মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মুক্ত মতামত বন্ধ হলে মানুষ বাঁচবে কিভাবে?

জিবলু রহমান : [ছয়]
এই জঘন্য কালাকানুনের বিরুদ্ধে জনগণের মতপ্রকাশের অবারিত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিএনপি, ২০ দল এবং আমাদের সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে নিজ নিজ অবস্থা থেকে সারাদেশে সোচ্চার হবার ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান তিনি।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন সম্প্রচার নীতিমালা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের জন্য নয়, বরং এর প্রতিটি ধারা গণমাধ্যমের জন্য কল্যাণকর ও সম্প্রচারে সহায়ক (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো ১২ আগস্ট ২০১৪)। এই মন্ত্রীর মুখেই আবার শোনা গেছে, নীতিমালার কথা শুনলেই যারা হৈচৈ করেন, তারা সব ‘স্বৈরাচারের দালাল’। কাথা দুটি বিপরীতমুখী। সরকার চাইলে এ নীতিমালাকে দুই দিকেই ব্যবহার করতে পারে। কোনটি করছে বা করবে সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারছে ঠিকই।
বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিষ্ঠান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, বাংলাদেশে নিরপেক্ষ মিডিয়া প্রচণ্ড চাপে রয়েছে। মুক্ত মত প্রকাশের ক্ষেত্রকে করা হয়েছে সীমাবদ্ধ। বিরোধী দলের শত শত সমর্থককে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৪০ জনেরও বেশি মানুষকে গুম করা হয়েছে। বিদেশী নাগরিকদের ওপর হামলা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে ইতালীর একজন এনজিওকর্মী ও এক জাপানীকে। হামলা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ব্লগার ও প্রকাশকদের ওপর। এতে কমপক্ষে ৫ জন নিহত হয়েছেন।
রিপোর্টে মৃত্যুদণ্ডের অংশে বলা হয়েছে, গত বছর কমপক্ষে ১৯৮ জনের বিরুদ্ধে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে যা বিশ্বে রায় প্রদানের দিক থেকে তৃতীয়।
২০১৫ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনার ওপর ভিত্তি করে ওই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে উঠে এসেছে সিলেটের শিশু শামিউল ইসলাম রাজন হত্যা প্রসঙ্গও। বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার বিরোধী আন্দোলন চালায়। সেই সময় কয়েক ডজন প্রাণ হারায়। আহত হন অনেকে। বিএনপির সিনিয়র সদস্যদের গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ এনেছে পুলিশ। এর মধ্যে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাকে জেল থেকে মুক্তি দেয়ার কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর পর বছরজুড়েই বার বার গ্রেফতার করা হয়েছে। মুক্তি দেয়ার আগে বিরোধী দলের কয়েক শত নেতা-কর্মীকে দিনের পর দিন বা মাসের পর মাস আটক রাখা হয়। তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে। অ্যামনেস্টি আরও বলেছে, বিদেশী কয়েকজন নাগরিকও হামলার শিকার হয়েছেন অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হাতে। ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮ নবেম্বরের মধ্যে ইতালীর একজন এনজিওকর্মী সিজার তাবেলা ও জাপানী নাগরিক হোশি কুনিওকে হত্যা করা হয়। বন্দুক হামলা থেকে বেঁচে গিয়েছেন ইতালীর একজন ডাক্তার। চুরির অভিযোগে জুলাই মাসে ১৩ বছর বয়সী বালক শামিউল ইসলাম রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় সিলেটে। এতে পথশিশুদের দুর্ভোগ উপেক্ষা করার জন্য ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরপর পরই এ হত্যাকাণ্ড তদন্তের নির্দেশ দেয় সরকার। বছর শেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে বিচারের আওতায় ছিলেন কমপক্ষে ১৬ জন।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা অংশে বলা হয়েছে, সরকারের সমালোচনা করে এমন নিরপেক্ষ মিডিয়া রয়েছে প্রচণ্ড চাপের মুখে। নবেম্বরে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সুপারিশ করে জাতীয় সংসদের সমালোচনা করার জন্য, দুর্নীতি বিরোধী এনজিও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের নিবন্ধন বাতিল করা উচিত। বিচার সুষ্ঠু হয়নি বলে সমালোচনা করেছিলেন সুশীল সমাজের এমন ৪৯ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঢাকার একটি আদালত আদালত অবমাননার অভিযোগ এনেছেন। নবেম্বরে সরকার সামাজিক যোগাযোগ মিডিয়া ও অন্যান্য যোগাযোগ মিডিয়া বন্ধ করে দেয়। এটা মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ করে দেয়া বলে মন্তব্য করেছে অ্যামনেস্টি। এতে আরও বলা হয়, গত বছর নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ মত প্রকাশের কারণে ব্লগারদের ওপর হামলা চালায় কট্টরপন্থি গ্রুপগুলো। ফেব্রুয়ারিতে অভিজিত রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা রক্ষা পান। আগস্টে তিন ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান, নিলয় নীল ও অনন্ত বিজয় দাসকে হত্যা করা হয়। অক্টোবরে ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যের এক প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দিপনকে হত্যা করা হয়। এ হামলায় রক্ষা পান দু’ধর্মনিরপেক্ষ লেখক। অ্যামনেস্টি বলছে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে লেখা প্রকাশের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকার ব্লগার ও প্রকাশকদের অভিযুক্ত করেছেন।
গুম প্রসঙ্গে অ্যামনেস্টি তার রিপোর্টে বলেছে, সাদা পোশাকে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কয়েক ডজন মানুষকে গ্রেফতার করেছে। পরে তারা কোথায় সে বিষয়ে তারা কিছু জানে না বলে দাবি করেছে। জাতীয় পত্রিকাগুলোর ওপর এক জরিপ চালিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র ইঙ্গিত দিয়েছে, কমপক্ষে ৪৩ জনকে গুম করা হয়েছে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। এর মধ্যে রয়েছেন দু’জন নারী। গুম হওয়া ৪৩ জনের মধ্যে পরে ৬ জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তুলে নেয়ার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে ৪ জনকে। ৫ জনকে পাওয়া গেছে পুলিশি নিরাপত্তায়। বাকি ২৮ জন কোথায় বা তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানা যায় নি।
অ্যামনেস্টি তার রিপোর্টে বলছে, পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্যাতন ও অশোভন আচরণ করা হয় ব্যাপকভাবে। নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত হয়েছে এমন ঘটনা বিরল।
পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, সরকার জানুয়ারিতে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। তাতে যেসব মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করতে চান তাদের জন্য ভীষণ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। ওদিকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ওমেন লইয়ার্স এসোসিয়েশনের মতে, জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ২৪০টিরও বেশি ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্ষণ বেড়ে গেছে। কিন্তু অভিযুক্তদের শাস্তি পাওয়ার ঘটনা খুবই কম। এর কারণ, যথাযথ সময়ের অভাব ও কার্যকর তদন্তের অভাব। ধর্ষণের হাত থেকে যারা রক্ষা পেয়েছেন তাদেরকে প্রমাণ করতে হয় যে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদেরকে শারীরিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।
ওই রিপোর্টে মৃত্যুদণ্ডের অংশে বলা হয়েছে, গত বছর কমপক্ষে ১৯৮ জনের বিরুদ্ধে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ জন সিলেটে শিশু শামিউল ইসলাম রাজন হত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ডের রায় পেয়েছে। একই রায় পেয়েছে ২০১৩ সালে পিতা-মাতাকে হত্যাকারী ঐশী রহমান। তার আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ঘটনার সময় ঐশীর বয়স ছিল ১৮ বছরের কম। তাই তাকে মৃত্যুদণ্ড না দেয়ার আর্জি জানিয়েছিলেন তারা। কিন্তু আদালত মেডিকেল পরীক্ষার কাগজপত্রে তার বয়স ১৯ বছর দেখতে পান এবং সে অনুযায়ী রায় দেন। বাংলাদেশে স্থাপিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার অপরাধের জন্য আরও চারজনকে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
অ্যামনেস্টি বলছে, এ আদালতের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ আছে। প্রসিকিউশনের সাক্ষীর দেয়া সাক্ষ্যকে বিবাদি পক্ষ মিথ্য বলে দাবি করে। সংঘটিত অপরাধের সময় সেই অপরাধ থেকে বিবাদী অনেক দূরে ছিলেন দাবি করলেও তা মানা হয়নি। বিদেশ থেকে বিবাদীপক্ষের জন্য সাক্ষ্য দিতে আসতে চাওয়া সাক্ষীদের সরকার ভিসা দেয়নি। রিপোর্টে বলা হয়েছে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও মানবাধিকার বিষযক সংগঠনগুলো ফাঁসি বন্ধের আহ্বান জানালেও গত বছর ৪ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০১৫ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়েছে ১৯৭টি। যা বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রেখেছে দেশটিকে। আর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে চারটি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে। (সূত্রঃ দৈনিক সংগ্রাম ৭ এপ্রিল ২০১৬)
৩ মে ২০১৬ ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে বা বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজে’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুদ্দিন হারুন ও মহাসচিব এম আবদুল্লাহ এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে’র সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ফ্যাসিবাদের নগ্ন থাবায় সংবাদমাধ্যম পুরোপুরি শৃঙ্খলিত। সরকারের রক্তচক্ষুর সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে। বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অকল্পনীয় হুমকির মুখে পড়েছে সাংবাদিকদের জীবন ও জীবিকা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দল, মত, পথ নির্বিশেষে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট সকলকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে
বিবৃতিতে বিএফইউজে ও ডিইউজে নেতারা বলেন, মুক্তগণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪তম বলে গত সপ্তাহে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংগঠন। আমরা মনে করি বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থান আরও তলানীতে। এরই মধ্যে সরকার জাতীয় সম্প্রচার আইন প্রস্তাব করেছে যাতে ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়াকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও দীর্ঘমেয়াদে জেলের বিধান রাখা হয়েছে। সর্বশেষ প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধন প্রস্তাবে জেল জরিমানার পাশাপাশি এক মাস পর্যন্ত সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়ার কালাকানুন প্রস্তাব করেছে আইন কমিশন। এসবই বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে আরও কার্যকরভাবে সরকারের পদানত করার জন্য করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্তমান আওয়ামী মহাজোট সরকারের আমলে সাগর-রুনীসহ ২৭ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন, আহত হয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী। মাহমুদুর রহমান, শওকত মাহমুদ, শফিক রেহমান, আবদুস সালামসহ বহু গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রিমান্ড ও কারানির্যাতনের শিকার। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রেকর্ডসংখ্যক সাংবাদিক নিগৃহীত হয়েছেন। দৈনিক আমার দেশ, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, চ্যানেল ওয়ান, সিএসবিসহ সারা দেশে ভিন্ন মতের ২ শতাধিক সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনলাইন গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের জন্য কঠোর নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবসের চেতনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে অবিলম্বে বন্ধ গণমাধ্যম খুলে দিয়ে সাংবাদিকদের বেকারত্বের অবসান, কারাবন্দী সাংবাদিকদের মুক্তি, যেসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন বেতনভাতা বকেয়া রয়েছে তা অবিলম্বে পরিশোধ এবং নবম ওয়েজবোর্ড গঠন করার দাবি জানিয়েছেন।
২০ জুলাই ২০১৬ বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে এক সভায় বিএফইউজের সভাপতি শওকত মাহমুদের মুক্তি উপলক্ষে এবং কারাগারে অসুস্থ আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও জ্যেষ্ঠ সম্পাদক শফিক রেহমানের সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিল ও ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, মিডিয়া এখন ফ্যাসিবাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সরকার মিডিয়াকে নিজেদের দুঃশাসনের সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করছে। কোন কোন মিডিয়া বাধ্য হয়ে আবার অনেক মিডিয়া সহযোগিতার নামে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এসব মিডিয়াকে একদিন জনতার আদালতে দাঁড়াতে হবে। আর সাংবাদিক সমাজই এ আন্দোলনের অগ্রগামী ভূমিকায় থাকবে। জনগণের বুকের উপর চেপে বসা এই অবৈধ সরকারের পতন না হলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক ও বিএফইউজের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, বিএফইউজের মহাসচিব এম. আবদুল্লাহ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার, নয়া দিগন্তের সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, ডিইউজে’র সাবেক সভাপতি আবদুস শহীদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ বাকের হোসাইন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, বিএফইউজের সহকারী মহাসচিব মোদাব্বের হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ শহিদুল ইসলাম, প্রেস ক্লাবের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক কাদের গণি চৌধুরী, ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম মহসিন, ডিইউজে’র সহসভাপতি খুরশিদ আলম, যুগ্ম সম্পাদক শাহীন হাসনাত, সাংবাদিক নেতা নুরুল আমীন রোকন, আনোয়ারুল কবীর বুলু, কায়কোবাদ মিলন, শাহীন চৌধুরী, আবু ইউসুফ, রফিক মুহাম্মদ, কামার ফরিদ, বাছির জামাল, জাকির হোসেন, গোলাম আজাদ, শেখ রকিব উদ্দিন, জসীম মেহেদী প্রমুখ।
দোয়াপূর্ব আলোচনায় রুহুল আমিন গাজী বলেন, যে দেশে গণতন্ত্র নেই, প্রহসনের রাজনীতি চলে সেদেশে আইনের শাসন থাকে না। দেশে এখন এমন অবস্থাই বিরাজ করছে। কেউ কোনো কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাচ্ছে না। যে প্রতিবাদ করবে তাকে হামলা, মামলার শিকার হতে হয়। এক ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করছে। গণমাধ্যমেও সঠিক তথ্য আসছে না। তবে দেশের মানুষ এই পরিস্থিতি বেশিদিন মেনে নিবে না। মানুষের মাঝে ক্রমেই ক্ষোভ বাড়ছে। একদিন রাস্তায় নেমে পড়লে দখলদাররা পালাতে বাধ্য হবে ইনশা আল্লাহ।
সাংবাদিকদের যেভাবে আটক করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো হচ্ছে তা ইতিহাসে নেই উল্লেখ করে রুহুল আমিন গাজী বলেন, সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলায় সরকারের রোষানলে পড়েছে। শফিক রেহমান ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকেও একই কারণে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। তারাও দীর্ঘ দিন ধরে জেলখানায় আছেন। ‘ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শোনা যায়’ মাহমুদুর রহমানের লেখা একটি কলামের উদ্ধৃতি দিয়ে রুহুল আমিন গাজী প্রশ্ন রেখে বলেন-এখন আমরা কি দেখতে পাচ্ছি?
তিনি বলেন, জনগণের টাকায় বেতন পাওয়া পুলিশ সদস্যরা জনগণের বুকে বন্দুক ধরছে। যাকে-তাকে যখন ইচ্ছে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এখন মেসভাড়া নিয়েও থাকতে পারছে না। মেসে অভিযান চালিয়ে নিরপরাধ ছাত্রদের ধরে নিয়ে জঙ্গি সাজানো হচ্ছে। ইচ্ছেমত স্বীকারোক্তি আদায় করা হচ্ছে। পুলিশের মনমতো স্বীকারোক্তি না হলে ক্রসফায়ার দিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজানো হচ্ছে। তিনি বলেন,এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। গুলশানে হামলাকারীদের সম্পর্কে আগাম তথ্য ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন দাবির সমালোচনা করে রুহুল আমিন গাজী বলেন, আপনাদের কাছে সব তথ্য থাকলে আগে ব্যবস্থা নিলেন না কেন? মানুষকে এভাবে মনগড়া কথা বলে বিভ্রান্ত না করার আহ্বান জানান তিনি।
শওকত মাহমুদ বলেন, আমি কারামুক্ত হলেও যারা এখনো কারাবন্দী আছে তাদের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সফলতার কিছু নেই। তারপরও আমি মুক্তি পাওয়ায় সবাইকে শুভেচ্ছা। যারা দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। যারা ঈমানদার তারা পথভ্রষ্ট হয় না। এতদিনে আমাদের কাছ থেকে কিছু সহকর্মী বিপথগামী হয়েছেন তারা দ’কূলই হারিয়েছেন। একদিন তাদেরকে এর মাশুল দিতে হবে।
শওকত মাহমুদ বলেন, কারাগারে নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। ১০ মাস চারদিন কারাগারে ছিলাম বিনা অপরাধে। আমার জামিন হলেও মুক্তি দিতে চায়নি সরকার। উচ্চ আদালত থেকে আমাকে সব মামলায় জামিন দেয়া হলেও বারবার আমার মুক্তি ঠেকিয়ে দেয়া হয়। এটর্নী জেনারেল আমাকে মুক্তি না দিতে দৌড়ঝাঁপ করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহর রহমতে মুক্তি পেয়েছি। তিনি বলেন, আমি মুক্তি পেয়েছি তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে-যারা এখনো কারারুদ্ধ আছেন তাদেরকে মুক্ত করে আনার আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। কারারুদ্ধ মাহমুদুর রহমানের কথা উল্লেখ করে শওকত মাহমুদ বলেন, তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ। তার মনোবল আগের মতোই দৃঢ় ও শক্তিশালী আছে। সরকার পতনের যে আন্দোলন তিনি শুরু করেছিলেন সেখান থেকে একচুলও তিনি সরে আসেননি। ৯৪টি মামলায় মাহমুদুর রহমানকে জামিন দেয়ার পরও কারাকর্তৃপক্ষ সরকারের নির্দেশে জোরপূর্বক ১০দিন ধরে আটকে রাখে। তাকে আটকানোর জন্য কোনো মামলা খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত শফিক রেহমানের ওই মামলায় তাকেও গ্রেফতার দেখানো হয়।
এদিকে শফিক রেহমানের কথা উল্লেখ করে শওকত মাহমুদ বলেন, তিনি পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর তার বরাত দিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় যেসব খবর ছাপা হয়েছে তা সঠিক নয়। শফিক রেহমান বলেছেন, তিনি পুলিশের কাছে তো কোনো কিছু স্বীকার করেননি, স্বীকার করার মতো কোনো তথ্য তার কাছ থেকে পুলিশ পায়নি এরপরও পুলিশের বরাত দিয়ে যাচাই বাছাই না করে মিথ্যা তথ্য ছাপানো হয়েছে। যাচাই বাছাই না করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পুলিশের দেয়া এসব একতরফা তথ্য দিয়ে খবর প্রকাশে শফিক রেহমান হতবাক হয়েছেন বলে জানান শওকত মাহমুদ।
বিএফইউজে মহাসচিব এম আবদুল্লাহ বলেন, সরকারের রক্তচক্ষুর সামনে আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে। বর্তমানে সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে সাংবাদিকদের জীবন ও জীবিকা। শওকত মাহমুদের নেতৃত্বে কারাবন্দী সাংবাদিকদের মুক্তি ও বন্ধ গণমাধ্যম খোলার আন্দোলন আরও শানিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
কবি আবদুল হাই শিকদার বলেন, আমরা আজ দুর্যোগ কবলিত দেশে বসবাস করছি। সারা দেশে চাঁদাবাজির মহড়া চলছে। সরকার দেশকে পৈত্রিক সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। [সমাপ্ত]
[email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ