শনিবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

দুর্ভোগের নগরী রাজধানী

নিত্যদিনের প্রচণ্ড যানজট এবং ধূলা আর ময়লা-আবর্জনার কারণে রাজধানী ঢাকা এরই মধ্যে দুর্ভোগের নগরীর পরিচিতি পেয়েছে। প্রথমে যানজটের কথা বলতেই হবে। কারণ, ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত সমাবেশের কারণে গত মঙ্গলবারও গোটা রাজধানীজুড়ে অসহনীয় যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। ভোগান্তির অসহায় শিকার সাধারণ মানুষ আপত্তি ও প্রতিবাদ জানিয়েছে এজন্য যে, মাত্র ক’দিন আগে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে একই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ এক সমাবেশ করেছিল। জনগণের তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াসহ সেদিনের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে দলটির সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিক অনুষ্ঠানে ঘোষণা করেছেন, তারা আর রাস্তা বন্ধ করে কোনো মিছিল-সমাবেশ করবেন না। কিন্তু দু’সপ্তাহের ব্যবধানেই আবারও রাস্তা বন্ধ করে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের নামে সমাবেশ করেছেন তারা। ওই অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় অবশ্য ভালোই শুনিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, আজকের দিনটির জন্য সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবো আমরা, দুঃখও প্রকাশ করবো। মুখে বললেও তারা কিন্তু ক্ষমা যেমন চাননি তেমনি আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখও প্রকাশ করেননি। ক্ষমা চাইলে বা দুঃখ প্রকাশ করলেও মানুষের অবশ্য কোনো লাভ হতো না। কারণ, যানজটের কারণে যে ক্ষতি ও ভোগান্তি হওয়ার তা তো হয়েই গেছে! উল্লেখ্য, ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানটিতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপন্থিতিও যানজট সৃষ্টির বড় কারণ বলে বিভিন্ন রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, শুধু যানজটের কারণে নয়, ধূলা এবং ময়লা-আবর্জনার কারণেও রাজধানী দুর্ভোগের নগরী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। গতকালও একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বৃহত্তর রাজধানী মহানগরীর প্রতিটি এলাকাতেই ধূলা আর ময়লা-আবর্জনার কবল থেকে বাঁচার জন্য মানুষকে আজকাল মুখে কাপড়ের মাস্ক পরে কিংবা অন্য কোনোভাবে নাক ঢেকে চলাচল করতে হচ্ছে। অবস্থা এমন হয়ে পড়েছে যে, উত্তরা ও মিরপুর-পল্লবী থেকে সদরঘাট, কমলাপুর ও গাবতলী পর্যন্ত এমন কোনো এলাকার নাম বলা যাবে না, ঝলমলে আলোর মধ্যেও যে এলাকা ধূলায় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে না থাকছে। কারণ, প্রতিটি এলাকায় চলছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির মহাকর্মযজ্ঞ। প্রকাশিত রিপোর্টে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কে মেট্রোরেলের জন্য সড়ক নির্মাণের খবর উল্লেখ করা হয়েছে। মেট্রোরেলের এই কাজ কতদিন আগে শুরু হয়েছে এবং আর কতদিন চলবে সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ দূরে থাকুক, সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারও সঠিকভাবে জানেন না। জানলেও বলতে চান না। জানা গেছে, মেট্রোরেলের জন্য সড়ক নির্মাণের কাজ ধীরে ধীরে ফার্মগেট হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শুধু নয়, রাজধানীর আরো অনেক এলাকাতেও সম্প্রসারিত হবে। যার অর্থ, আরো অনেক এলাকার মানুষকেই ধূলার কবলে পড়তে হবে।
শুধু মেট্রোরেলের কথাই বা বলা কেন। বাংলামোটর থেকে মৌচাক-মালিবাগ, শান্তিনগর, খিলগাঁও এবং তেজগাঁও সাতরাস্তার মোড় পর্যন্ত বিরাট এলাকার কথাও না বলে পারা যায় না। কারণ, বছরের পর বছর ধরে এসব এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চালানো হচ্ছে। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। জানা গেছে, এর মধ্যেও নাকি ডিজাইনের ত্রুটি ধরা পড়েছে। ফলে আবারও নতুন করে বাংলামোটর থেকে মৌচাক পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজে হাত দিয়েছেন কর্তা ব্যক্তিরা। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অবস্থা কিন্তু এরই মধ্যে শোচনীয় হয়ে পড়েছে। কারণ, ধূলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে নানা রোগের বিস্তার। সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, হাঁপানি এবং চর্মরোগের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের কষ্টের কোনো সীমা থাকছে না। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো জানিয়েছে, এসব অসুখের চিকিৎসার জন্য মধ্য ও নিম্নবিত্তদের প্রতি মাসে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তারপরও মুক্তি মিলছে না অসুখের কবল থেকে। 
প্রকাশিত রিপোর্টে নির্মাণ কাজগুলোতে জড়িত সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কথাও রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, কোনো একটি সংস্থা কোনো কাজে খোঁড়াখুঁড়ির পর কোনোভাবে মাটি ভরাট করে যেতে না যেতেই অন্য কোনো সংস্থা আবার অন্য কোনো কাজে একই রাস্তা খুঁড়তে শুরু করছে। এর ফলে ধূলার বিস্তার তো ঘটছেই, ইট-বালু আর সিমেন্টের বস্তারও পাহাড় জমছে। পাশাপাশি প্রস্থে ছোট হয়ে আসছে সড়কগুলো। সৃষ্টি হচ্ছে যানজটও। এভাবে সব মিলিয়েই রাজধানীর সড়কে স্বাভাবিক চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তথ্যাভিজ্ঞদের অভিমত উল্লেখ করে রিপোর্টটিতে জানানো হয়েছে, এমন সময় অচিরেই আসবে যখন মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরত্ব পার হতে রাজধানীবাসীদের এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগবে। টাকার হিসাবেও গুণতে হবে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, শুধু যানজটের কারণে রাজধানীতে যে সময় নষ্ট হয় বছরে তার আর্থিক মূল্য প্রায় এক লাখ কোটি টাকা।
আমরা মনে করি এবং একথা অতীতেও বহুবার বলেছি যে, রাজধানী মহানগরীর এমন স্থবিরতা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সরকার এবং তার বিভিন্ন বিভাগের পাশাপাশি দুই সিটি করপোরেশনও নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে চরম গাফিলতি দেখিয়ে চলছে বলেই পরিস্থিতির এত মারাত্মক অবনতি ঘটতে পেরেছে। ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলের জন্য সড়ক নির্মাণসহ উন্নয়ন কার্যক্রমের ব্যাপারে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। আপত্তির আসল কারণ দায়িত্বের বিষয়টি ভুলে যাওয়া এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা। কারণ, এই অভিযোগ অনস্বীকার্য যে, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা থেকে ধূলার বিস্তার প্রতিরোধ করার জন্য সড়কে সড়কে পানি ছেটানোর সামান্য কাজটুকু পর্যন্ত কোনো কর্তৃপক্ষকে করতে দেখা যাচ্ছে না। সেজন্যই ধূলার বিস্তার ঘটছে। পরিবেশও মারাত্মক হয়ে উঠছে।
আমরা মনে করি, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এবং দুই সিটি করপোরেশনের উচিত ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেলসহ যে কোনো ধরনের কোনো প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করার আগে ধূলা প্রতিরোধের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। যানজটের ব্যাপারেও আমরা পুনরাবৃত্তি করে বলতে চাই, রাস্তা বন্ধ করে মিছিল-সমাবেশ করা এবং মানুষকে ভোগান্তির মুখে ঠেলে দেয়ার কর্মকা- সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। এসবের অবশ্যই অবসান ঘটানো দরকার। আমরা চাই, রাজধানী ঢাকার দুর্ভোগের নগরীর পরিচিতি ঘুঁচে যাক স্বল্প সময়ের মধ্যে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ