদান করেছেন, তা মূলত প্রাচীন রোমের প্রভাবশালীদের অনুকরণে বলেছেন। এর সাথে অন্য সমাজ ব্যবস্থার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে প্রমাণ নেই বললেই চলে। সব সময়ে যে পরিবর্তন অবধারিত হবে সেটাও যথার্থ নয়।
২) তার অভিমতের সাথে আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনের কোনো মিল নেই। কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শুধু ছলনা বা শক্তি সরকারী ক্ষমতার ভিত্তি নয়। এজন্য জনপ্রিয়তা অর্জন করতে হয়। জনগণ যাদের রায় দেয় তারাই ক্ষমতায় আসীন হতে পারে।
৩) শাসনকারী এলিট এবং অ-শাসনকারী এলিট কীভাবে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে তা তিনি কিছুই বলেননি।
৪) আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনে জনসাধারণও যে ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে সে সম্পর্কে কোনো দিক নির্দেশনা দেননি। জনগণ এলিট নয় কিন্তু তারা সময়মত ক্ষমতার শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে পারে।
৫) সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের পরিবর্তন হতে পারে সে সম্পর্কে আলোচনা করেননি।
৬) তিনি দু’শ্রেণীর এলিটের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের দ্বারা এলিট ঘূর্ণনমানের ব্যাখ্যা দিয়েছেন কিন্তু মৌখিক চাহিদা (Residuals) এবং সামাজিক আদর্শ (Derivations) এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় তা মূর্ত হয়নি।
সমালোচনা আছে সত্য, তবে তিনি যা বলতে চেয়েছেন, তাহলো, প্রতিটি সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাতে প্রভাবশালী সংখ্যালঘু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে শাসন করে। কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী এককভাবে শাসন করতে পারে না, সেজন্য তাদের পতন হয় এবং অন্য শ্রেণী প্রভাবশালিত্ব অর্জনে দেশ শাসন করে। তিনি আরো বলেছেন যে, এলিট শ্রেণীর ক্ষমতায় টিকে থাকার ভিত্তি শুধু শক্তি নয়, এজন্য সমর্থনও আবশ্যক। তাই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আবশ্যক সমর্থন ও শক্তি প্রয়োগের সুনিপুণ সমন্বয়। তবে ক্ষমতার যে বদবদল হয় তা সকল দেশেই বর্তমান। সুতরাং সমালোচনা থাকলেও তার তত্ত্বকে একদম বাতিল করা যাবে না।
গ্যাটেনো মোস্কা ইতালির একজন সমাজবিজ্ঞানী। তিনি ১৮৫৮ সালে জন্মগ্রহণ এবং ১৯৫১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি টুরি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ছিলেন। পরবর্তীতে ইতালির রাষ্ট্রীয় কার্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিজ চোখে দেখেন। তিনি লেনিন ও ইতালির চরম একনায়ক মুসোলিনীর সমসাময়িক। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Ruling Class ১৮৯৬ সালে লিখিত। গ্রন্থটি ১৯৩৯ সালে ইংরেজীতে অনুদিত হয়। ইতালি ভাষায় এর নাম ছিল (Elementi di scienza politica) ‘‘সৈয়দ নজরুল ইসলাম, রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব, (ঢাকা; পুথিঘর লিঃ ১৯৮৭), পৃ. ১০৯’’। ১৯২৬ সালে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। Ruling Class-এ শাসক শ্রেণীর মতবাদ সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরেন। ডি. প্যারেটো যাকে এলিট মোস্কা মূলত সেটাকে শাসক শ্রেণী বা Ruling Class বলেছেন।
তাঁর মতে, সকল প্রকার সমাজ ব্যবস্থাতে দুই শ্রেণীর মানুষের অস্তিত্ব দেখা যায়। তাদের এক শ্রেণী শাসন করে এবং অন্য শ্রেণী শাসিত হয়। শাসনকারী ব্যক্তিগণ সব সময়ে সংখ্যায় কম অথচ তারা রাষ্ট্রীয় কার্যাদি পরিচালনা সহ সকল প্রকার ক্ষমতা একক হাতে প্রয়োগ করে। অপরদিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ক্ষুদ্রতম ঐ শাসক শ্রেণীর দ্বারা শাসিত হয়। সংখ্যায় কম হলেও তারা ঘনিষ্ঠভাবে সংঘবদ্ধ এবং সে কারণে সংখ্যাগুরু অসংগঠিত জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। শাসক শ্রেণীর মূল বক্তব্য হল, কোনো এক ব্যক্তি বা সকল জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। শাসক শ্রেণীর মূল বক্তব্য হল, কোনো এক ব্যক্তি বা সকল জনগোষ্ঠী একতরফা শাসন করতে পারে না। জনসাধারণের সংখ্যা বৃহত্তর হওয়ায় জন্য তাদের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। আবার যত যোগ্যতা এবং দক্ষতাশালীই হোক না কেন কোনো এক ব্যক্তির দ্বারা শাসন করারও সম্ভব নয়। তাই কতিপয় ব্যক্তি মিলিত হয়ে শাসন করে। এই শ্রেণীকে মোস্কা শাসক শ্রেণী বলেছেন। তিনি সকল সমাজ ব্যবস্থাও ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে এই যুক্তির অবতারণা করেছেন।
বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সব সময় শাসক শ্রেণী কর্তৃক কখনো জোরপূর্বক এবং কোনো সময়ে প্রতারণার মাধ্যমে শাসিত হয়ে আসছে। কোনো সময়েই সাধারণ মানুষ শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করেনি এবং রাষ্ট্র কর্তৃক পরিপূর্ণ সুযোগ পায়নি। অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা শাসক শ্রেণী ভোগ করেছে। সংখ্যালঘুর কারণে শাসক শ্রেণী ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে এবং সেজন্য জনগণকে শাসন করতে সক্ষম হয়। অসংগঠিত বিপুল সংখ্যক জনগণ কোনো সময়ে তাদের গতিরোধ করতে পারেনি। শাসক শ্রেণী শুধু সংখ্যায় কম এবং ঐক্যবদ্ধই নয়, সম্পদ এবং বিদ্যায় উচ্চ শ্রেণীর পর্যায়ভুক্ত। সেজন্য জনগোষ্ঠীকে সহজে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। দরকারবশত কোনো সময়ে ছলনা-প্রবঞ্চনা এবং কোনো সময়ে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। অবশ্য এগুলোই শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার উপকরণ নয়, বৈধতা যাচাইয়ের জন্য জনমনে এমন ধারণার সৃষ্টি করা হয়, যেন জনগণ ভক্তির সাথে সমর্থন
জ্ঞাপন করে। শাসক শ্রেণী এমন রাজনৈতিক সূত্র বের করার চেষ্টা করে যেন তাদের ক্ষমতা বৈধতার আবরণে আচ্ছাদিত হয়ে জনমনে এমন ধারণার সৃষ্টি করা হয়, যেন জনগণ ভক্তির সাথে সমর্থন জ্ঞাপন করে। শাসক শ্রেণী এমন রাজনৈতিক সূত্র বের করার চেষ্টা করে যেন তাদের ক্ষমতা বৈধতার আবরণে আচ্ছাদিত হয়ে জনমনে সমর্থন সৃষ্টি করতে পারে। এটিকে তাদের রাজনৈতিক শ্রেণী এবং অ-রাজনৈতিক শ্রেণী। রাজনৈতিক শ্রেণীভুক্ত যারা তারাই মোস্কার ভাষায় শাসক শ্রেণী বা এলিট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। প্রথম শ্রেণী যদিও সংখ্যায় কম তবুও রাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্পাদনে সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এবং সাধারণ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তাদের দ্বারা শাসিত হয়। ‘’Mosca, opcit, p, 50’’
মোস্কার মতে, এলিটগণ ক্ষমতার বৈধতা প্রমাণের জন্য রাজনৈতিক সূত্র বের করা এবং তা কার্যকরী করার জন্য ন্যায়-নীতির আশ্রয়ে নেয়। এই উঁচু মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিবর্গ রাষ্ট্র পরিচালনার কর্ণধার। তারা সংখ্যায় কম এবং সুসংহত। সেজন্য মোস্কা রাষ্ট্রকে ‘সুগঠিত সংখ্যালঘু’ (Organized minority) প্রতিষ্ঠান মনে করেন। এলিটের ঘুর্ণনমান বা আবর্তন সম্পর্কে প্যারেটোর মতো মোস্কাও অভিমত পোষণ করেছেন। তার মতে, শাসক শ্রেণী চক্রবৎ আকারে (Cyclically) পরিবর্তিত হয়। আজ হোক কাল হোক, শাসক শ্রেণী ধ্বংস প্রাপ্ত হয় এবং তাদের পতনের পর নতুন শাসক শ্রেণী জন্মলাভ করে। এই ভাবে এলিটের শাসন চলতেই থাকে কিন্তু তাদের পরিবর্তন হয়। এলিটদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে পুরাতন এলিট বিতাড়িত এবং নতুন এলিট তার স্থলাভিষিক্ত হয়। শাসকদের প্রতি এক সময়ে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং সে সময়ে নিচের স্তর থেকেও শাসক শ্রেণীর জন্ম হয়। ক্ষমতাসীনদের অপসারণে নিজেরা তা পরিচালনা করে। যদি তারা অসুবিধা মনে করে তাহলে, মধ্যম শ্রেণী থেকেও শাসক নিয়োগ করতে পারে। অনেক সময় পুরাতন বা ক্ষমতাসীন শাসক গোষ্ঠী মধ্যম বা নিম্ন শ্রেণী থেকেও শাসক নিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার চেষ্টা বা নবায়ন করে। নতুন ভাবধারার আবির্ভারের ফলেও এলিটের পরিবর্তন সাধিত হয়, কারণ সে সময়ে নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হয়। এর সমাধানের জন্য নতুন শাসক শ্রেণীর আগমন ঘটে। তারা পুরাতনদের অপসারণে ক্ষমতায় বসে। সামাজিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সাধনের জন্য নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়। সেজন্য তাদের মধ্যে বুদ্ধি, আদর্শ, মূল্যবোধ ইত্যাদির ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তারা শেষাবধি ক্ষমতাসীন এলিটদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে এবং এক সময়ে ক্ষমতাসীন এলিট নিক্ষিপ্ত হয় কিংবা উক্ত শ্রেণী থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের স্বীয় দলভুক্ত করে নিজেদের টিকিয়ে রাখে। সামরিক বাহিনীর সহায়তা লাভ করেও ক্ষমতা বহাল থাকে। ‘‘এমাজউদ্দিন আহমেদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৫’’
সমালোচনা : (১) মোস্কার রাজনৈতিক শাসক শ্রেণী একটি হেঁয়ালি, কেননা তিনি কখনো সম্পদশালী কখনো বা মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে প্রভাবশালী বুঝিয়েছেন।
২) তার মতে, কতকগুলো প্রকৃতগত শাসক হয় কিন্তু তা যথার্থ নয়। কোন শ্রেণীর লোক প্রকৃতগত শাসক তা স্পষ্ট করে বলা কঠিন। এর কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদান সম্ভব নয়।
৩) এটা গণতান্ত্রিক ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। গণতান্ত্রিক শাসনে সকল ক্ষেত্রে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। গণতন্ত্রে শাসক পরিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট ধারা আছে এবং সেখানে মোস্কারতত্ত্ব প্রয়োগযোগ্য নয়।  [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ